ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব পরিবর্তনের জন্য ট্রাম্পের তালিকায় তিন নাম

ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব পরিবর্তনের জন্য ট্রাম্পের তালিকায় তিন নাম
ছবির ক্যাপশান, ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি-এর মৃত্যুর পর দেশটির নেতৃত্ব প্রশ্নে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে তেহরান দ্রুত নতুন সর্বোচ্চ নেতা বাছাইয়ের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে, অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন-সময় এলে তিনি ইরানের নেতৃত্বে বসানোর জন্য নিজের পছন্দের তিনজনের একজনকে সমর্থন করবেন।

রোববার (১ মার্চ) দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, তেহরানের ধর্মীয় নেতৃত্বকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি ইরানের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করেছেন। নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি জানান, তাঁর কাছে ‘তিনটি খুবই ভালো পছন্দ’ রয়েছে। তবে কাদের কথা বলা হচ্ছে, তা প্রকাশ করেননি। তাঁর ভাষায়, “আমি এখনই নাম বলব না। আগে কাজটি সম্পন্ন হোক।”

এর আগে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প উল্লেখ করেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান সর্বোচ্চ চার সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তিনি বলেন, এটি শুরু থেকেই প্রায় চার সপ্তাহের একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া ছিল। ইরান বড় ও শক্তিশালী দেশ হওয়ায় সামরিক লক্ষ্য পূরণে সময় লাগতে পারে, তবে চার সপ্তাহের আগেও অভিযান শেষ হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। একই সঙ্গে তিনি জানান, ভবিষ্যতে আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ নয়, যদিও ইরানের পক্ষ থেকে সংলাপের উদ্যোগকে তিনি ‘বিলম্বিত’ বলে মন্তব্য করেন।

এদিকে তেহরান ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ভাষণ দিয়ে ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের উত্তরাধিকার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি খামেনির হত্যাকাণ্ডকে ‘বিশাল অপরাধ’ আখ্যা দিয়ে সাত দিনের সরকারি ছুটি ও ৪০ দিনের শোককাল ঘোষণা করেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, সংবিধান অনুযায়ী নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। বর্তমানে প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান এবং অভিভাবক পরিষদের একজন ফকিহকে নিয়ে গঠিত তিন সদস্যের অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিল সাময়িকভাবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ৮৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ পরিষদ- Assembly of Experts-অত্যন্ত দ্রুত স্থায়ী উত্তরসূরি বেছে নেবে।

১৯৮৯ সালে সৈয়দ রুহুল্লাহ মুসাবী খোমেইনী-এর মৃত্যুর পর যেভাবে বিশেষজ্ঞ পরিষদ সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে খামেনিকে নির্বাচিত করেছিল, এবারও একই সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় কাঠামো অটুট রয়েছে এবং নেতৃত্বে শূন্যতা দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

আরাগচি এই হত্যাকাণ্ডকে আন্তর্জাতিক আইনের ‘নজিরবিহীন লঙ্ঘন’ হিসেবে বর্ণনা করে সতর্ক করেন, এর ফলে আঞ্চলিক পরিস্থিতি আরও জটিল ও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তিনি বলেন, ইরান আত্মসমর্পণ করবে না এবং অতীতের মতো দীর্ঘ সংঘাতের পর প্রতিপক্ষকেই যুদ্ধবিরতির অনুরোধ করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, ইরান প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে চায় না; বরং তাদের প্রতি আহ্বান-হামলাকারীদের নিবৃত্ত করতে ভূমিকা রাখতে।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ হামলাকে ‘রেড লাইন’ অতিক্রমের শামিল বলে উল্লেখ করে প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ইতোমধ্যে ওমান, দুবাই ও দোহার আকাশসীমায় উত্তেজনার খবর পাওয়া গেছে, যদিও এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য সীমিত।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের ‘তিন পছন্দ’ প্রসঙ্গটি কেবল কূটনৈতিক বার্তা নয়, বরং মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশলও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানের নেতৃত্ব নির্ধারণে হস্তক্ষেপ করবে কি না-সে প্রশ্নে ওয়াশিংটনের আনুষ্ঠানিক অবস্থান স্পষ্ট নয়। তবে প্রকাশ্যে এমন বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

সব মিলিয়ে একদিকে ইরান সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে দ্রুত উত্তরসূরি নির্ধারণে এগোচ্ছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটন ইঙ্গিত দিচ্ছে সম্ভাব্য রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের। খামেনির মৃত্যুর পরবর্তী এই অধ্যায় শুধু ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নয়, পুরো অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্য ও কূটনৈতিক সমীকরণকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ