নওরোজ উপলক্ষে কী বললেন মোজতবা খামেনি

নওরোজ উপলক্ষে কী বললেন মোজতবা খামেনি
ছবির ক্যাপশান, মোজতবা খামেনি

ইরানে চলমান যুদ্ধ, বিমান হামলা এবং নিরাপত্তা শঙ্কার মাঝেই পারস্য নববর্ষ নওরোজ ঘিরে জাতির উদ্দেশে বার্তা দিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। শুক্রবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তাঁর লিখিত বার্তা পাঠ করা হয়। এতে তিনি বলেন, দেশের শত্রুরা “পরাজিত হচ্ছে” এবং নতুন বছর শুরু হচ্ছে “জাতীয় ঐক্য ও জাতীয় নিরাপত্তার মধ্যে প্রতিরোধমূলক অর্থনীতির বছর” হিসেবে।

রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এটাই নওরোজ উপলক্ষে তাঁর প্রথম বড় আনুষ্ঠানিক বার্তা, যা যুদ্ধকালীন প্রেক্ষাপটে মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক-দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরা হচ্ছে।

 

ঐক্যের ওপর জোর

 

বার্তায় মোজতবা খামেনি নওরোজ উদযাপন করা ইরানি জনগণের দৃঢ়তার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে আমাদের দেশবাসীর মধ্যে যে বিশেষ ঐক্য তৈরি হয়েছে, ধর্মীয়, চিন্তাধারা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও, তার কারণে শত্রু পরাজিত হয়েছে।” তাঁর এই বক্তব্যে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়, যুদ্ধের চাপের মধ্যে সরকার এখন জাতীয় সংহতি ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিকে সামনে আনতে চাইছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, তিনি নওরোজ বার্তায় “resistance economy under national unity and national security” ধারণাকে নতুন বছরের কেন্দ্রীয় থিম হিসেবে ঘোষণা করেন।

 

যুদ্ধ নিয়ে খামেনির অবস্থান

 

মোজতবা খামেনি বার্তায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধকৌশল নিয়েও কথা বলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পশ্চিমা পক্ষের ধারণা ছিল, এক-দুই দিনের হামলায় ইরানের জনগণ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে; কিন্তু সেটি “মারাত্মক ভুল হিসাব” প্রমাণিত হয়েছে। তিনি বলেন, “এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল এই ভুল ধারণা থেকে যে, যদি সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব ও কিছু প্রভাবশালী সামরিক ব্যক্তিত্ব শহীদ হন, তাহলে জনগণের মধ্যে ভয় ও হতাশা তৈরি হবে… আর এর মাধ্যমে ইরানকে নিয়ন্ত্রণ ও পরে ভেঙে ফেলার স্বপ্ন পূরণ হবে। কিন্তু তার বদলে শত্রুদের মধ্যেই বিভাজন তৈরি হয়েছে।” এই বক্তব্য মূলত যুদ্ধকে একটি প্রতিরোধ-নির্ভর জাতীয় লড়াই হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

 

জনসমক্ষে না এলেও বার্তায় সক্রিয়

 

যুদ্ধ শুরুর দিন, ২৮ ফেব্রুয়ারি, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর এক সপ্তাহের মাথায় মোজতবা খামেনি সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন-এমন তথ্য একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে এসেছে। তবে তিনি এখনো জনসমক্ষে উপস্থিত হননি। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তাঁর অনুপস্থিতি নিয়ে জল্পনা থাকলেও ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো এমনভাবে নির্মিত যে শীর্ষ পর্যায়ে ধাক্কা এলেও ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে না। রয়টার্সও নওরোজ বার্তাকে তাঁর নতুন নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখিয়েছে।

 

আতঙ্কের মাঝেও নওরোজ

 

যুদ্ধ পরিস্থিতি সত্ত্বেও ইরানে নওরোজের সামাজিক আবহ একেবারে থেমে যায়নি। তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে সাইরেন, নিরাপত্তা সতর্কতা ও বিমান হামলার শঙ্কার মধ্যেও মানুষ বাজারে বের হয়েছেন। রয়টার্সের ১৮ মার্চের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তেহরানের গ্র্যান্ড বাজার-যা সাধারণত নওরোজ ও ঈদের আগে জমজমাট থাকে-যুদ্ধের কারণে অনেকটাই চাপের মধ্যে থাকলেও মানুষ শেষ মুহূর্তের কেনাকাটার চেষ্টা করেছেন। তবে একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, দোকানপাট বন্ধ থাকা এবং ক্ষয়ক্ষতির কারণে উৎসবের অর্থনৈতিক চাপও অনেক বেড়েছে।

 

ইরানের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বসন্তের প্রথম দিনেই নওরোজ শুরু হয়। এই দিনকে কেন্দ্র করে সাধারণত নতুন পোশাক, মিষ্টি, খাদ্যসামগ্রী কেনা, ঘর পরিষ্কার এবং পারিবারিক প্রস্তুতি চলে। এবার সরকারি পর্যায়ে বড় উৎসব আয়োজন সীমিত থাকলেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে মানুষ নওরোজ পালন করেছেন। যুদ্ধের বাস্তবতা তাদের থামাতে পারেনি পুরোপুরি; বরং অনেকের কাছে এ উৎসব এক ধরনের মানসিক প্রতিরোধে পরিণত হয়েছে।

 

তেহরানের অন্য বাস্তবতা

 

তবে উৎসবের ভিড়ের আড়ালে বিষাদও স্পষ্ট। বিশেষ করে তেহরানের উত্তর-পূর্ব অংশে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ভয়াবহ। বহু বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে, বহু পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে, আর নিহতদের দাফন ও উদ্ধারকাজ শহরের পরিবেশকে ভারী করে তুলেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন বলছে, তেহরানের ব্যবসা, বাজার ও নাগরিক জীবন যুদ্ধের অভিঘাতে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে নওরোজের উৎসব এবার আনন্দের চেয়ে বেশি হয়ে উঠেছে টিকে থাকা, শোক সামলে এগিয়ে চলা এবং অনিশ্চয়তার ভেতরও সংস্কৃতিকে ধরে রাখার প্রতীক।


সম্পর্কিত নিউজ