{{ news.section.title }}
পাকিস্তানের বিমান হামলায় আফগানিস্তানে উত্তেজনা, দুই পক্ষের পাল্টা দাবি
আফগানিস্তানের ভেতরে “সন্ত্রাসীদের আস্তানা” লক্ষ্য করে সীমান্তপারের হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান - এমনটাই জানিয়েছে ইসলামাবাদ। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির ভেতরে একের পর এক আত্মঘাতী হামলা ও সহিংসতার পেছনে আফগান ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত যোদ্ধারা জড়িত - এ অভিযোগের ভিত্তিতেই তারা অভিযান চালিয়েছে। পাল্টা বক্তব্যে তালেবান প্রশাসন বলছে, এসব হামলায় নারী ও শিশুসহ বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছেন, যা তারা “অপরাধ” হিসেবে দেখছে।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে পাকিস্তান–তালেবানশাসিত আফগানিস্তানের সম্পর্ক আবারও চাপের মুখে পড়ল। গত কয়েক মাস ধরে সীমান্ত এলাকায় ছোট-বড় সংঘর্ষ, সীমান্তক্রসিং বন্ধ, কূটনৈতিক বাকযুদ্ধ - সব মিলিয়ে যে উত্তেজনা জমছিল, রোববার ভোরের হামলা সেটিকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে এনে দিয়েছে।
কী ঘটেছে: কখন, কোথায়, কীভাবে
দুই দেশ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) ভোরে আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালায় পাকিস্তান। আফগান সূত্রগুলো বলছে, অন্তত দুটি প্রদেশ - পাখতিকা এবং নানগারহার - এ হামলার আওতায় এসেছে। একটি ক্ষেত্রে একটি মাদ্রাসা লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার কথাও বলা হয়েছে।
পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, তারা “গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে” তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও তাদের সহযোগীদের সাতটি গোপন আস্তানা ও ক্যাম্প লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। বিবৃতিতে ইসলামিক স্টেট-সম্পর্কিত একটি সংগঠনের ক্যাম্পেও হামলার কথা উল্লেখ করা হয়।
পাকিস্তান বলছে, এসব অভিযান ছিল “ইন্টেলিজেন্স-বেসড” এবং “সিলেকটিভ” - অর্থাৎ নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে সীমিত আঘাত। তবে আফগানিস্তানের পক্ষ থেকে বেসামরিক হতাহতের যে অভিযোগ উঠেছে, সেটি পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
পাকিস্তানের যুক্তি: ‘অকাট্য প্রমাণ’ আর ‘খারিজি’ শব্দের ব্যবহার
ইসলামাবাদের বক্তব্যের কেন্দ্রে আছে সাম্প্রতিক কয়েকটি ভয়াবহ হামলা। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের কাছে “কনক্লুসিভ/অকাট্য প্রমাণ” রয়েছে - পাকিস্তানের ভেতরে সংঘটিত হামলাগুলো আফগানিস্তানে অবস্থানরত নেতৃত্বের নির্দেশনায় হয়েছে। পাকিস্তান তাদের বিবৃতিতে টিটিপি-কে “খারিজি” বলেও উল্লেখ করেছে - এটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানি নীতিবক্তব্যে ঘুরে ফিরে দেখা যায়।
পাকিস্তানের দাবি -
- বাজাউর জেলায় সাম্প্রতিক আত্মঘাতী হামলা,
- বান্নুতে নিরাপত্তা বহর লক্ষ্য করে আত্মঘাতী হামলা,
- ইসলামাবাদের একটি শিয়া মসজিদে বোমা হামলা -
এসব ঘটনার পেছনে আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে ইসলামাবাদের মসজিদ হামলার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে, কারণ এতে বহু হতাহত হয় এবং এর দায় স্বীকার করে ইসলামিক স্টেট।
কোন ঘটনাগুলো পাকিস্তানের ক্ষোভ বাড়িয়েছে
১) বাজাউর হামলা: ১১ সেনা ও এক শিশুর মৃত্যু
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজাউরে এক আত্মঘাতী হামলায় ১১ নিরাপত্তা সদস্য ও এক শিশু নিহত হয়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বক্তব্য অনুযায়ী, হামলায় টিটিপি জড়িত - এ ঘটনার পরই সীমান্তঘেঁষা নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়।
২) বান্নুতে হামলা: দুই সেনা নিহত
এপি জানায়, বান্নুতে একটি নিরাপত্তা বহর লক্ষ্য করে আত্মঘাতী হামলায় দুই সেনা নিহত হন; নিহতদের একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সেদিনই বলে - যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে ‘যেখানেই থাকুক’ ব্যবস্থা নেওয়া হবে - যা সীমান্তপারের অভিযানের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়।
এই দুই ঘটনার পাশাপাশি আগের দিনগুলোতে আরও সহিংসতার খবর এসেছে, যা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
আফগানিস্তানের প্রতিক্রিয়া: ‘বেসামরিক’ অভিযোগ, নীরবতা ভাঙার ইঙ্গিত
রোববারের হামলার পর তালেবান প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে সব অভিযোগ-অভিযোগের বিস্তারিত প্রকাশ না করলেও আফগান সূত্রগুলো বলেছে, আঘাতপ্রাপ্ত এলাকায় নারী ও শিশুসহ বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে আফগান সূত্র উল্লেখ করে বলা হয় - পাখতিকা ও নানগারহারে হামলা হয়েছে।
এর আগে এমন পরিস্থিতিতে তালেবান প্রশাসন পাকিস্তানের হামলার কারণে শিশুসহ হতাহতের অভিযোগ করেছে - রয়টার্সের একটি আগের প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের নভেম্বরের একটি ঘটনায় নয় শিশু ও এক নারী নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছিল, এবং কাবুল “জবাব” দেওয়ার কথাও বলেছিল। বর্তমান হামলার প্রেক্ষাপটে সেই পুরোনো স্মৃতি আবারও টেনে আনছে বিশ্লেষকরা - কারণ একই ধরনের অভিযোগ, একই ধরনের সীমান্ত উত্তেজনা বারবার ফিরে আসছে।
কেন এই উত্তেজনা বারবার ফিরে আসে: সীমান্ত, আশ্রয়, আর ‘স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ’
পাকিস্তান–আফগানিস্তান সীমান্ত এলাকাটি বহু বছর ধরেই সংঘাতপ্রবণ। পাকিস্তানের অভিযোগ - টিটিপি আফগানিস্তানে আশ্রয় পায় এবং সেখান থেকে পাকিস্তানের ভেতর হামলা চালায়। কাবুল বরাবরই বলে এসেছে - তারা তাদের ভূখণ্ড অন্য দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেবে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সীমান্তের ভূপ্রকৃতি দুর্গম, নিয়ন্ত্রণ কঠিন এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর চলাচল বহুদিনের পরিচিত সমস্যা।
গবেষণা-ভিত্তিক বিশ্লেষণেও দেখা যায়, ২০২১ সালে তালেবান আফগানিস্তানে ক্ষমতায় ফেরার পর টিটিপি নতুনভাবে আত্মবিশ্বাসী ও শক্তিশালী হয়েছে - এমন ধারণা আন্তর্জাতিক গবেষণা মহলে রয়েছে। এই প্রেক্ষাপট পাকিস্তানের নিরাপত্তা নীতিতে বড় চাপ তৈরি করে।
আরেকটি মাত্রা হলো আইএস-খোরাসান (IS-KP)। পাকিস্তান বলছে, তারা টিটিপি ছাড়াও আইএস-সম্পর্কিত একটি ক্যাম্প লক্ষ্য করেছে। আইএস-খোরাসান আফগানিস্তানেও তালেবানের প্রতিদ্বন্দ্বী; আবার সীমান্তপারের সহিংসতার সঙ্গেও মাঝে মাঝে এদের নাম আসে। ফলে নিরাপত্তা চিত্রটি একমাত্রিক নয় - এটা বহু গোষ্ঠীর ও বহু স্বার্থের জটিল মিশ্রণ।
হামলার পর কী ঝুঁকি বাড়ছে: বাণিজ্য, যাতায়াত, সীমান্ত ক্রসিং
সীমান্ত উত্তেজনা বাড়লে সবচেয়ে দ্রুত যে প্রভাবটা পড়ে, তা হলো সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ হয়ে যাওয়া। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ব্যাহত হয়, রোগী-যাত্রী চলাচল কমে যায়, ট্রানজিট পণ্য আটকে পড়ে। অতীতেও দেখা গেছে - সামরিক উত্তেজনা বাড়লেই টর্কহামসহ গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিংগুলো বন্ধ বা সীমিত করা হয়। এ ধারা দীর্ঘ হলে দুই দেশেই বাজার ও সরবরাহব্যবস্থায় চাপ পড়ে।
এপি জানিয়েছে, দুই দেশের সম্পর্কে আগেও টানাপোড়েন ছিল এবং সাম্প্রতিক সংঘর্ষগুলো আবার সেই উত্তেজনাকে সামনে এনেছে।
আন্তর্জাতিক মাত্রা: কূটনীতি, মধ্যস্থতা, ‘চাপ’
সীমান্ত উত্তেজনা কমাতে অতীতে কূটনৈতিক মধ্যস্থতার ভূমিকা দেখা গেছে। যেমন ২০২৫ সালের উত্তেজনার সময়ে মধ্যস্থতার বিভিন্ন উদ্যোগের কথা রিপোর্টে এসেছে। যদিও বর্তমান ঘটনার পর তাত্ক্ষণিক কোনো নতুন উদ্যোগ প্রকাশ্যে আসেনি, তবে দুই পক্ষের বিবৃতির ভাষা যেভাবে কড়া হয়েছে - তা কূটনৈতিক চ্যানেল সক্রিয় রাখার প্রয়োজনীয়তাই বাড়ায়।
পাকিস্তান চায় আফগানিস্তানের তালেবান সরকার আন্তর্জাতিক চাপের মুখে টিটিপির বিরুদ্ধে কঠোর হোক। অন্যদিকে তালেবান প্রশাসন নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তার যুক্তি তুলে ধরে পাকিস্তানের হামলাকে অযৌক্তিক বলার চেষ্টা করে। এই টানাপোড়েন চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগও বাড়তে পারে - বিশেষ করে যদি বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা নিয়ে নিশ্চিত তথ্য সামনে আসে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: “লক্ষ্যভিত্তিক” হামলা কি সমস্যার সমাধান করে, নাকি নতুন সংকট তৈরি করে?
পাকিস্তান যে ভাষায় অভিযান ব্যাখ্যা করছে - “ইন্টেলিজেন্স বেসড, সিলেকটিভ” - এতে তারা বার্তা দিতে চাইছে যে, তাদের লক্ষ্য সাধারণ মানুষ নয়; লক্ষ্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর অবকাঠামো। কিন্তু সীমান্তের বাস্তবতায় সামরিক অভিযানে বেসামরিক ক্ষতি পুরোপুরি এড়ানো কঠিন - এটা আফগানিস্তানের অভিযোগের মধ্যেই স্পষ্ট।
আরেকটি বাস্তবতা হলো - একটি হামলা পরের হামলার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আফগানিস্তানের ভেতরে আঘাতের প্রতিক্রিয়ায় কাবুল কূটনৈতিকভাবে কঠোর হতে পারে, সীমান্তে উত্তেজনা বাড়তে পারে, আবার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও এটিকে নিজেদের প্রচারণায় ব্যবহার করতে পারে - এমন শঙ্কা থাকেই। একই সঙ্গে পাকিস্তানের ভেতরে জনমতও গুরুত্বপূর্ণ: ধারাবাহিক আত্মঘাতী হামলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর মৃত্যুর পর সরকারকে শক্ত অবস্থান দেখাতে চাপের মুখে পড়তে হয়।
প্রেক্ষাপট এক নজরে
- পাকিস্তান বলছে: টিটিপি ও আইএস-সম্পর্কিত ক্যাম্পসহ সাতটি স্থাপনায় “লক্ষ্যভিত্তিক” হামলা।
- আফগান সূত্র বলছে: পাখতিকা ও নানগারহারে হামলা; বেসামরিক হতাহতের আশঙ্কা।
- সাম্প্রতিক বড় হামলা: বাজাউরে ১১ সেনা ও এক শিশু নিহত; বান্নুতে দুই সেনা নিহত।
- অতীতেও এমন অভিযোগ–পাল্টা অভিযোগ হয়েছে; ২০২৫ সালের ঘটনায় শিশু নিহতের অভিযোগে উত্তেজনা চরমে উঠেছিল।
সামনে কী হতে পারে
এই মুহূর্তে তিনটি সম্ভাব্য পথ সবচেয়ে বাস্তব মনে হচ্ছে -
১) কূটনৈতিক চাপ বাড়বে: পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মহলে তালেবানকে দায়ী করার চেষ্টা করবে, আর তালেবান পাকিস্তানের হামলাকে “সীমান্ত লঙ্ঘন” হিসেবে তুলে ধরবে।
২) সীমান্তে ‘লো-ইনটেনসিটি’ সংঘর্ষ চলতে পারে: বড় যুদ্ধ নয়, কিন্তু ক্রসিং বন্ধ, ছোট সংঘর্ষ, ড্রোন/আকাশপথে নজরদারি - এসব বাড়তে পারে।
৩) অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা অভিযানের চাপ বাড়বে: পাকিস্তানে টিটিপি-সহ অন্যান্য গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান আরও বাড়তে পারে, এবং সীমান্তপারের ‘স্ট্রাইক’ নীতি আরও দৃশ্যমান হতে পারে।
শেষ কথা
পাকিস্তান বলছে - দেশের ভেতরে রক্তক্ষয়ী হামলার “উৎস” সীমান্তপারের ঘাঁটি, তাই আঘাত অনিবার্য। তালেবান বলছে - এই আঘাতের মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারী ও শিশু। দুই অবস্থানের মাঝখানে পড়ে আছে সীমান্ত অঞ্চলের বাস্তবতা: নিরাপত্তা সংকট, অস্পষ্ট নিয়ন্ত্রণ, এবং রাজনৈতিক অবিশ্বাস।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো - সন্ত্রাস দমন করতে গিয়ে যেন এমন এক নতুন সংকট তৈরি না হয়, যা আরও দীর্ঘমেয়াদে পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তোলে।