{{ news.section.title }}
তেল আবিবে মোদি–নেতানিয়াহু বৈঠক: নতুন জোট রাজনীতিতে পাকিস্তান কি চাপের মুখে?
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আবারও ইসরায়েল সফরে গেছেন। বুধবার তেল আবিবে পৌঁছানোর পরই স্পষ্ট হয়ে যায়, এটি কেবল সৌজন্য সফর নয়; বরং আঞ্চলিক রাজনীতির এক নতুন সমীকরণের অংশ। ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো ভারতের কোনো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইসরায়েল সফর করেছিলেন মোদি। এবার তাঁর দ্বিতীয় সফর এমন এক সময়ে, যখন মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
তেল আবিবে তাঁকে আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা জানান ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। যদিও নেতানিয়াহুকে ঘিরে আন্তর্জাতিক বিতর্ক তুঙ্গে বিশেষ করে গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। তবু এসব বিতর্ক নয়াদিল্লির কৌশলগত হিসাব-নিকাশে বড় কোনো প্রভাব ফেলেনি বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। বরং সফরটি দুই দেশের নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর অংশীদারত্বকে আরও এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রস্তাবিত ‘ষড়ভুজ’ জোটের ভাবনা
মোদির সফরের কয়েক দিন আগে ইসরায়েলি মন্ত্রিসভা বৈঠকে নেতানিয়াহু একটি নতুন আঞ্চলিক কাঠামোর কথা বলেন, যেটিকে তিনি ‘হেক্সাগন অ্যালায়েন্স’ বা ষড়ভুজ জোট হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রস্তাবিত এই জোটে ভারতকে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় কল্পনা করা হয়েছে। গ্রিস ও সাইপ্রাসের পাশাপাশি কিছু আরব, আফ্রিকান ও এশীয় দেশ এতে যুক্ত হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যদিও সব দেশের নাম প্রকাশ করা হয়নি।
নেতানিয়াহুর বক্তব্য অনুযায়ী, এ উদ্যোগের লক্ষ্য তথাকথিত ‘উগ্রপন্থী অক্ষ’ মোকাবিলা করা। তিনি দাবি করেন, ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক অভিযানে একটি ‘শিয়া বলয়’ দুর্বল হয়েছে। এখন নতুন করে মাথাচাড়া দেওয়া সুন্নি বলয়ের প্রতিও সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।
এই প্রেক্ষাপটে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ইসরায়েলি নীতির অন্যতম কঠোর সমালোচক হিসেবে সামনে আসছেন। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি কৌশলগত প্রতিরক্ষা সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়েছে। ফলে আঞ্চলিক ব্লক রাজনীতি নতুন মাত্রা পাচ্ছে।
প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিতে ঘনিষ্ঠতা
২০১৭ সালের সফরের পর থেকে ভারত–ইসরায়েল সম্পর্ক দ্রুত প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে ভারত ইসরায়েলি অস্ত্রের অন্যতম বড় ক্রেতা। এবারের বৈঠকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, একটি নতুন কাঠামোর আওতায় কিছু উন্নত সামরিক প্রযুক্তি ভারতে হস্তান্তরের বিষয়ে কথাবার্তা চলছে। এর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলের লেজারভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন বিম’, যা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন লেজার প্রযুক্তি ব্যবহার করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে সক্ষম। পাশাপাশি ‘আয়রন ডোম’ প্রযুক্তির স্থানীয় উৎপাদনের সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে।
পাকিস্তানের সাবেক কূটনীতিক মাসুদ খান মনে করেন, এই সফর দুই দেশের মধ্যে বিশেষ কৌশলগত চুক্তির দিকে নিয়ে যেতে পারে। তাঁর মতে, এটি ইসলামাবাদ–রিয়াদ চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে ভারসাম্য তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
চীনে সাবেক পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত মাসুদ খালিদও সামরিক দিকটি গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। তাঁর ভাষ্য, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আকাশযুদ্ধ ও ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার দেখিয়েছে যে, ইসরায়েলি সরঞ্জাম দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা বাস্তবতায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সম্পর্কটি এখন আর একমুখী নয়। গাজা সংঘাতের সময় ভারতীয় প্রতিরক্ষা শিল্প থেকেও ইসরায়েলে সামরিক উপকরণ সরবরাহের তথ্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। ফলে সহযোগিতা এখন দ্বিমুখী রূপ নিয়েছে।
পাকিস্তানকে ঘিরে নিরাপত্তা সমীকরণ
আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভারত–ইসরায়েল ঘনিষ্ঠতা ইসলামাবাদের কৌশলগত অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে। পাকিস্তান একদিকে সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে, অন্যদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে তার ঐতিহ্যগত অর্থনৈতিক নির্ভরতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
রিয়াদভিত্তিক গবেষক উমর করিম মনে করেন, বর্তমান অংশীদারত্ব বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের অংশ। তাঁর মতে, যখন দুই সরকারই আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে, তখন পারস্পরিক কৌশলগত সহযোগিতা তাদের জন্য রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সুবিধা তৈরি করছে।
অন্যদিকে, আঙ্কারাভিত্তিক বিশ্লেষক গোকহান এরেলি মনে করেন, ইসরায়েল সরাসরি পাকিস্তানকে লক্ষ্যবস্তু নাও করতে পারে। বরং ভারত, ইসরায়েল ও পশ্চিমা শক্তির তৈরি ‘অভিন্ন হুমকি’ বয়ানের ফলে পাকিস্তান পরোক্ষ চাপের মুখে পড়তে পারে।
পাকিস্তানের কায়েদ-ই-আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহাম্মদ শোয়েবের মতে, নয়াদিল্লি ও তেল আবিবের ঘনিষ্ঠতা ইসরায়েলের নীতিনির্ধারণে পাকিস্তান-সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও কঠোর করে তুলতে পারে।
উপসাগরীয় ভারসাম্য ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ
উপসাগরীয় অঞ্চল পাকিস্তানের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ করে রেমিট্যান্স ও আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে। সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ইসলামাবাদের জন্য ইতিবাচক হলেও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতিমধ্যে ভারতের সঙ্গে কৌশলগত সমঝোতা করেছে।
সাবেক কূটনীতিকদের মতে, শুধু নিরাপত্তা নয় অর্থনৈতিক সংহতি ও আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এখন পাকিস্তানের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। মধ্য এশিয়া, তুরস্ক, ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও যোগাযোগ জোরদার করা হলে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা সহজ হতে পারে।
এদিকে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবস্থান আঞ্চলিক উত্তেজনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাব কমানোর প্রশ্নে ইসরায়েলের কড়া অবস্থান রয়েছে। পাকিস্তান এই পরিস্থিতিতে সরাসরি পক্ষ না নিয়ে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
কৌশলগত প্রতিযোগিতা
মোদির এই সফর শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আরেকটি অধ্যায় নয়; বরং বৃহত্তর কৌশলগত প্রতিযোগিতার অংশ। ভারত ও ইসরায়েল নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করলে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে নতুন পরিবর্তন আসতে পারে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদের কৌশলগত অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা কার্যকরভাবে গভীর করা যায় এবং বহুমাত্রিক কূটনীতির মাধ্যমে কীভাবে সম্ভাব্য চাপ মোকাবিলা করা যায়।
সব মিলিয়ে তেল আবিবে মোদি–নেতানিয়াহু বৈঠক আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন বার্তা দিচ্ছে। এই অংশীদারত্ব কতদূর এগোয় এবং এর প্রতিক্রিয়ায় ইসলামাবাদ কী কৌশল নেয়, সেটিই এখন পর্যবেক্ষকদের প্রধান আগ্রহের বিষয়।