{{ news.section.title }}
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার প্রভাবে, তেলের দাম বেড়েছে ১৩ শতাংশ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে হামলার মধ্য দিয়ে ইরান–ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি সংঘাত শুরু হওয়ার পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনার আগেই বাজার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকেই আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের দামে অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যায়।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি জানায়, বৈশ্বিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২৭ ফেব্রুয়ারি দিনের শুরুতে প্রতি ব্যারেল ৭২ ডলার থাকলেও দিনের শেষে তা বেড়ে ৮২ ডলারে পৌঁছায়। অর্থাৎ একদিনেই প্রায় ১০ ডলার বা প্রায় ১৪ শতাংশের মতো উল্লম্ফন ঘটে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) দিনের শুরুতে ৬০ ডলার থেকে বেড়ে ৭০ ডলার অতিক্রম করে।
বাজার বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগেই বিনিয়োগকারীরা সম্ভাব্য সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কায় আগাম অবস্থান নেওয়া শুরু করেছিলেন। বর্তমানে সামগ্রিকভাবে তেলের দাম প্রায় ১৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, যা বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি ও জ্বালানি ব্যয়ের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
হরমুজ প্রণালী: বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের লাইফলাইন
সংঘাত শুরুর দিনই ইরান ঘোষণা দেয় যে আরব সাগর ও পারস্য উপসাগরকে সংযুক্তকারী কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে সব ধরনের জাহাজ চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। Strait of Hormuz আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট। প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালী দিয়ে চলাচল করে।
এই জলপথ দিয়ে সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশগুলোর তেল বিশ্ববাজারে পৌঁছে। ফলে হরমুজে জাহাজ চলাচল বন্ধ মানে সরাসরি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের বিঘ্ন।
জ্বালানি বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান Rystad Energy-এর এক কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, বিকল্প রুট সীমিত এবং ব্যয়বহুল। যদি প্রণালী দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তাহলে দৈনিক ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি ব্যারেল তেল বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ কমে যেতে পারে। এই পরিমাণ সরবরাহ ঘাটতি ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের পর সবচেয়ে বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বিকল্প রুট কতটা কার্যকর?
কিছু উপসাগরীয় দেশ স্থলপথ বা লোহিত সাগর হয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে সীমিত পরিমাণ তেল রপ্তানি করতে পারে। তবে এসব রুটের ধারণক্ষমতা হরমুজের বিকল্প হিসেবে যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে ইরাক ও কুয়েতের মতো দেশগুলোর জন্য কার্যকর বিকল্প প্রায় নেই বললেই চলে।
এদিকে সামুদ্রিক বীমা প্রিমিয়ামও বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো উচ্চ ঝুঁকির কারণে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, যা পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দেবে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানির দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করবে।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
তেলের দাম বৃদ্ধি সরাসরি জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। ইউরোপ ও এশিয়ার বড় অর্থনীতিগুলো ইতোমধ্যে মুদ্রাস্ফীতির চাপে রয়েছে। তেলের দাম আরও বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হয় এবং হরমুজ প্রণালীতে চলাচল পুরোপুরি বন্ধ থাকে, তাহলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পূর্বে সতর্ক করেছিল, তেলের দামে বড় ধরনের অস্থিরতা বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাজারের মনস্তত্ত্ব ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি
বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির বড় অংশই ‘ঝুঁকি প্রিমিয়াম’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে-অর্থাৎ বাস্তব সরবরাহ ঘাটতির আগেই সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় দাম বাড়ছে। যদি সংঘাত সীমিত পরিসরে থাকে এবং প্রণালী দ্রুত খুলে দেওয়া হয়, তাহলে দাম কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে। তবে সরাসরি সামরিক সংঘাত বিস্তৃত হলে বা উপসাগরীয় অন্য দেশগুলো এতে জড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের নয়, বরং পুরো বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলছে। বাজার এখন নজর রাখছে-সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয়, প্রণালী কত দ্রুত পুনরায় চালু হয় এবং প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো উৎপাদন বাড়িয়ে ঘাটতি পূরণে কতটা সক্ষম হয়।
বিশ্বজুড়ে সরকার ও বিনিয়োগকারীরা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে তা কেবল তেলের বাজার নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির গতি-প্রকৃতিও বদলে দিতে পারে।