{{ news.section.title }}
মধ্যপ্রাচ্যে যেসব গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি আছে যুক্তরাষ্ট্রের
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি নতুন নয়। তবে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ির মৃত্যুর খবর এবং পরবর্তী পাল্টাপাল্টি হামলা–হুমকির প্রেক্ষাপটে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে-মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটি, সেনা মোতায়েন এবং আকাশ–সমুদ্রভিত্তিক যুদ্ধ সক্ষমতা।
বিভিন্ন বিশ্লেষণ বলছে, এই ঘাঁটিগুলোই যুক্তরাষ্ট্রের “ফোর্স প্রজেকশন” বা দ্রুত সামরিক শক্তি প্রয়োগের মূল ভরকেন্দ্র; আবার একই সঙ্গে এগুলোই সংকটের সময়ে বড় ঝুঁকিরও জায়গা হয়ে দাঁড়ায়।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত ১০–১২টির বেশি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে এবং বড়–ছোট মিলিয়ে কমপক্ষে ১৯টি স্থাপনায় সেনা ও সরঞ্জাম রয়েছে। মোট সেনাসংখ্যা সময় ও পরিস্থিতিভেদে ওঠানামা করলেও সাম্প্রতিক কয়েক বছরে এটি প্রায় ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজারের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে বলে বহু উৎসে উল্লেখ করা হয়।
কেন মার্কিন ঘাঁটিগুলো এখন বেশি নজরে
ইরানে হামলার পর পরিস্থিতি দ্রুত ঘোলাটে হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর ঘটনায় দেশটির ভেতরে বড় ধরনের রাজনৈতিক–নিরাপত্তা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং অঞ্চলজুড়ে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের “টার্গেটেড স্ট্রাইক” কৌশল, আর ইরানের পাল্টা আঘাত-এই দুইয়ের সংঘাত–সম্ভাবনায় মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন স্থাপনাগুলো স্বাভাবিকভাবেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা সাধারণত তিনটি কারণে এই ঘাঁটিগুলোকে “স্ট্র্যাটেজিক” বলেন:
দ্রুত আকাশ অভিযান চালাতে কাছাকাছি রানওয়ে ও যুদ্ধবিমানের হাব,
সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নৌবহর ও বন্দর সুবিধা,
লজিস্টিকস ও রসদ সরবরাহ-অর্থাৎ অস্ত্র, জ্বালানি, সেনা চলাচল ও কমান্ড সাপোর্ট।
এগুলোর বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) সংশ্লিষ্ট অপারেশনাল কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত-ফলে ইরাক–সিরিয়া থেকে উপসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত নানা অভিযানে এগুলোকে কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
কাতার: আল উদেইদ-মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় মার্কিন ঘাঁটি
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে আলোচিত সামরিক ঘাঁটি হলো কাতারের আল উদেইদ এয়ার বেস। দোহার বাইরে মরুভূমি এলাকায় অবস্থিত এই ঘাঁটি ১৯৯৬ সালে নির্মিত হয়-এমন তথ্য বিভিন্ন নথিতে আছে। এখানে প্রায় ১০ হাজার মার্কিন সেনা ও অন্যান্য জোট বাহিনীর সদস্য অবস্থান করতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়। এটি ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের ফরওয়ার্ড হেডকোয়ার্টার এবং ইউএস এয়ার ফোর্সের ৩৭৯তম এয়ার এক্সপেডিশনারি উইংয়ের মতো ইউনিটের উপস্থিতির কারণে আকাশ অভিযানের বড় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনায় আল উদেইদের নিরাপত্তা ও সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা বেড়েছে-কারণ বড় ঘাঁটি হওয়ায় এটি অপারেশন চালানো ও প্রতিরক্ষা-দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।
বাহরাইন: পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর
উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ উপস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বাহরাইনকে ধরা হয়। এখানেই মার্কিন নৌবাহিনীর ফিফথ ফ্লিট (Fifth Fleet) সদর দপ্তর, যার দায়িত্ব পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর, আরব সাগর এবং ভারত মহাসাগরের কিছু অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত-এমন তথ্য আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে।
ফিফথ ফ্লিটের উপস্থিতি মানে শুধু যুদ্ধজাহাজ নয়; সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল, মাইন ক্লিয়ারেন্স, নৌ টহল, এবং সংকটে দ্রুত প্রতিক্রিয়া-সবকিছুরই একটি “কমান্ড নোড”।
কুয়েত: লজিস্টিক হাব-ক্যাম্প আরিফজান, আলি আল সালেম, ক্যাম্প বুয়েরিং
কুয়েতকে অনেক বিশ্লেষক মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্থলবাহিনী–লজিস্টিকসের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে দেখেন। এখানে ক্যাম্প আরিফজানকে ইউএস আর্মি সেন্ট্রালের ফরওয়ার্ড সদর দপ্তর বলা হয়। পাশাপাশি আলি আল সালেম এয়ার বেস (ইরাক সীমান্তের কাছে) এবং ক্যাম্প বুয়েরিং-যা ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের সময় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল-এই তিনটি স্থাপনাকে ইরাক ও সিরিয়ার দিকে সেনা–সরঞ্জাম চালাচলের “স্টেজিং/ট্রানজিট” সুবিধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এই ধরণের ঘাঁটির গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি দেখা যায় যুদ্ধ বা বড় সংকটে-কারণ তখন দ্রুত রসদ সরবরাহ, সেনা ঘূর্ণন (rotation), এবং ব্যাকআপ সক্ষমতা চালু রাখা প্রয়োজন হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাত: আল ধাফরা এয়ার বেস এবং জেবেল আলি বন্দর
ইউএই–এর আল ধাফরা এয়ার বেসকে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়-বিশেষত নজরদারি (surveillance), গোয়েন্দা তৎপরতা, ড্রোন অপারেশন এবং আইএসবিরোধী অভিযানের মতো কার্যক্রমে।
এছাড়া দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দরকে আনুষ্ঠানিক সামরিক ঘাঁটি না বলা হলেও, অনেক প্রতিবেদনে এটিকে “মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর অন্যতম ব্যস্ত বন্দর–ব্যবহার কেন্দ্র” হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যেখানে বড় যুদ্ধজাহাজ–বিমানবাহী রণতরীসহ নৌযান ভেড়ানোর সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ।
সৌদি আরব: প্রিন্স সুলতান এয়ার বেস-প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো প্রতিরক্ষা
সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি আগের তুলনায় কিছু সময় কম–বেশি হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সমন্বয়ের ভূমিকা বেশি আলোচনায় এসেছে। রিয়াদ থেকে দক্ষিণে প্রিন্স সুলতান এয়ার বেসে প্যাট্রিয়ট মিসাইল ব্যাটারি ও থাড (THAAD)–জাতীয় উচ্চমাত্রার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন থাকার কথা বিভিন্ন বর্ণনায় আসে-যার উদ্দেশ্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকি মোকাবিলা।
জর্ডান: মুয়াফ্ফাক আল সালতি এয়ার বেস-লেভান্ত অঞ্চলে অপারেশন সাপোর্ট
জর্ডানের আজরাকে অবস্থিত মুয়াফ্ফাক আল সালতি এয়ার বেসকে লেভান্ত অঞ্চলে (সিরিয়া–ইরাকসহ আশপাশ) আকাশ অভিযানের সহায়ক কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এখানে ইউএস এয়ার ফোর্স সেন্ট্রালের ৩৩২তম এয়ার এক্সপেডিশনারি উইংয়ের উপস্থিতির কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তুরস্ক: ইনসিরলিক-যৌথ ব্যবস্থাপনা ও পারমাণবিক অস্ত্র প্রশ্ন
তুরস্কের আদানা প্রদেশের ইনসিরলিক এয়ার বেস যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের যৌথ ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত হয় এবং এটি সিরিয়া–ইরাক প্রেক্ষাপটে আইএসবিরোধী জোট অভিযানে ব্যবহৃত হয়েছে বলে বহু প্রতিবেদনে এসেছে। এই ঘাঁটিতে মার্কিন পারমাণবিক অস্ত্র মজুত থাকার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক আলোচনার অংশ।
ইরাক: আইন আল আসাদ ও এরবিল-নিরাপত্তা সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও সমন্বয়
ইরাকে একসময় মার্কিন সেনা উপস্থিতি এক লাখ ৬০ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল-ইরাক যুদ্ধের সর্বোচ্চ সময়ে। এখন পরিস্থিতি ভিন্ন; তবে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি পুরোপুরি শেষ হয়নি। পশ্চিম আনবার প্রদেশের আইন আল আসাদ এয়ার বেস এবং কুর্দিস্তান অঞ্চলের এরবিল এয়ার বেস-দুটি জায়গাকেই যুক্তরাষ্ট্র ও জোটবাহিনীর প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য আদান–প্রদান এবং লজিস্টিক সমন্বয়ের কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ২০২০ সালে কাসেম সোলাইমানি হত্যার পর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আইন আল আসাদ লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল-এ তথ্যও আন্তর্জাতিকভাবে বহুল আলোচিত।
সিরিয়া: উপস্থিতি কমানোর পরিকল্পনা ও সাম্প্রতিক প্রত্যাহার
সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি মূলত ইসলামিক স্টেটের পুনরুত্থান ঠেকানোর যুক্তিতে ব্যাখ্যা করা হয়। তবে ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত/রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য ও সরকারি বিবৃতিতে সিরিয়ায় ঘাঁটি কমিয়ে একটিতে নামিয়ে আনার পরিকল্পনার কথা উঠে আসে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতেও কিছু প্রধান ঘাঁটি থেকে সরঞ্জাম ও বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার খবর প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও এপি।
আঞ্চলিক “ঝুঁকি” কীভাবে বাড়ছে
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো যত বড়-ততই এগুলো “টার্গেটিং গণিত”-এ চলে আসে। সাম্প্রতিক সংঘাতপর্বে ইরানের প্রতিক্রিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা–অবস্থানকে ঘিরে এই ঝুঁকি নতুন করে সামনে এসেছে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা ঘাঁটি, বিমান প্রতিরক্ষা, যুদ্ধবিমান ও নৌঘাঁটি-সবই একদিকে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, অন্যদিকে আঘাতের আশঙ্কাও তৈরি করে।
একই সঙ্গে এই ঘাঁটিগুলো বন্ধ বা সরিয়ে নেওয়া সহজ নয়-কারণ এগুলোর সঙ্গে আছে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা চুক্তি, মিত্রদেশের নিরাপত্তা হিসাব, সমুদ্রপথের বাণিজ্যিক নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবাদ–বিরোধী স্থায়ী অপারেশনাল চাহিদা।
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক আরও উত্তপ্ত হলে এই ঘাঁটিগুলোর ওপর চাপ বাড়তে পারে-কখনও নিরাপত্তা জোরদার, কখনও সেনা–সরঞ্জাম পুনর্বিন্যাস, আবার কখনও কূটনৈতিক সমন্বয়ের অংশ হিসেবে পদক্ষেপ বদলাতে পারে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: সংকট যত গভীর হবে, মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোর কৌশলগত গুরুত্ব-এবং ঝুঁকি-দুটোই তত বেশি আলোচনায় থাকবে।