জ্বালানি সংকটে মার্কিন তেলের দিকে ঝুঁকছে এশিয়া

জ্বালানি সংকটে মার্কিন তেলের দিকে ঝুঁকছে এশিয়া
ছবির ক্যাপশান, জ্বালানি সংকটে মার্কিন তেলের দিকে ঝুঁকছে এশিয়া
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহপথে অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকায় এশিয়ার একাধিক দেশ এখন বিকল্প উৎস হিসেবে মার্কিন অপরিশোধিত তেল (ক্রুড) ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG)-এর দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে ঝুঁকি ও জাহাজ চলাচলে বাধা-এশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ এই প্রণালি দিয়েই বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও এলএনজি পরিবহন হয়, আর এশিয়ার অনেক দেশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানির ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল।

কেন এশিয়া দ্রুত বিকল্প উৎস খুঁজছে

এশিয়ার বড় অর্থনীতিগুলো-জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, চীনসহ-মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল-গ্যাস আমদানি করে শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পরিবহন খাত চালায়। সংঘাতের প্রভাবে যখন হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল অনিশ্চিত হয়ে পড়ে এবং সরবরাহ শৃঙ্খল ভাঙার আশঙ্কা বাড়ে, তখন দেশগুলো সাধারণত তিনটি পথ বেছে নেয়:

  • কৌশলগত মজুদ (strategic reserves) ব্যবহার,
  • জরুরি ভিত্তিতে বিকল্প বাজার থেকে স্পট ক্রয়,
  • দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ বৈচিত্র্য বাড়ানো।

এবারও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সংকটের ধাক্কায় এশিয়ার অনেক ক্রেতা মার্কিন লাইট সুইট ক্রুড ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এলএনজি কার্গোর দিকে ঝুঁকছে-কারণ এই উৎসগুলো মধ্যপ্রাচ্যের তুলনায় ভূরাজনৈতিকভাবে ভিন্ন রুটে আসে এবং কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত স্পট ডেলিভারির সম্ভাবনাও থাকে।

এলএনজি বাজারে চাপ

সংঘাত শুরুর পর এলএনজি বাজারে অস্থিরতা আরও স্পষ্ট। রয়টার্স জানিয়েছে, কাতারএনার্জি তাদের বড় এলএনজি স্থাপনায় উৎপাদন বন্ধের প্রেক্ষাপটে শিপমেন্টে ফোর্স মেজর ঘোষণা করে এবং স্বাভাবিক সরবরাহে ফিরতে “সপ্তাহ থেকে মাস” সময় লাগতে পারে বলেও সতর্ক করেছে। একই প্রতিবেদনে দেখা যায়, সরবরাহ ঝুঁকির কারণে ইউরোপ ও এশিয়া-দুই অঞ্চলে গ্যাস ও ফ্রেইট রেট বহু বছরের উচ্চতায় ওঠে; ট্যাংকার ভাড়া কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

এদিকে, শিপট্র্যাকিং ডেটার বরাতে বেইয়ার্ড মেরিটাইম রিপোর্ট করেছে-মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ বিঘ্ন ও হরমুজ ঘিরে ঝুঁকি বাড়ায় ইউরোপগামী কয়েকটি এলএনজি ট্যাংকার এশিয়ার দিকে মোড় নিয়েছে; যুক্তরাষ্ট্র ও আফ্রিকার কার্গোও এশিয়ার দিকে ডাইভার্ট হওয়ার নজির দেখা যাচ্ছে। এশিয়ার ক্রেতারা বেশি দাম দিয়ে কার্গো “টেনে” নিচ্ছে-এটাই বাজারের বাস্তবতা।

তেলের ক্ষেত্রে কী বদলাচ্ছে

তেলের বাজারে এশিয়ার চাহিদার বড় অংশ ঐতিহাসিকভাবে মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপানসহ কয়েকটি দেশ মার্কিন লাইট সুইট ক্রুড আমদানি বাড়াচ্ছে-একদিকে অর্থনৈতিক সুবিধা, অন্যদিকে জ্বালানি নিরাপত্তার কারণে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল (প্ল্যাটস)–এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জাপানি রিফাইনাররা ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কমাতে এবং সরবরাহ পোর্টফোলিও ভারসাম্য আনতে মার্কিন ক্রুডের দিকে আগ্রহ বাড়াচ্ছে।

সংঘাতের মধ্যে এই প্রবণতা আরও জোরালো হচ্ছে-কারণ ক্রেতাদের কাছে এখন প্রধান প্রশ্ন হলো: “কার্গো সময়মতো আসবে তো?” মধ্যপ্রাচ্য থেকে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিতে পড়লে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা কার্গো অনেকের কাছে তুলনামূলক নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয় (যদিও দূরত্ব বেশি হওয়ায় ফ্রেইট খরচ বাড়তে পারে)।

হরমুজ প্রণালি-ঝুঁকির কেন্দ্রে

সংঘাত বাড়ায় হরমুজ প্রণালি নিয়ে উদ্বেগ তীব্র হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরান-সংক্রান্ত অভিযানে মাইন-লেয়িং ভেসেল ও সংশ্লিষ্ট সক্ষমতা লক্ষ্য করে হামলার কথা জানিয়েছে; একই সঙ্গে ট্যাংকার চলাচল, বীমা ও নিরাপত্তা ব্যয়-সবকিছুই বাজারকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে।

এই প্রণালি কার্যত বাধাগ্রস্ত হলে শুধু তেল নয়-এলএনজি, পেট্রোকেমিক্যাল, কনটেইনার শিপিং এবং এমনকি এশিয়া–ইউরোপ এয়ার কার্গো রুটও প্রভাবিত হয়। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে পরিবহন বিঘ্নিত হওয়ায় জাহাজ ও বিমান চলাচলে জটিলতা বাড়ছে এবং এর প্রভাব বিশ্ব বাণিজ্যেও ছড়াচ্ছে।

মজুদ দিয়ে কতদিন চলবে-এশিয়ার দুশ্চিন্তা

এশিয়ার কিছু দেশ স্বল্পমেয়াদে মজুদ ব্যবহার করে চাপ সামাল দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ধারাবাহিক সরবরাহ না থাকলে শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ বাড়ে। এপি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়ার অনেক দেশ (জাপান, কোরিয়া, তাইওয়ান, ভারত ইত্যাদি) মধ্যপ্রাচ্য নির্ভরতার কারণে বিশেষভাবে ঝুঁকিতে-এবং সংকট আবারও দেখিয়ে দিল, জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্য ও বিকল্প রুট/জ্বালানির দিকে যাওয়া কতটা জরুরি।

মার্কিন তেল–গ্যাস কি ঘাটতি পূরণ করতে পারবে?

বিশ্লেষকদের বড় প্রশ্ন এখানেই। স্বল্পমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের কার্গো দিয়ে কিছুটা ঘাটতি সামাল দেওয়া গেলেও, মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল অংশের সরবরাহ দীর্ঘদিন থমকে গেলে তা পূরণ করা সহজ নয়-কারণ উৎপাদন সক্ষমতা, রপ্তানি অবকাঠামো এবং ট্যাংকার-উপলব্ধতা-সবকিছু মিলেই সীমা তৈরি করে। কাতারএনার্জির ফোর্স মেজর ও ট্যাংকার ভাড়ার দ্রুত উত্থান দেখাচ্ছে, সরবরাহ “থাকলেও” বাজারে পৌঁছানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।


সম্পর্কিত নিউজ