শতাধিক সেনা নিয়ে কলম্বিয়ার বিমান বিধ্বস্ত

শতাধিক সেনা নিয়ে  কলম্বিয়ার বিমান বিধ্বস্ত
ছবির ক্যাপশান, ছবি : রয়টার্স

কলম্বিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে সামরিক পরিবহন বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৬৬ জনে পৌঁছেছে। এখনও অন্তত ৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে সর্বশেষ তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো। দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান এবং প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার পর ব্যাপক উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে বহু আহতকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও হতাহতের প্রকৃত চিত্র দ্রুতই ভয়াবহ রূপ নেয়। ঘটনাটি ইতোমধ্যে কলম্বিয়ার সামরিক সক্ষমতা, পুরোনো উড়োজাহাজ ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিরক্ষা খাত আধুনিকায়ন নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

কোথায় এবং কীভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে

বিমানটি বিধ্বস্ত হয় সোমবার (২৩ মার্চ), কলম্বিয়ার পুতোমায়ো বিভাগের পুয়ের্তো লেগুইজামা শহরের কাছে, পেরু সীমান্তসংলগ্ন অঞ্চলে। এটি ছিল লকহিড মার্টিন নির্মিত একটি হারকিউলিস সি-১৩০ সামরিক পরিবহন বিমান। রিপোর্ট অনুযায়ী, উড্ডয়নের পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই-এয়ারপোর্ট ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যে-বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ে। মার্কিন ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি বিমানবন্দর থেকে খুব বেশি দূরে যেতে পারেনি; কিছু সূত্রে বলা হয়েছে, দুই কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে গিয়ে বিধ্বস্ত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ফুটেজে ধোঁয়া, আগুন এবং জঙ্গলে ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়।

বিমানে কারা ছিলেন

কলম্বিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল হুগো আলেহান্দ্রো লোপেসের বরাতে জানা গেছে, বিমানটিতে মোট ১২৮ জন ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১১ জন বিমান বাহিনীর সদস্য, ১১৫ জন স্থলবাহিনীর সদস্য এবং ২ জন জাতীয় পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও রয়টার্স জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে কলম্বিয়ান বিমান বাহিনীর সদস্য, সেনাসদস্য এবং পুলিশ সদস্য-সব শ্রেণির নিরাপত্তা কর্মীই রয়েছেন। বেঁচে যাওয়া ৫৭ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে; তাঁদের মধ্যে অন্তত ৩০ জনের আঘাত গুরুতর নয়। তবে আরও কয়েকজনের অবস্থা জটিল বলেও বিভিন্ন রিপোর্টে উঠে এসেছে।

উদ্ধার তৎপরতায় স্থানীয়দের ভূমিকা

দুর্ঘটনার পর আনুষ্ঠানিক উদ্ধারকারী দল পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় বাসিন্দারা এগিয়ে আসেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনাস্থলের দূরবর্তী অবস্থান এবং জটিল ভূপ্রকৃতির কারণে প্রাথমিক উদ্ধারকাজে স্থানীয়দের সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন ভিডিও ও ছবিতে দেখা গেছে, আহত সেনাদের মোটরসাইকেলে তুলে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পরে সামরিক ও বেসামরিক উদ্ধারকারী দল, দমকল সদস্য এবং চিকিৎসাকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের সরিয়ে নেওয়া শুরু করেন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসও স্থানীয় সহায়তাকে উদ্ধার অভিযানের প্রথম ধাপ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ কী

ঘটনার কারণ এখনও চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হয়নি। তবে প্রাথমিক তদন্তে যান্ত্রিক ত্রুটির ইঙ্গিত মিলছে। রয়টার্স জানায়, বিমানটি উড্ডয়নের সময় একটি গাছের ডালে আঘাত করেছিল, তারপর আগুন ধরে যায় এবং বিমানে থাকা বিস্ফোরক বা দাহ্য উপকরণ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমানটিতে প্রযুক্তিগত গোলযোগের সম্ভাবনা আছে, যদিও কোনো বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হামলার প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, এটি আপাতত দুর্ঘটনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে, কিন্তু তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সরকার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত দিচ্ছে না।

বিমানটি কতটা পুরোনো ছিল

এ দুর্ঘটনার পর বিমানটির বয়স ও ব্যবহারের ইতিহাস নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্য অনুযায়ী, উড়োজাহাজটি ছিল যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০২০ সালে হস্তান্তর করা একটি সি-১৩০, যা ২০২৩ সালে ওভারহল বা সংস্কার করা হয়েছিল। কলম্বিয়ার প্রতিরক্ষা খাতের জন্য এটি ছিল তথাকথিত আধুনিকায়ন কর্মসূচির অংশ। কিন্তু এত বড় দুর্ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে-পুরোনো প্ল্যাটফর্ম নিয়ে আধুনিকায়নের এই কৌশল কতটা কার্যকর ছিল।

প্রেসিডেন্ট পেত্রোর প্রতিক্রিয়া

কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো দুর্ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিরক্ষা বাহিনী আধুনিকায়নের উদ্যোগ বহুবার নেওয়া হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তা বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রয়টার্স ও এপি-দুই মাধ্যমই উল্লেখ করেছে যে, পেত্রো এই দুর্ঘটনাকে প্রতিরক্ষা খাতের সংস্কার বিলম্বের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। একই সঙ্গে তাঁর সমালোচকেরা পাল্টা দাবি করেছেন, সামরিক উড়োজাহাজ চালকদের পর্যাপ্ত ফ্লাইট আওয়ার বা প্রশিক্ষণঘণ্টা কমে যাওয়াও একটি কারণ হতে পারে। ফলে এই দুর্ঘটনা এখন কেবল একটি বিমানদুর্ঘটনা নয়; এটি প্রতিরক্ষা প্রশাসন, নীতিনির্ধারণ এবং বাজেট ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও সামনে এনেছে।

জাতীয় শোক ও তদন্তের দাবি

দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন বলছে, কলম্বিয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ সামরিক বিমান দুর্ঘটনাগুলোর একটি। দুর্ঘটনার পর নিহতদের স্বজনদের জন্য সহায়তা, আহতদের চিকিৎসা এবং নিখোঁজদের খোঁজে অনুসন্ধান একসঙ্গে চলছে। একই সঙ্গে এই দুর্ঘটনা ল্যাটিন আমেরিকাজুড়ে সামরিক পরিবহন বিমানের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু করেছে।

সূত্র : রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ