যেভাবে খামেনির অবস্থান খুঁজে পেলো সিআইএ-ইসরাইল

যেভাবে খামেনির অবস্থান খুঁজে পেলো সিআইএ-ইসরাইল
ছবির ক্যাপশান, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ছবি: সংগৃহীত
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি-সহ একাধিক শীর্ষ সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তার নিহত হওয়ার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা Islamic Republic News Agency (ইরনা) জানিয়েছে, রোববার (১ মার্চ) ভোরে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যৌথ হামলায় তেহরানে নিজ কর্মস্থলে তিনি নিহত হন। একই ঘটনায় তাঁর মেয়ে, জামাতা ও নাতির মৃত্যুর কথাও নিশ্চিত করা হয়েছে।

পশ্চিমা একটি প্রভাবশালী গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ঘনিষ্ঠ গোয়েন্দা তথ্য আদান–প্রদান হয়েছিল। অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা Central Intelligence Agency (সিআইএ) কয়েক মাস ধরে খামেনির অবস্থান ও চলাফেরা নজরদারিতে রেখেছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অবস্থান, নিরাপত্তা রুটিন এবং বৈঠকের ধরন সম্পর্কে আরও নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

সূত্রগুলো জানায়, সিআইএ জানতে পারে-শনিবার সকালে তেহরানের কেন্দ্রস্থলে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কমপ্লেক্সে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে এবং সেখানে খামেনির উপস্থিত থাকার কথা। এই তথ্য পাওয়ার পর হামলার সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়। শুরুতে রাতের অন্ধকারে আঘাত হানার পরিকল্পনা থাকলেও বৈঠকের সময়কে লক্ষ্য করে সকালেই অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ওই কমপ্লেক্সে ইরানের প্রেসিডেন্ট, সর্বোচ্চ নেতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কার্যালয় অবস্থিত। ইসরায়েলের ধারণা ছিল, সেখানে ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) প্রধান কমান্ডার মেজর জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুর, মিলিটারি কাউন্সিলের প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল আলী শামখানি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ এবং আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা উপস্থিত থাকবেন।

ইরনা নিশ্চিত করেছে, হামলায় রিয়ার অ্যাডমিরাল আলী শামখানি ও মেজর জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হয়েছেন। ইসরায়েল এর আগে তাদের হত্যার দাবি করেছিল। যদিও ইরানের এক শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা হামলার আগে স্থান ত্যাগ করতে সক্ষম হয়েছেন বলে জানা গেছে, তবু সূত্রের ভাষ্য-গোয়েন্দা সংস্থার জ্যেষ্ঠ নেতৃত্বের বড় অংশ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অভিযান শুরু হয় ইসরায়েল সময় ভোর ৬টার দিকে। যুদ্ধবিমানগুলো ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করে দীর্ঘপাল্লার নির্ভুল নিশানায় আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে। প্রায় দুই ঘণ্টা পাঁচ মিনিট পর, তেহরান সময় সকাল ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো। হামলার সময় জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা একটি ভবনে অবস্থান করছিলেন; খামেনি ছিলেন পাশের আরেকটি ভবনে।

ইসরায়েলের এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা এক বার্তায় বলেন, তেহরানের একাধিক স্থানে একযোগে আঘাত হানা হয়েছে এবং রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা নেতৃত্বের শীর্ষ ব্যক্তিদের অবস্থানস্থল ছিল প্রধান লক্ষ্য। তাঁর দাবি, ইরান যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেও এই হামলায় ‘কৌশলগত চমক’ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। হোয়াইট হাউস ও সিআইএ আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত বছরের ১২ দিনের সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের নেতৃত্বের যোগাযোগব্যবস্থা ও চলাচলের ধরন সম্পর্কে গভীর তথ্য সংগ্রহ করে। সে সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বে থাকা Donald Trump ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় সম্ভাব্য হামলার প্রেক্ষাপটে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র জানে খামেনি কোথায় অবস্থান করছেন এবং চাইলে তাঁকে লক্ষ্যবস্তু করা সম্ভব। সাবেক এক মার্কিন কর্মকর্তার দাবি, সে সময় ব্যবহৃত গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের তথ্যই সাম্প্রতিক অভিযানে কাজে লাগানো হয়েছে।

এদিকে আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যৌথ অভিযানে একদিনে ১,২০০-র বেশি বোমা ও গোলাবারুদ নিক্ষেপের দাবি করেছে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের হরমোজগান প্রদেশের মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়েও হামলা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সেখানে অন্তত ১৪৮ জন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন বলে ইরানি সূত্র জানিয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনায় ‘ডজনখানেক নিরীহ শিশু’ নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন, এই হামলার জবাব দেওয়া হবে। তাঁর ভাষায়, এটি কেবল সামরিক নয়, মানবিক সীমারেখাও লঙ্ঘন করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ডেকে আনতে পারে। ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বে শূন্যতা, আইআরজিসির কাঠামোগত ধাক্কা এবং সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ-সব মিলিয়ে অঞ্চলজুড়ে নতুন করে সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে এ ঘটনাকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল গোয়েন্দা সহযোগিতার গভীরতা ও ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে।


সম্পর্কিত নিউজ