{{ news.section.title }}
খামেনি ছাড়াও ইরানের যেসব শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বিশ্ব রাজনীতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বড় ধাক্কা লাগে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এই অভিযানের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইরানের শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাদের লক্ষ্য করে পরিচালিত সুপরিকল্পিত আক্রমণ।
হামলার প্রথম ধাপে তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন শহরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ চালানো হয়, যার ফলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন বলে রাষ্ট্রীয় মিডিয়া ১ মার্চ নিশ্চিত করেছে। ইরান ৪০ দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ওই অভিযানে ইরানের অন্তত ৪৮ জন শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন ও ভবিষ্যতের নেতৃত্ব নিয়ে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ হামলায় মোট হতাহত সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করলে, দেশটির রেড ক্রিসেন্টের হিসাবে শতাধিক সাধারণ নাগরিকসহ বহু মানুষ নিহত এবং অসংখ্য আহত হয়েছে।
ইসরায়েলে হামলার জবাবে ইরানি বাহিনী মার্কিন ও অন্যান্য অঞ্চলের ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, যার ফলে সেখানে কমপক্ষে নয়জন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ এখন পর্যন্ত জানিয়েছে।
এই হামলা ও উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যে সামগ্রিক নিরাপত্তার পরিস্থিতি ক্রমাগত জটিল করে তুলেছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক চাপ ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, কারণ অঞ্চলজুড়ে সংঘাত বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাসনিম ও ফার্স নিউজ এজেন্সি রোববার সকালে খামেনি সহ অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে।
নিহতদের মধ্যে আরও জেনারেল ও পরিবার
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পাশাপাশি ওই হামলায় তাঁর পরিবার-মেয়ে, জামাতা ও নাতি-এবং দেশের সশস্ত্র বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নিহত হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও রিপোর্ট করেছে।
একই সাথে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উত্স বলছে এই অভিযানে ইরানের বিপ্লবী গার্ডের শীর্ষ কমান্ডার, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মতো সিনিয়র কর্মকর্তাদেরও মৃত্যু হয়েছে, যা ইরানের সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতে ভীষণ শূন্যতা তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার হত্যার পর আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া মিশ্র:
- রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এ ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন ও মানবিক মৌলিক নীতির বিরুদ্ধে বলে কটাক্ষ করেছেন।
- ইউরোপীয় দেশগুলো পরিস্থিতি শান্ত করতে আহ্বান জানাচ্ছে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য কূটনৈতিক সমাধান প্রয়োজন বলে মন্তব্য দিচ্ছে।
- বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসী ইরানিরা এবং সমর্থকরা বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন-কেউ শোক মেনে নিচ্ছেন আবার কেউ প্রতিবাদ বা বিক্ষোভও করছে।
ইসরায়েলে পাল্টা হামলা, হতাহতের খবর
অন্যদিকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র তাদের ভূখণ্ডে আঘাত হেনেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, এতে কয়েকজন নিহত ও বহু মানুষ আহত হয়েছেন। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’ সক্রিয় থাকলেও কিছু আঘাত প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি বলে জানানো হয়েছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, এটি ছিল “প্রতিরোধমূলক জবাব” এবং তারা ভবিষ্যতেও প্রতিক্রিয়া অব্যাহত রাখবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে বলেছেন, ইরানকে সামরিকভাবে দুর্বল করা এবং তাদের আঞ্চলিক প্রভাব কমানোই এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য। তিনি আরও দাবি করেন, ইরানের নতুন নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগের আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে এ বিষয়ে তেহরান থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
ওয়াশিংটনের কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, এটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ, যেখানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক উপস্থিতিকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
তেহরানের জবাব ও মধ্যপ্রাচ্যের অর্ধশতরূপ
ইরানি প্রেসিডেন্ট এবং সরকারিভাবে জানানো হয়েছে, তারা হামলার প্রতিশোধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিভিন্ন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে এবং এখনও তা অব্যাহত রয়েছে।
তিনটি উপসাগরীয় দেশসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ইরান-সমর্থিত হামলার খবর এসেছে, যার ফলে অবস্থার তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রযুক্তিগত ও সামরিক বিশ্লেষণ
বিশ্লেষকদের মতে এই হামলার পেছনে দীর্ঘমেয়াদি গোয়েন্দা ও পরিকল্পনা কাজ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করছিল এবং সেই সুযোগে হামলা চালানো হয়েছে বলে বিভিন্ন নিরাপত্তা বিশ্লেষণ প্রকাশ পাচ্ছে।
ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে যে তাদের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র দায়া আরও বিস্তৃত সামরিক ব্যবস্থা নষ্ট করেছে এবং তা ইরানের প্রতিরক্ষা কাঠামোতে বড় ধরনের ভাঙন ঘটিয়েছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
খামেনির মৃত্যু ইরানের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, সংবিধান অনুযায়ী কয়েক দিনের মধ্যে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হবে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এখনো অনিশ্চিত, এবং নতুন নেতৃত্বের নিয়োগ ও ক্ষমতার পরিবর্তন ভবিষ্যতে দেশটির নীতি ও আন্তর্জাতিক আচরণকে প্রভাবিত করবে।
জ্বালানি বাজারে প্রভাব
এই সংঘাতের ফলে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম আবারও বেড়েছে এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে-যেখানে বিশ্বের বড় অংশের তেল পরিবহন ঘটে। অস্থিতিশীলতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ এবং সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যদিও ইরান নিজে তেলের বড় সরবরাহকারী, কিন্তু পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি শৃঙ্খলে বড় টান পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রচার ও তথ্য যুদ্ধ
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের বর্ণনা ও তথ্য প্রচার করছে। একদিকে ইরান ও তার মিত্ররা হামলাকে “আক্রমণ” ও “অপরাধ” হিসেবে উল্লেখ করছে, অন্যদিকে পশ্চিমা ও যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত মাধ্যমে এটিকে “প্রতিরোধমূলক আঘাত” বা “নিরাপত্তা কার্যক্রম” হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্যও প্রচার হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সামনের সম্ভাবনা
বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা থাকলেও উভয় পক্ষের কড়া অবস্থান সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধের বদলে সংলাপের পথেই স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে।
এখন বিশ্ব নজর রাখছে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়-তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের সামরিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপের ওপর।