ট্রাম্পকে যে দুঃসংবাদ দিল মার্কিন গোয়েন্দারা

ট্রাম্পকে যে দুঃসংবাদ দিল মার্কিন গোয়েন্দারা
ছবির ক্যাপশান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প | ছবিঃ এএফপি
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের নেতৃত্ব কাঠামো “পুরোপুরি বদলে ফেলার” মতো কঠোর ভাষায় অবস্থান জানালেও, বাস্তবে তেহরানের বিদ্যমান শাসনব্যবস্থাকে সামরিক চাপে দ্রুত ভেঙে ফেলা বা ক্ষমতাচ্যুত করা অত্যন্ত কঠিন-এমন মূল্যায়নই উঠে আসছে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মহলের ভেতরের বিশ্লেষণে।

যুদ্ধ-উত্তেজনার মধ্যে ইরানে নেতৃত্ব-উত্তরাধিকার, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা কাঠামো ঘিরে যে “প্রোটোকল” ও বিকল্প ব্যবস্থাপনা আগে থেকেই তৈরি আছে-সেগুলোই মূলত শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার বড় শক্তি হিসেবে দেখছে ওয়াশিংটনের বিভিন্ন সংস্থা ও বিশ্লেষকরা।

গোয়েন্দা মূল্যায়ন: শীর্ষ নেতাদের সরিয়ে দিলেও কাঠামো টিকে থাকতে পারে

ওয়াশিংটন পোস্টকে উদ্ধৃত করে একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিল (NIC)-এর একটি শ্রেণিবদ্ধ মূল্যায়নে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে-বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালিত হলেও ইরানের শাসনব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে উৎখাত করা সহজ নয়। কারণ, তেহরান দীর্ঘদিন ধরেই সম্ভাব্য “লিডারশিপ ডিক্যাপিটেশন” বা শীর্ষ নেতৃত্বে আঘাতের পরিস্থিতি মাথায় রেখে বিকল্প নেতৃত্ব-চেইন, জরুরি প্রশাসনিক নির্দেশনা এবং নিরাপত্তা-সমন্বয়ের কার্যকর কাঠামো ধরে রেখেছে। এ মূল্যায়নের সারকথা-কেবল শীর্ষ নেতাদের সরিয়ে দিলেই রাষ্ট্রযন্ত্র ভেঙে পড়ে না; বরং শাসনব্যবস্থা নিজেকে দ্রুত পুনর্গঠিত করার সক্ষমতা দেখাতে পারে।

এ ধরনের বিশ্লেষণের সঙ্গে আরেকটি বাস্তবতা যুক্ত হচ্ছে-ইরানের অভ্যন্তরীণ বিরোধী শিবির এখনো একক নেতৃত্ব বা সমন্বিত রূপরেখায় শক্ত অবস্থান নিতে পারেনি। ফলে “গণঅভ্যুত্থান” বা আকস্মিক ক্ষমতার পালাবদল ঘটার সম্ভাবনাকে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা স্বল্পমেয়াদে অবাস্তব বলেই দেখছেন-এমনটিই বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ট্রাম্পের অবস্থান: “পরবর্তী নেতৃত্বে” ব্যক্তিগত অনুমোদনের শর্ত

ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের পরবর্তী নেতৃত্বের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র ‘নিজস্ব স্বার্থ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা’কে সামনে রাখছে। ট্রাম্প নিজে প্রকাশ্যে এমন ধারণাও দিয়েছেন যে-ইরানের নেতৃত্বে কে আসবে, সে বিষয়ে তিনি ব্যক্তিগতভাবে “গ্রহণযোগ্যতা” নির্ধারণ করতে চান। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, তিনি বিশেষ করে ক্ষমতার উত্তরাধিকার প্রশ্নে খামেনি পরিবারের ধারাবাহিকতা-বিশেষত মোজতবা খামেনির সম্ভাব্য উত্থান-নিয়ে আপত্তির সুরও তুলেছেন। ট্রাম্পের বক্তব্যের মূল সুর হলো: ইরান যদি নীতিগতভাবে বড় পরিবর্তনের পথে না যায়, তাহলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

তবে বাস্তবে সার্বভৌম রাষ্ট্রের নেতৃত্ব নির্বাচনে বাইরের “অনুমোদন” চাপিয়ে দেওয়া কতটা কার্যকর-সেটি নিয়েই পাল্টা প্রশ্ন উঠছে। কারণ, ইরানের সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো অনুযায়ী সর্বোচ্চ নেতার নির্বাচন একটি অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া; বাইরের শক্তির শর্তকে তেহরান সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবেই দেখাতে পারে।

তেহরানের জবাব: “ভাগ্য নির্ধারণ করবে জনগণ”

ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ট্রাম্পের বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করে বলছে-ইরানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ হবে ইরানি জনগণের সিদ্ধান্তে; বাইরের কোনো শক্তির জন্য এখানে জায়গা নেই। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে ইরানি পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবফের বক্তব্যও উদ্ধৃত হয়েছে-যেখানে তিনি মূলত একই অবস্থান স্পষ্ট করেছেন: ইরানের নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের প্রশ্নে বাইরের শক্তি ‘শর্ত’ আরোপ করতে পারবে না। এই পাল্টা অবস্থান দেখাচ্ছে-যুদ্ধ-চাপের মধ্যেও তেহরান রাজনৈতিকভাবে “সার্বভৌমত্ব” ইস্যুকে সামনে রেখে জনসমর্থন ধরে রাখতে চাইছে।

“পরবর্তী সুপ্রিম লিডার” প্রশ্নে কী হতে পারে

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে, ইরানের ভেতরে সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় এখন উত্তরাধিকার। কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে, অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস-যে পরিষদ সুপ্রিম লিডার নির্বাচন করে-তারা আলোচনা/পরামর্শ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে গুজব দ্রুত ছড়ায়-এ কথা মাথায় রেখে বিভিন্ন সূত্র থেকে “গুজব না ছড়ানোর” বার্তাও দেখা যাচ্ছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-এখন পর্যন্ত বহু আন্তর্জাতিক মিডিয়া বলছে, আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগে নিশ্চিতভাবে কারও নাম চূড়ান্ত বলা কঠিন; কারণ প্রক্রিয়াটি সাধারণত পর্দার আড়ালে, বহুস্তরীয় পরামর্শে এগোয়।

সামনে কী ঝুঁকি-আর কী বার্তা দিচ্ছে গোয়েন্দা রিপোর্ট

গোয়েন্দা মূল্যায়ন, ট্রাম্পের বক্তব্য এবং তেহরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া-সব মিলিয়ে একটা বিষয় স্পষ্ট:

  • যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক লক্ষ্য উচ্চস্বরে তুলে ধরলেও, মাঠপর্যায়ে “রেজিম চেঞ্জ” বাস্তবায়ন করা তাৎক্ষণিকভাবে সহজ নয়।
  • ইরান তার রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ধারাবাহিকতা ও উত্তরাধিকার প্রক্রিয়াকে দ্রুত সক্রিয় করে “স্থিতিশীলতার বার্তা” দিতে চাইবে।
  • বাইরের চাপ যত বাড়বে, ততই তেহরান “সার্বভৌমত্ব” ও “অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত”কে কেন্দ্র করে জনমত সংহত করার চেষ্টা করতে পারে।

ফলে, সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি এখন আরেকটি বড় লড়াই চলছে-রাজনৈতিক বৈধতা, উত্তরাধিকার, এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের লড়াই।


সম্পর্কিত নিউজ