গ্রিনল্যান্ডে ভাসমান হাসপাতাল পাঠানোর ঘোষণা ট্রাম্পের

গ্রিনল্যান্ডে ভাসমান হাসপাতাল পাঠানোর ঘোষণা ট্রাম্পের
ছবির ক্যাপশান, রিপাবলিকান গভর্নরদের সম্মানার্থে আয়োজিত হোয়াইট হাউসের নৈশভোজে বক্তব্য প্রদান করছেন Donald Trump। ছবি: রয়টার্স
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডে একটি হাসপাতাল জাহাজ পাঠানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে কৌতূহল ও রাজনৈতিক আলোচনা তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক ঘোষণায় ট্রাম্প জানান, তিনি লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর জেফ ল্যান্ড্রির সঙ্গে সমন্বয় করে এই উদ্যোগ নিয়েছেন, যাতে গ্রিনল্যান্ডের অসুস্থ মানুষদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া যায়।

গ্রিনল্যান্ড উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলের বৃহত্তম দ্বীপ এবং ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। যদিও দ্বীপটি নিজস্ব সরকার পরিচালনা করে, তবে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি এখনো ডেনমার্কের হাতে রয়েছে। অঞ্চলটি বরফ, খনিজ সম্পদ ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক শক্তিগুলোর নজরে রয়েছে।


ট্রাম্পের ঘোষণা এবং হোয়াইট হাউসের নীরবতা

শনিবার রিপাবলিকান গভর্নরদের সম্মানে আয়োজিত এক নৈশভোজের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, গ্রিনল্যান্ডে একটি বড় হাসপাতাল জাহাজ পাঠানো হচ্ছে, যাতে সেখানকার মানুষদের উন্নত চিকিৎসাসেবা দেওয়া যায়। তিনি আরও দাবি করেন, জাহাজটি ইতিমধ্যে যাত্রা শুরু করেছে।

তবে ট্রাম্পের এই ঘোষণার বিষয়ে হোয়াইট হাউস, লুইজিয়ানা গভর্নরের দপ্তর বা মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। জাহাজ পাঠানোর উদ্যোগটি গ্রিনল্যান্ড বা ডেনমার্ক সরকারের অনুরোধে নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়েও কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

এই নীরবতা বিষয়টিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি মানবিক উদ্যোগের পাশাপাশি রাজনৈতিক বার্তা বহন করতে পারে।

গ্রিনল্যান্ড ঘিরে ট্রাম্পের আগ্রহের পুরোনো ইতিহাস

ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রেসিডেন্সির সময় থেকেই গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আগ্রহ দেখিয়ে আসছেন। তিনি একাধিকবার দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করার ধারণা প্রকাশ করেছিলেন, যা তখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ডেনমার্ক সেই প্রস্তাবকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করলেও বিষয়টি ওয়াশিংটন ও কোপেনহেগেনের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল।

গ্রিনল্যান্ডের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বিশাল। আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়ায় নতুন নৌপথ ও প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মতো শক্তিগুলোর কৌশলগত আগ্রহ বাড়িয়েছে।

ডেনমার্কের প্রতিক্রিয়া ও আর্কটিক কূটনীতি

ট্রাম্পের ঘোষণার এক সপ্তাহ আগে ডেনমার্কের রাজা ফ্রেডরিক দ্বিতীয়বারের মতো গ্রিনল্যান্ড সফর করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সফর ছিল গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে ডেনমার্কের সম্পর্ক দৃঢ় করার একটি প্রতীকী প্রচেষ্টা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের প্রেক্ষাপটে এটি ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বের বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গত কয়েক মাস ধরে গ্রিনল্যান্ড, ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। উত্তেজনার পর তিন পক্ষের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। হাসপাতাল জাহাজ পাঠানোর ঘোষণাকে সেই আলোচনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে কি না, তা এখনও পরিষ্কার নয়।

রহস্যময় সাবমেরিন ঘটনা

ডেনমার্কের জয়েন্ট আর্কটিক কমান্ড জানিয়েছে, ট্রাম্পের ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে গ্রিনল্যান্ডের জলসীমায় একটি মার্কিন সাবমেরিনে জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ওই সাবমেরিনের এক নাবিক গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে উদ্ধার করা হয়।

এই ঘটনার সঙ্গে হাসপাতাল জাহাজ পাঠানোর ঘোষণার কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে সময়ের মিল আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, সাবমেরিন ঘটনার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের চিকিৎসা সহায়তার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে, যা হাসপাতাল জাহাজ পাঠানোর সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

মার্কিন নৌবাহিনীর হাসপাতাল জাহাজ

মার্কিন নৌবাহিনীর কাছে দুটি বড় হাসপাতাল জাহাজ রয়েছে - ইউএসএনএস মার্সি এবং ইউএসএনএস কমফোর্ট। এই জাহাজগুলো মূলত যুদ্ধ, দুর্যোগ ও মানবিক সংকটে চিকিৎসা সহায়তার জন্য ব্যবহৃত হয়।

তবে এই দুটি জাহাজের কোনোটিই লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যে অবস্থান করে না। ফলে ট্রাম্পের ঘোষণায় উল্লেখ করা জাহাজটি কোনটি, কিংবা নতুন কোনো জাহাজ পাঠানো হচ্ছে কি না - সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

মানবিক উদ্যোগ না রাজনৈতিক কৌশল?

বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের হাসপাতাল জাহাজ পাঠানোর ঘোষণা মানবিক উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও এর পেছনে রাজনৈতিক কৌশল থাকতে পারে। গ্রিনল্যান্ড আর্কটিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি জোরদার করার একটি কৌশলগত ক্ষেত্র। হাসপাতাল জাহাজ পাঠানো সেখানে মার্কিন উপস্থিতির প্রতীকী বার্তা হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

একই সঙ্গে এটি ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের অংশ হতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি নিজেকে আন্তর্জাতিক মানবিক নেতৃত্বের ভূমিকায় তুলে ধরার চেষ্টা করতে পারেন।

গ্রিনল্যান্ডের বাস্তবতা

গ্রিনল্যান্ডের জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম এবং স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো সীমিত। দূরবর্তী অঞ্চলে উন্নত চিকিৎসা সুবিধা পৌঁছানো কঠিন। ফলে হাসপাতাল জাহাজ পাঠানো হলে এটি বাস্তবিক অর্থে বড় ধরনের সহায়তা দিতে পারে।

তবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা ডেনমার্ক সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ ছাড়া এমন উদ্যোগ কূটনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে। কারণ এটি সার্বভৌমত্ব ও প্রশাসনিক কর্তৃত্বের প্রশ্ন তুলতে পারে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ প্রভাব

ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বিষয়টি সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। আর্কটিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। হাসপাতাল জাহাজ পাঠানোর মতো উদ্যোগ সামরিক উপস্থিতির বাইরে মানবিক কূটনীতির একটি নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

তবে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি ও বিস্তারিত পরিকল্পনার অভাবে উদ্যোগটির বাস্তবতা নিয়ে সন্দেহ রয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি বাস্তবে বাস্তবায়িত হলে গ্রিনল্যান্ড, ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ওপর নতুন প্রভাব ফেলতে পারে।

কূটনৈতিক প্রভাব ও সম্ভাবনা

গ্রিনল্যান্ডে হাসপাতাল জাহাজ পাঠানোর ঘোষণা ট্রাম্পের মানবিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা গেলেও, এর পেছনে রাজনৈতিক ও কৌশলগত হিসাব থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আর্কটিক অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় এই ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

এখন মূল প্রশ্ন হলো - এই উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে এবং ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড সরকার কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে। বিষয়টি স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত ট্রাম্পের ঘোষণাটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক রহস্যময় ও আলোচিত ঘটনা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
 


সম্পর্কিত নিউজ