ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক আক্রমণ শুরু করেছে ইসরায়েল

ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক আক্রমণ শুরু করেছে ইসরায়েল
ছবির ক্যাপশান, তেহরানে বিস্ফোরণের পর ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়ছে [এএফপি]
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

ইরানের বিরুদ্ধে ‘প্রি-এম্পটিভ স্ট্রাইক’ বা আগাম প্রতিরোধমূলক হামলা চালিয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। শনিবার সকাল (২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ (Israel Katz) বলেন, “রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হুমকি দূর করতে” ইসরায়েল এ ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছে। হামলার ঘোষণার পরপরই ইসরায়েল জুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করা হয় এবং সম্ভাব্য ইরানি পাল্টা হামলার আশঙ্কায় জনগণকে সুরক্ষিত স্থানের কাছাকাছি থাকতে বলা হয়।

এই ঘটনার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ এর আগে ২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের একটি সরাসরি আকাশযুদ্ধের অভিজ্ঞতা আছে-যার রেশ এখনো কূটনৈতিক অঙ্গনে কাটেনি।

তেহরানে বিস্ফোরণ, নির্দিষ্ট এলাকায় আঘাতের খবর

ইসরায়েল হামলার ঘোষণা দেওয়ার পর ইরানের রাজধানী তেহরানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। আল জাজিরার লাইভ আপডেটে ইরানি বার্তা সংস্থা ফার্সের বরাত দিয়ে বলা হয়, তেহরানের ইউনিভার্সিটি স্ট্রিট ও জোমহুরি (Jomhouri) এলাকায় একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার খবর এসেছে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP) জানায়, তেহরানের যে এলাকায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ির কার্যালয় সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো রয়েছে-সেই এলাকার কাছাকাছি হামলার “প্রতীয়মান” ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে খামেনেয়ি সেখানে ছিলেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, হামলার পর শহরের বিভিন্ন অংশে ধোঁয়া দেখা গেছে এবং পরবর্তী সময়ে আরও বিস্ফোরণের খবর এসেছে; কিন্তু হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ হিসাব তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ হয়নি।

ইসরায়েলে সাইরেন, ‘এসেনশিয়াল অ্যাকটিভিটি’-স্কুল-অফিস বন্ধ

ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরান থেকে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় দেশব্যাপী সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় সাইরেন বাজানো হয় এবং জনগণকে আশ্রয়কেন্দ্র বা সুরক্ষিত স্থানের কাছে থাকতে বলা হয়েছে।

ইসরায়েল ‘পূর্ণ কার্যক্রম’ থেকে ‘জরুরি/প্রয়োজনীয় কার্যক্রমে’ (essential activity) যাওয়ার নির্দেশও দেয়-এর মধ্যে স্কুল বন্ধ, জনসমাগম নিষিদ্ধ, এবং জরুরি সেবা ছাড়া অধিকাংশ কর্মস্থল বন্ধ রাখার নির্দেশ অন্তর্ভুক্ত।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল হামলার পর নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ করে এবং জরুরি অবস্থা জারি করে পাল্টা আঘাতের প্রস্তুতি নেয়।

পাকিস্তান-সৌদি মধ্যস্থতা নয়-এবার ইরান-ইসরায়েল সমীকরণে কূটনীতি চাপে

রয়টার্স জানায়, ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়িয়েছে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে চলমান/আলোচিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকেও বড় ধাক্কা দিতে পারে। ইসরায়েলের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে কঠোর-তারা চায় ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতার কাঠামো ভেঙে দেওয়া হোক, শুধু ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ থামালেই হবে না-এমন দাবিও তাদের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে উঠে এসেছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ফেব্রুয়ারিতে নতুন করে আলোচনায় বসেছিল-দীর্ঘদিনের বিরোধ কূটনীতির মাধ্যমে মেটাতে এবং বড় সংঘাত এড়াতে। তবে ইসরায়েল বারবার বলেছে-ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো ভেঙে দেওয়ার প্রশ্ন ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা-দুইটিই আলোচনার অংশ হওয়া উচিত। অন্যদিকে ইরান বলছে, তারা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে পারমাণবিক কর্মসূচিতে কিছু সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করতে পারে, কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে সেই আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করতে রাজি নয়।

ইরানের প্রতিক্রিয়া: আত্মরক্ষার ঘোষণা, আকাশসীমা বন্ধের ইঙ্গিত

হামলার পর ইরান আত্মরক্ষার কথা বলেছে এবং পরিস্থিতির কারণে আকাশসীমা-সংক্রান্ত সতর্কতা জোরদার করার খবরও এসেছে। AP জানায়, হামলার পর ইরান পাইলটদের জন্য সতর্কতা জারি করে আকাশপথে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে।

রয়টার্সের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইরান নিজেদের প্রতিরক্ষার ঘোষণা দিয়েছে এবং অঞ্চলজুড়ে মার্কিন সেনা উপস্থিতি থাকা দেশগুলোকে সতর্ক করেছে-যদি যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করে, তাহলে পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

কেন এটিকে ‘ডেভেলপিং স্টোরি’ বলা হচ্ছে

এ মুহূর্তে তিনটি বড় প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়-

  • হামলায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের সংখ্যা কত
  • কোন কোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত লেগেছে-সামরিক, কৌশলগত নাকি অবকাঠামোগত স্থাপনা
  • ইরান কী ধরনের পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাবে-তাৎক্ষণিক, সীমিত নাকি ব্যাপক

গার্ডিয়ান ও রয়টার্স-দুই মাধ্যমই বলছে, ইসরায়েল ইতোমধ্যে পাল্টা আঘাতের প্রস্তুতি হিসেবে জরুরি অবস্থা, আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ এবং জনসতর্কতা জারি করেছে।

পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে

এই হামলা এমন এক সময় হলো, যখন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা আবারও সামনে এসেছিল-এবং একই সঙ্গে ২০২৫ সালের জুনের সংঘাতের স্মৃতি তাজা। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের ‘আগাম হামলা’ ঘোষণার পর ইরান যদি বড় পরিসরে পাল্টা আঘাত করে, তাহলে তা দ্রুত আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে-যার প্রভাব বিমান চলাচল, জ্বালানি বাজার ও সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও পড়তে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ