১৬৫ বছরের প্রথা ভেঙে ডলারে ট্রাম্পের স্বাক্ষর

১৬৫ বছরের প্রথা ভেঙে ডলারে ট্রাম্পের স্বাক্ষর
ছবির ক্যাপশান, ১৬৫ বছরের প্রথা ভেঙে ডলারে ট্রাম্পের স্বাক্ষর

যুক্তরাষ্ট্রের কাগজের মুদ্রায় বড় একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। দেশটির ট্রেজারি বিভাগ জানিয়েছে, স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে নতুন সিরিজের ডলারে যুক্ত হবে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষর। এর মধ্য দিয়ে ১৮৬১ সালে ফেডারেল কাগুজে মুদ্রা চালুর পর প্রথমবারের মতো কোনো ক্ষমতাসীন মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর সরাসরি ব্যাংকনোটে যুক্ত হতে যাচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও রয়টার্স-দু’টিই এই সিদ্ধান্তকে ১৬৫ বছরের রেওয়াজ ভাঙার ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছে।

কী ঘোষণা দিয়েছে ট্রেজারি

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন নকশার কাগুজে মুদ্রা ২০২৬ সালের গ্রীষ্ম থেকে চালু হবে এবং প্রথম পর্যায়ে ১০০ ডলারের নোটে ট্রাম্পের স্বাক্ষর থাকবে। একই নোটে ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের স্বাক্ষরও থাকবে। এতদিন মার্কিন ব্যাংকনোটে নিয়ম অনুযায়ী ট্রেজারি সেক্রেটারি এবং ট্রেজারারের স্বাক্ষর থাকত। নতুন সিদ্ধান্তে ট্রেজারারের স্বাক্ষরের জায়গায় প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর যুক্ত হচ্ছে। এই পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি, অর্থাৎ “সেমিকুইনসেন্টেনিয়াল” উদযাপনের অংশ হিসেবে আনা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।

১৬৫ বছরের ধারায় কী বদল আসছে

এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো, এতে বহু দশকের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ধারার অবসান ঘটছে। রয়টার্স জানায়, ১৮৬১ সাল থেকে মার্কিন কাগুজে মুদ্রায় ট্রেজারারের স্বাক্ষর ছিল একটি স্থায়ী উপাদান। নতুন সিরিজে সেই ঐতিহ্য সরিয়ে দিয়ে বসানো হচ্ছে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বর্তমান ট্রেজারার ব্র্যান্ডন বিচ এবং সাবেক ট্রেজারার লিন মালেরবা-দু’জনই এই পরিবর্তনকে সমর্থন করেছেন। লিন মালেরবা হবেন সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যের শেষ প্রতিনিধি, যার স্বাক্ষর মার্কিন নোটে ছিল।

কোন নোটে আগে আসবে

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন ১০০ ডলারের নোট ছাপানো শুরু হবে শিগগিরই এবং তা ধাপে ধাপে বাজারে ছাড়া হবে। অর্থাৎ পুরোনো নোট হঠাৎ করে বাতিল হচ্ছে না; বরং নতুন ও পুরোনো দুই ধরনের নোটই একসঙ্গে কিছু সময় বাজারে চলবে। বর্তমানে প্রচলিত জ্যানেট ইয়েলেন ও লিন মালেরবার স্বাক্ষরযুক্ত নোটগুলোও বৈধ থাকবে। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে মুদ্রা বদলের কোনো বাধ্যবাধকতা থাকছে না।

কেন এই পদক্ষেপ

ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এই সিদ্ধান্তকে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক অর্জন ও ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস লিখেছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে ফেডারেল প্রতীক, প্রতিষ্ঠান এবং স্মারক ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্টের উপস্থিতি জোরালো করার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে ট্রাম্পের ছবি-সংবলিত একটি স্মারক স্বর্ণমুদ্রার নকশা অনুমোদনের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ নতুন নোটে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর যুক্ত করার সিদ্ধান্তটি আলাদা কোনো ঘটনা নয়; বরং বৃহত্তর এক প্রতীকী প্রচেষ্টার অংশ।

আইনি প্রশ্ন কোথায়

এই সিদ্ধান্ত ঘিরে আইনগত বিতর্কও দেখা দিয়েছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী জীবিত ব্যক্তির প্রতিকৃতি সাধারণ প্রচলিত মুদ্রায় ব্যবহার করা যায় না। তবে রয়টার্স ও এপি দু’টিই বলছে, কাগুজে নোটের নকশা ও নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনের ব্যাপারে ট্রেজারি বিভাগের যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে। নোটের মূল প্রতিকৃতি, যেমন বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের ছবি, আগের মতোই থাকবে। “In God We Trust” স্লোগানও অপরিবর্তিত থাকবে। বদল আসবে কেবল স্বাক্ষর অংশে। ফলে প্রেসিডেন্টের ছবি নয়, তাঁর স্বাক্ষর যুক্ত হওয়ায় এটি বিদ্যমান আইনের মধ্যে থেকেই করা হচ্ছে বলে প্রশাসনের যুক্তি।

সমর্থন ও সমালোচনা

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেমোক্র্যাট নেতারা এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, এমন এক সময়ে প্রশাসন অর্থনৈতিক চাপ, যুদ্ধ এবং মূল্যবৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর মুখে রয়েছে, তখন মুদ্রায় প্রেসিডেন্টের নাম-স্বাক্ষর বসানো রাজনৈতিক প্রতীকচর্চাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। অন্যদিকে সমর্থকেরা একে প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন। এই দ্বৈত প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে, নতুন ডলার শুধু অর্থনৈতিক নথি নয়, রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়ও হয়ে উঠতে পারে।

এর তাৎপর্য কী

যুক্তরাষ্ট্রের কাগুজে মুদ্রা বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী আর্থিক প্রতীক। সেই মুদ্রায় ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর যুক্ত হওয়া শুধু কারিগরি পরিবর্তন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় পরিচয়, ক্ষমতার প্রতীক এবং রাজনৈতিক বার্তারও অংশ। বিশেষ করে স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকীর প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্তকে প্রশাসন ঐতিহাসিক উদযাপনের অংশ হিসেবে তুলে ধরছে। তবে সমালোচকেরা মনে করছেন, এর মাধ্যমে ফেডারেল প্রতীক ব্যবস্থায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান হচ্ছে। এই দুই ব্যাখ্যার মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে নতুন ডলারের গল্প।

 

সূত্র: রয়টার্স 


সম্পর্কিত নিউজ