ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধে পুড়ছে আমেরিকার ২১০ বিলিয়ন ডলার: বিপাকে মার্কিন অর্থনীতি

ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধে পুড়ছে আমেরিকার ২১০ বিলিয়ন ডলার: বিপাকে মার্কিন অর্থনীতি
ছবির ক্যাপশান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা ইরানে | এএফপি
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু হওয়ার পর থেকেই যুদ্ধের সামরিক ব্যয় ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে এর ঢেউ কতদূর ছড়াতে পারে-তা নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও নীতিবিশ্লেষকদের আলোচনা তীব্র হয়েছে।

একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, সংঘাত দীর্ঘ হলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে মোট ক্ষতির অঙ্ক ২১০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে-যার বড় অংশ আসতে পারে সরাসরি সামরিক ব্যয়, অস্ত্র–গোলাবারুদ পুনঃমজুদ, এবং তেল–জ্বালানি দামে অস্থিরতার কারণে ভোক্তা ও ব্যবসায়িক ব্যয়ের চাপ থেকে।

২১০ বিলিয়ন ডলার’ হিসাবটি কোথা থেকে এল

আন্তর্জাতিক ব্যবসা–মাধ্যম Fortune জানিয়েছে, পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়–সম্পর্কিত Penn Wharton Budget Model (PWBM)–এর পরিচালক ও বাজেট বিশ্লেষক কেন্ট স্মেটার্স যুদ্ধটি দ্রুত শেষ না হলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ক্ষতির অঙ্ক সর্বোচ্চ ২১০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন। ওই বিশ্লেষণে যুদ্ধের “লো–এন্ড” ক্ষতি ধরা হয়েছে তুলনামূলক কম, আর “আপসাইড রিস্ক” ধরা হয়েছে-যদি জ্বালানি–শিপিং খরচ ও বাজার অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হয়।

স্মেটার্সের আলোচনায় বড় দুটি ব্যয়–স্তম্ভ সামনে এসেছে-

  • সরাসরি সামরিক/বাজেট ব্যয় (অপারেশনাল খরচ, অস্ত্র–গোলাবারুদ, ক্ষয়ক্ষতি ও রিপ্লেসমেন্ট)
  • তেল–জ্বালানি শক (হরমুজ প্রণালী ঘিরে অচলাবস্থা/ঝুঁকি বাড়লে তেলের দাম ও শিপিং কস্ট বেড়ে অর্থনীতিতে চাপ)

সরাসরি যুদ্ধ–ব্যয়: “মিলিটারি ট্যাব” 

যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম দিকেই বড় অঙ্কের অর্থ খরচ হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। তুরস্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম Anadolu Agency–এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় আনুমানিক ৭৭৯ মিলিয়ন ডলার হতে পারে (বিভিন্ন খরচের ডেটা ও অনুমান মিলিয়ে)।

এদিকে, Reuters Breakingviews সতর্ক করেছে-যুদ্ধ দীর্ঘ হলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শুধু অপারেশনাল ব্যয় নয়, বরং এনার্জি ও শিপিং কস্ট বেড়ে ব্যবসা ও ভোক্তাদের ওপরও চাপ পড়বে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে “দ্বিতীয় ধাক্কা” তৈরি করতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-অস্ত্র–গোলাবারুদের মজুদ দ্রুত কমে যাচ্ছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ইরান অভিযানসহ সাম্প্রতিক বিভিন্ন সংঘাতে (ইউক্রেন, গাজা ইত্যাদি) দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রসহ অনেক অস্ত্র ব্যবহৃত হওয়ায় এখন যুক্তরাষ্ট্রের স্টকপাইল রিপ্লেনিশমেন্ট বড় এজেন্ডা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে হোয়াইট হাউসে বড় প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের সঙ্গে বৈঠকের উদ্যোগ, এবং পেন্টাগনের সম্ভাব্য অতিরিক্ত বাজেট–চাহিদার কথাও উঠে এসেছে।

তেল–জ্বালানি: হরমুজ প্রণালী ঘিরে ঝুঁকি কেন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য “মেগা বিল”

যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতি–হিসাবে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে হরমুজ প্রণালী। কারণ বৈশ্বিক তেল–গ্যাস পরিবহনের একটি বড় অংশ এই জলপথে নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্রের Energy Information Administration (EIA) বলছে, ২০২৪ সালে হরমুজ প্রণালী দিয়ে গড়ে ২০ মিলিয়ন ব্যারেল/দিন তেল প্রবাহিত হয়েছে-যা বিশ্ব পেট্রোলিয়াম তরল ভোগের প্রায় ২০%-এর সমান।

অর্থাৎ, এখানে দীর্ঘ অচলাবস্থা বা উচ্চ ঝুঁকি মানেই-

  • তেলের দামে রিস্ক প্রিমিয়াম যোগ হবে
  • ট্যাংকারের ইন্স্যুরেন্স/ফ্রেইট বাড়বে
  • শিপিং বিলম্বিত হলে রিফাইনারি ও সরবরাহ চেইনে চাপ পড়বে

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম দ্রুত বেড়েছে এবং বাজারে মুদ্রাস্ফীতির উদ্বেগ জোরালো হয়েছে-যা ভোক্তা ব্যয় ও নীতি (ফেডের সুদ) প্রত্যাশাকেও প্রভাবিত করতে পারে।

এই ঝুঁকির বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে, যখন রয়টার্স জানিয়েছে-হরমুজ অচলাবস্থার কারণে ইরাককে তেল উৎপাদন বড় মাত্রায় কমাতে হয়েছে, কারণ রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং স্টোরেজ সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
এ ধরনের উৎপাদন–কাট শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়-গ্লোবাল বাজারের ওপর চাপ বাড়ায়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত আমদানিকারক দেশগুলোর জ্বালানি–বিল ও মূল্যস্ফীতিতে গড়ায়।

জনসমর্থনও চাপে: “এক-চতুর্থাংশ” আমেরিকান সমর্থনের কথা বলছে জরিপ

অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ঘরোয়া রাজনীতি। Reuters/Ipsos জরিপে দেখা গেছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পক্ষে সমর্থন তুলনামূলক কম-মাত্র ২৭% সমর্থন, ৪৩% বিরোধিতা, এবং বাকিরা অনিশ্চিত। একই জরিপে বড় অংশের মানুষ বলেছেন, তারা আশঙ্কা করেন প্রেসিডেন্ট সামরিক শক্তি ব্যবহারে “খুব দ্রুত” সিদ্ধান্ত নেন।

এই জরিপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত-অনেক রিপাবলিকান সমর্থকও বলেছেন, মার্কিন সেনা হতাহত বা গ্যাসের দাম বাড়লে তাদের সমর্থন কমে যেতে পারে।
অর্থাৎ, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, ততই “ইনফ্লেশন + ফুয়েল প্রাইস” রাজনীতিতে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ