{{ news.section.title }}
ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারে উঠতে পারে তেলের দাম
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও এলএনজির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করে। এখন সেই পথ কার্যত অচল বা অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, আর এর প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এশিয়া, ইউরোপ ও অন্যান্য আমদানিনির্ভর অঞ্চলে।
রয়টার্স, এপি ও ব্লুমবার্গের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, সংঘাতের শুরু থেকে হরমুজ ঘিরে জ্বালানি সরবরাহে নজিরবিহীন ধাক্কা লেগেছে এবং বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
ব্লুমবার্গের একাধিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হরমুজে বিঘ্নের কারণে বৈশ্বিক বাজার থেকে প্রতিদিন ৭০ লাখ থেকে ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বা ইতোমধ্যে হারিয়ে যেতে পারে। একই সময়ে রয়টার্স জানিয়েছে, চলমান সংঘাতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল প্রতিদিনে পৌঁছেছে বলে বিশ্লেষকদের অনুমান। এই আঘাতকে জ্বালানি খাতের অনেকে ইতিহাসের অন্যতম বড় সরবরাহ-সংকট হিসেবে দেখছেন। ব্লুমবার্গের ভাষায়, এটি এখন “বৃহত্তম তেল সরবরাহ-ধাক্কা”র একটিতে রূপ নিয়েছে।
এই সরবরাহ সংকটের মধ্যেই তেলের দাম নিয়ে ভয়াবহ সতর্কতা সামনে এসেছে। ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, ম্যাকুয়ারি গ্রুপের বিশ্লেষকদের মতে যুদ্ধ জুন পর্যন্ত গড়ালে এবং হরমুজ বন্ধই থাকলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার ছুঁতে পারে। আর রয়টার্সের একটি জরিপে ১৩ জন বিশ্লেষক ব্রেন্ট ক্রুডের সম্ভাব্য মূল্য ১০০ থেকে ১৯০ ডলারের মধ্যে থাকতে পারে বলে মত দিয়েছেন; কিছু চরম পরিস্থিতিতে ২০০ ডলারের আশঙ্কাও সামনে এসেছে। মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিও প্রকাশ্যে সতর্ক করেছেন, সংঘাত না থামলে তেলের দাম ২০০ ডলারের ওপরে যেতে পারে।
সংকটের সবচেয়ে তীব্র অভিঘাত পড়ছে এশিয়ায়। ব্লুমবার্গ বলছে, থাইল্যান্ড থেকে পাকিস্তান পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে জ্বালানি ঘাটতি দেখা দিচ্ছে, কারণ এশিয়ার অনেক দেশই মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর বড় মাত্রায় নির্ভরশীল। রয়টার্সও জানিয়েছে, এশীয় ক্রেতারা সরবরাহ ঘাটতি সামাল দিতে আফ্রিকা ও ইউরোপমুখী তেলের চালান নিজেদের দিকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে, ফলে অন্য বাজারেও চাপ বাড়ছে। এর ফলে শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, ডিজেল, জেট ফুয়েল ও অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানির দামও দ্রুত বাড়ছে।
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির বাজারেও অস্থিরতা তীব্র হচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী গ্যাস সরবরাহের একটি বড় অংশও এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল, আর হরমুজে বিঘ্ন ও অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে এলএনজি প্রবাহও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। ব্লুমবার্গ আরও জানিয়েছে, কাতারের গ্যাস রপ্তানি ও এশিয়ামুখী এলএনজি চালানে ধাক্কা লেগে উদীয়মান অর্থনীতিগুলো বাড়তি মূল্য ও সরবরাহ-ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
ইউরোপের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি হয়ে উঠছে ডিজেল ও পরিশোধিত জ্বালানি। ইউরোপীয় কমিশন সদস্য দেশগুলোকে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ইউরোপের কাঁচা তেল সরবরাহ তুলনামূলকভাবে কিছুটা বৈচিত্র্যপূর্ণ হলেও স্বল্পমেয়াদে জেট ফুয়েল, ডিজেল ও অন্য পরিশোধিত জ্বালানির বাজারে চাপ বেড়ে যাচ্ছে। ইউরোপীয় গ্যাসের দামও যুদ্ধ শুরুর পর ৭০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছু দেশ রেশনিং, জ্বালানি সাশ্রয়ী পদক্ষেপ এবং জরুরি মজুত ব্যবহারের দিকে যাচ্ছে। একই সময়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিকল্প রুটে সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ দিয়ে যে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি প্রতিদিন চলাচল করত, তা পুরোপুরি অন্য পথে সরিয়ে নেওয়া খুবই কঠিন। ফলে সংকট দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি, শিল্পোৎপাদনে ব্যয় বৃদ্ধি এবং আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে নতুন ধাক্কার ঝুঁকি বাড়বে।
সূত্রঃ রয়টার্স