ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায়: মেয়েদের স্কুলে প্রাণহানি, খামেনির প্রাসাদ বিধ্বস্ত

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায়: মেয়েদের স্কুলে প্রাণহানি, খামেনির প্রাসাদ বিধ্বস্ত
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Md Ibrahim Sakib

মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের উত্তেজনাপূর্ণ ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন করে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত সামরিক হামলার ঘটনায়। শনিবার ভোররাতে পরিচালিত এই যৌথ বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র অভিযানে ইরানের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও প্রশাসনিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। হামলার ফলে ব্যাপক প্রাণহানি, অবকাঠামোগত ক্ষতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে হোরমোজগান প্রদেশের মিনাব শহরের একটি মেয়েদের বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনায় অন্তত ৪০ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর খবর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। একই অভিযানে দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির আবাসিক প্রাসাদ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার তথ্য সামনে এসেছে।

গত কয়েক মাস ধরে ইইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিকও কূটনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন সশস্ত্রগোষ্ঠীকে সমর্থনের অভিযোগকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে তেহরানের সম্পর্ক ক্রমেই অবনতির দিকে যায়। বিশ্লেষকদেরমতে, সাম্প্রতিক এই হামলা দীর্ঘদিনেরসেই উত্তেজনারই সরাসরি সামরিক রূপ।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজ জানিয়েছে, মিনাবশহরের বালিকা বিদ্যালয়টিতে সরাসরি বিমান হামলা চালানো হয়। শুরুতে হতাহতেরসংখ্যা কম বলে ধারণাকরা হলেও ধ্বংসস্তূপ সরানোরসঙ্গে সঙ্গে মৃতের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। উদ্ধারকর্মীরা ভবনের ধসে পড়া অংশথেকে একের পর একশিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, হামলার সময় বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান চলছিল, যার ফলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের প্রশ্ন তুলেছে। বেসামরিক নাগরিক, বিশেষ করে শিশুদের মৃত্যুসংঘাতের নৈতিক বৈধতা নিয়ে নতুন বিতর্কতৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বাস্তবেতা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।

একইসময়ে রাজধানী তেহরানসহ একাধিক উচ্চ নিরাপত্তা স্থাপনাতেও হামলা চালানো হয়। স্যাটেলাইট চিত্রবিশ্লেষণে দেখা গেছে, আয়াতুল্লাহআলি খামেনির আবাসিক ও প্রশাসনিক কমপ্লেক্স শক্তিশালী বিস্ফোরণে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। বিস্ফোরণের পর পুরো এলাকাআগুন ও ঘন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, যাহামলার ব্যাপকতা নির্দেশ করে।

ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, এইহামলার মূল উদ্দেশ্য ছিলদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সামরিক কমান্ড কাঠামোকে দুর্বল করা। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আবাসিক অঞ্চলও হামলার আওতায় ছিল বলে জানাগেছে, যদিও নেতৃত্ব পর্যায়ে হতাহতের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশকরা হয়নি।

হামলার পরপরই ইরান পাল্টা প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেয়। দেশটির সশস্ত্রবাহিনী মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দাবি করেছে। কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি, কুয়েতের আল-সালেম ঘাঁটিএবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-ধাফরা ঘাঁটি এতে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণতহয়।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আবুধাবিতে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে অন্তত একজন নিহত হয়েছেন।এছাড়া বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর লক্ষ্যকরেও হামলার চেষ্টা চালানো হয়। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদেও শক্তিশালী বিস্ফোরণের ঘটনা নিশ্চিত হওয়ায় পুরো অঞ্চলে নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে।

এই পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য রুট এবং বৈশ্বিকঅর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর তাৎক্ষণিক চাপতৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, হরমুজ প্রণালী ঘিরে অস্থিরতা তৈরি হলে বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যে সীমিত সংঘর্ষের গণ্ডি ছাড়িয়ে পূর্ণমাত্রার আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততা বৃহত্তর শক্তিগুলোকেও সংঘাতে টেনে আনতে পারে।এতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করছেন, বেসামরিক হতাহতের ঘটনা বিশ্বজনমতকে দ্রুত প্রভাবিত করতে পারে এবংজাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ওপর যুদ্ধবিরতির চাপ বাড়াবে। বর্তমানে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রধান নজর রয়েছে পরিস্থিতিকত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যায় এবংকূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে বৃহত্তর সংঘাত এড়ানো সম্ভব হয় কি না-সেই প্রশ্নে।

মোটেরওপর, ইরানে পরিচালিত এই যৌথ হামলা শুধু একটি সামরিক অভিযাননয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিকসম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 


সম্পর্কিত নিউজ