ইরান যুদ্ধ থামার বিষয়ে যে সীদ্ধান্ত জানাল ট্রাম্প

ইরান যুদ্ধ থামার বিষয়ে যে সীদ্ধান্ত জানাল ট্রাম্প
ছবির ক্যাপশান, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু | ছবি: সংগৃহীত

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ কবে এবং কীভাবে থামানো হবে-সে সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে নয়, বরং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সমন্বয় করে নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান এমন এক সময়ে এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব দ্রুতই বিশ্ব অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে-এশিয়ার বাজার খোলার পর তেলের দামে একলাফে বড় উত্থান, শেয়ারবাজারে অস্থিরতা এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।

‘সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত’-ট্রাম্প কী বললেন

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোববার (৮ মার্চ) ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, যুদ্ধ শেষ করার প্রশ্নে নেতানিয়াহুর মতামত নেওয়া হবে এবং এটি “পারস্পরিক বিষয়”-অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সমঝোতার ভিত্তিতেই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত আসবে। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, “সঠিক সময়ে আমরা সিদ্ধান্ত নেব।”

এই মন্তব্যকে বিশ্লেষকেরা দেখছেন যুদ্ধের “সময়সীমা” ও “শেষ লক্ষ্য” নিয়ে ওয়াশিংটন–তেলআবিবের ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের বার্তা হিসেবে। কারণ, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কেবল সামরিক পদক্ষেপ নয়-অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তা-সবকিছু মিলিয়ে একটি বড় সিদ্ধান্ত কাঠামো তৈরি হয়।

বিশ্ব অর্থনীতিতে তাত্ক্ষণিক ধাক্কা-তেল ১০০ ডলারের ওপরে

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সংঘাত ঘিরে উদ্বেগ বাড়তেই সোমবার (৯ মার্চ) এশিয়ার বাজারে লেনদেন শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বড় অঙ্কে লাফ দিয়েছে। বিভিন্ন বাজার-সংবাদ ও প্রতিবেদনে দেখা যায়, জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা ও যুদ্ধ ঝুঁকির প্রিমিয়াম যোগ হওয়ায় ব্রেন্ট ক্রুড ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার খবর সামনে আসে।

ব্লুমবার্গের বাজার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়ার সকালের লেনদেনে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং বাজারে “শক” তৈরি হয়েছে-বিশেষ করে অঞ্চলটির প্রধান রুট ও অবকাঠামো ঘিরে নতুন করে ঝুঁকি বাড়ার কারণে।

কেন তেলের দামে এত বড় প্রতিক্রিয়া

মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম কেন্দ্র। যুদ্ধ যখন তীব্র হয়, তখন কয়েকটি কারণে তেলের দাম দ্রুত বাড়ে-

সরবরাহ ঝুঁকি: যুদ্ধ দীর্ঘ হলে উৎপাদন, রপ্তানি ও পরিবহন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

শিপিং ও রুট অনিশ্চয়তা: ট্যাংকার চলাচল, বীমা ব্যয় ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ে।

মানসিক প্রভাব: বিনিয়োগকারীরা দ্রুত ‘সেইফ হ্যাভেন’ বা ঝুঁকিমুক্ত সম্পদের দিকে ঝোঁকে, আর তেলসহ পণ্যের বাজারে অস্থিরতা বাড়ে।

রয়টার্সের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও জ্বালানি প্রবাহ-দুইটি ভিত্তিই যুদ্ধের ধাক্কায় নড়ে গেছে। পরিস্থিতি জটিল হলে শিপিং রুট ও আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামো ঘিরে চাপ বাড়ে-যার সরাসরি প্রতিফলন পড়ে দাম ও বাজার-আস্থায়।

এশিয়ার বাজারে অস্থিরতা-বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ

তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেলে তার প্রভাব পড়ে পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার কাঁচামাল খরচ এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ের পণ্যমূল্যে। ফলে এশিয়ার বাজার খোলার সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের বড় একটি অংশ ঝুঁকি কমানোর দিকে যায়। যুদ্ধ অনিশ্চিত থাকলে শেয়ারবাজারে ওঠানামা বাড়ে এবং মুদ্রাবাজারেও চাপ তৈরি হয়-বিশেষ করে তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ক্ষেত্রে।

যুদ্ধ থামানোর সিদ্ধান্ত-কেন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ

ট্রাম্পের বক্তব্যে “পারস্পরিক সিদ্ধান্ত” কথাটি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণে-

মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা: ইসরায়েলের নিরাপত্তা লক্ষ্য ও সামরিক বাস্তবতা অনেকাংশে নির্ধারণ করে যুদ্ধের তীব্রতা ও সময়।

যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল: যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক নিরাপত্তা, মিত্রদের সুরক্ষা, জ্বালানি বাজার ও কূটনীতির ভারসাম্য-সব বিবেচনা করে।

আন্তর্জাতিক চাপ: যুদ্ধ দীর্ঘ হলে আন্তর্জাতিক মহলে কূটনৈতিক চাপ বাড়ে, মানবিক উদ্বেগ বাড়ে এবং বাজারে অনিশ্চয়তা স্থায়ী হয়।

এ কারণে যুদ্ধ শেষের সময় নির্ধারণ নিয়ে ওয়াশিংটন–তেলআবিবের ঘনিষ্ঠ সমন্বয়কে অনেকে দেখছেন ‘একই বার্তা, একই টাইমলাইন’-এমন রাজনৈতিক–সামরিক কৌশলের অংশ হিসেবে।

সামনে কী নজরে থাকবে

পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে-তা অনেকাংশে নির্ভর করবে (ক) মাটিতে ও আকাশে সংঘাতের মাত্রা, (খ) আঞ্চলিক দেশগুলোর অবস্থান, (গ) জ্বালানি সরবরাহ ও শিপিং নিরাপত্তা পরিস্থিতি, এবং (ঘ) যুক্তরাষ্ট্র–ইরান কূটনৈতিক যোগাযোগ বা সম্ভাব্য মধ্যস্থতার গতিপ্রকৃতির ওপর। বাজারও এখন মূলত এই চারটি সিগন্যালের দিকেই তাকিয়ে আছে।


সম্পর্কিত নিউজ