যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের ৪ হাজার কি. মি দূরের ঘাঁটিতে মিসাইল ছুড়ল ইরান

যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের ৪ হাজার কি. মি দূরের ঘাঁটিতে মিসাইল ছুড়ল ইরান
ছবির ক্যাপশান, যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের ৪ হাজার কি. মি দূরের ঘাঁটিতে মিসাইল ছুড়ল ইরান

ভারত মহাসাগরে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক ঘাঁটি দিয়েগো গার্সিয়াকে লক্ষ্য করে ইরান দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে বলে দাবি উঠেছে। এ তথ্য প্রথমে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে রয়টার্স জানায়। পরে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম মেহরও একই ধরনের দাবি তোলে। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের একটিও ঘাঁটিতে পৌঁছাতে পারেনি।

কী ঘটেছে বলে জানা যাচ্ছে

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছে-ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের একটি লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই মাঝপথে বিকল বা ভূপাতিত হয়। অন্যটির দিকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধজাহাজ থেকে এসএম-৩ ধরনের প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টর নিক্ষেপ করা হয়। তবে সেই প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছিল কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত ফলাফল ছিল একই: দিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটি অক্ষত থাকে।

দিয়েগো গার্সিয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ

দিয়েগো গার্সিয়া ভারত মহাসাগরের একটি কৌশলগত দ্বীপঘাঁটি, যা যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘপাল্লার বোমারু বিমান, সাবমেরিন-সহায়তা অবকাঠামো এবং ক্ষেপণাস্ত্রবাহী যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রাখতে পারে। চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এর কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: ৪ হাজার কিলোমিটার দূরে কীভাবে?

এই ঘটনার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা নিয়ে। সংবাদ প্রতিবেদনে দিয়েগো গার্সিয়ার দূরত্ব ইরান থেকে আনুমানিক ৪ হাজার কিলোমিটার বা প্রায় ২,৫০০ মাইল বলা হয়েছে। কিন্তু ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এর আগে প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বোচ্চ রেঞ্জ ২ হাজার কিলোমিটার। এই দুই তথ্যের মধ্যে বড় ফারাক থাকায় বিষয়টি নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।

রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে মেহর নিউজের বরাতে বলা হয়েছে, ইরানপক্ষ এই হামলাকে এমন এক ইঙ্গিত হিসেবে দেখাচ্ছে, যা বোঝায় তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা আগে যে সীমার মধ্যে ধরা হতো, বাস্তবে তা হয়তো আরও বেশি বিস্তৃত। তবে এখানেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য সরকারি কারিগরি ব্যাখ্যায় স্পষ্ট করে বলা হয়নি, ঠিক কোন মডেলের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বা ওই ৪ হাজার কিলোমিটার দূরত্ব কীভাবে কভার করা হয়েছে।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে কী জানা যায়

ইসরায়েলভিত্তিক বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রভাণ্ডারকে মূলত স্বল্পপাল্লার ও মধ্যপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রভিত্তিক বলা হয়। সাধারণভাবে এগুলোর কার্যকর পাল্লা ১ হাজার থেকে ৩ হাজার কিলোমিটারের মধ্যে বলে ধরা হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের কিছু মধ্যপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র “অ্যাডভান্সড স্টেজে” আছে-অর্থাৎ আগের তুলনায় পাল্লা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নত হয়েছে-এমন আলোচনা বিভিন্ন বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এসেছে। আজকের দাবিকৃত হামলা সেই বিতর্ককে আরও জোরালো করল।

এটি কি বড় ধরনের কৌশলগত বার্তা?

বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, দিয়েগো গার্সিয়াকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের চেষ্টা-সফল হোক বা না হোক-শুধু সামরিক পদক্ষেপ নয়, বরং কৌশলগত বার্তাও। এর মাধ্যমে তেহরান সম্ভবত দেখাতে চেয়েছে যে সংঘাত কেবল ইসরায়েল বা উপসাগরীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না; প্রয়োজন হলে দূরবর্তী মার্কিন-যুক্তরাজ্য ঘাঁটিও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। ভারতীয় ও ইউরোপীয় কিছু বিশ্লেষণেও এটিকে ইরানের সবচেয়ে দীর্ঘপাল্লার আক্রমণ-চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তিগত প্রমাণ এখনো সামনে আসেনি।

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের প্রতিক্রিয়া

রয়টার্স জানায়, ঘটনার পরপরই হোয়াইট হাউস ও ব্রিটিশ কর্মকর্তারা বিস্তারিত মন্তব্য করেননি। অর্থাৎ হামলার দাবি ও প্রতিরোধের তথ্য মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতেই সামনে এসেছে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ সরকারি ব্রিফিং এখনো প্রকাশ হয়নি। ফলে অনেক প্রশ্ন এখনো খোলা আছে-ক্ষেপণাস্ত্রের ধরন কী, কোথা থেকে ছোড়া হয়েছে, আর তা আদৌ কতদূর অগ্রসর হয়েছিল।

 

সূত্র : রয়টার্স
 


সম্পর্কিত নিউজ