{{ news.section.title }}
দুই সপ্তাহের সংঘর্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ক্ষয়ক্ষতি কত?
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের মাত্র দুই সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ক্ষতির পরিমাণ কয়েকশ কোটি ডলারে পৌঁছেছে বলে দাবি করা হয়েছে বিভিন্ন সামরিক বিশ্লেষণে। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা Anadolu Agency–এর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস হয়েছে এবং যুদ্ধ পরিচালনায় মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ২৮০০ কোটি ডলার।
এই বিপুল ব্যয়ের বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেও আলোচনা শুরু হয়েছে। মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি সভা (United States House of Representatives)–এর এক ডেমোক্র্যাট সদস্য যুদ্ধের প্রকৃত ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। তিনি এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট বিশ্লেষণ সংস্থা কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস (Congressional Budget Office)–কে চিঠি পাঠিয়েছেন। তবে এ পর্যন্ত মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন (Pentagon) আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের মোট ব্যয়ের কোনো বিস্তারিত হিসাব প্রকাশ করেনি।
ক্ষতির বড় অংশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায়
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে তাদের অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায়। বিশেষ করে THAAD ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা–সংক্রান্ত অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান ও সৌদি আরবে স্থাপিত অন্তত চারটি AN/TPY-2 রাডার ধ্বংস হয়ে গেছে। এই রাডারগুলোর সম্মিলিত মূল্য প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার।
এছাড়া কাতারের গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন ঘাঁটি Al Udeid Air Base–এ একটি AN/FPS-132 পূর্বসতর্কতা রাডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার।
ড্রোন ও যুদ্ধবিমান ধ্বংস
যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১১টি MQ-9 Reaper ড্রোন ধ্বংস হয়েছে, যার মোট আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৩৩০ মিলিয়ন ডলার।
এছাড়া কুয়েতের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সংঘর্ষে তিনটি F-15E Strike Eagle যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে। প্রতিটি বিমানের মূল্য বিবেচনায় এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৮২ মিলিয়ন ডলার।
এর পাশাপাশি পশ্চিম ইরাকে একটি KC-135 Stratotanker জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ধ্বংস হয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৮০ মিলিয়ন ডলার।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি Naval Support Activity Bahrain–এও হামলার ঘটনা ঘটেছে। সেখানে দুটি স্যাটেলাইট যোগাযোগ টার্মিনাল এবং কয়েকটি বড় স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে কুয়েতের Camp Arifjan ঘাঁটিতে তিনটি রাডোম ধ্বংস হয়েছে, যার ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার।
সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জামের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৮৪ কোটি ডলার বলে অনুমান করা হচ্ছে।
যুদ্ধ পরিচালনার ব্যয় আরও বেশি
অস্ত্র ও সরঞ্জামের ক্ষতির বাইরে যুদ্ধ পরিচালনায় প্রতিদিন বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। মার্কিন সংবাদপত্র The New York Times–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে।
কংগ্রেসের কিছু সূত্রের মতে, প্রতিদিন যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার। আবার কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, প্রকৃত ব্যয় প্রতিদিন প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি হতে পারে।
কেন এত ব্যয়বহুল এই যুদ্ধ
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত এত ব্যয়বহুল হওয়ার কয়েকটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, ইরানের তুলনামূলক কমদামি ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র যে ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে, সেগুলোর প্রতিটির দাম প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ডলার। ফলে স্বল্পমূল্যের হামলা ঠেকাতে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, ইরানে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হচ্ছে-যেমন F-35 Lightning II, F/A-18 Super Hornet, B-2 Spirit এবং B-1B Lancer। এসব বিমানের প্রতিটির উড্ডয়ন ব্যয় ঘণ্টাপ্রতি প্রায় ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিমানবাহী রণতরীর বিশাল ব্যয়। একটি Aircraft carrier পরিচালনায় প্রতিদিন প্রায় ৬০ থেকে ৮০ লাখ ডলার ব্যয় হয়।
বিপুল সামরিক মোতায়েন
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক Center for Strategic and International Studies–এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ১০০ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্র ২০০০টির বেশি যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এই অস্ত্রগুলোর মজুদ পুনরায় পূরণ করতে প্রায় ৩ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে।
এছাড়া যুদ্ধের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক সামরিক শক্তি মোতায়েন করেছে। সামরিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে এই অঞ্চলে ১২০টিরও বেশি সামরিক বিমান মোতায়েন করা হয়েছে-যা Iraq War 2003–এর পর সবচেয়ে বড় মোতায়েন বলে মনে করা হচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ চাপও বাড়ছে
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেট বিশাল-প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার-তবু এই যুদ্ধ ব্যয় নিয়ে দেশটির অভ্যন্তরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) প্রশাসন অতিরিক্ত ৫০ বিলিয়ন ডলার প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধির প্রস্তাবও দিয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, অর্থের চেয়ে বড় সমস্যা এখন দ্রুত অস্ত্র পুনরায় উৎপাদনের সক্ষমতা। অনেক উন্নত অস্ত্র দ্রুত তৈরি বা মেরামত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে বিকল্প সরঞ্জাম সংগ্রহ কিংবা নতুন উৎপাদন বাড়ানোর পথ খুঁজতে হচ্ছে।