ইরানি হামলায় নিহত নেতানিয়াহু

ইরানি হামলায় নিহত নেতানিয়াহু
ছবির ক্যাপশান, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু | ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরাইলকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নিহত হওয়ার একটি দাবি ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ইরানের আধা সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিহত হয়েছেন এবং একই হামলায় দেশটির জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গিভর আহত হয়েছেন। তবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও স্বাধীন সূত্রগুলো এই দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ খুঁজে পায়নি।

ইরানি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইলের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর সেখানে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়। ওই হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারি বাসভবন। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, হামলার সময় তিনি ওই বাসভবনের ভেতরেই অবস্থান করছিলেন এবং বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু ঘটে। একই সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গিভর, যিনি হামলায় আহত হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়।

তবে তাসনিম নিউজের এই প্রতিবেদনের ভিত্তি মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পোস্ট। ওই পোস্টটি এক্স (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মে করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে, যেখানে মার্কিন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা স্কট রিটারের নামে একটি অ্যাকাউন্ট থেকে এই তথ্য প্রকাশিত হয়। পোস্টে বলা হয়েছিল, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি নেতানিয়াহুর বাসভবনে আঘাত হানে এবং বিস্ফোরণের ফলে তিনি নিহত হন।

কিন্তু যে অ্যাকাউন্ট থেকে এই পোস্টটি করা হয়েছে সেটি সত্যিই স্কট রিটারের অফিসিয়াল অ্যাকাউন্ট কি না, তা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এটি ভুয়া বা যাচাইবিহীন একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট হতে পারে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, এই দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ বা সরকারি নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফার্সি ভাষায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে হামলার কোনো ছবি, ভিডিও বা নির্ভরযোগ্য প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যও উল্লেখ করা হয়নি। বরং কিছু পরিস্থিতিগত বিষয় তুলে ধরে নেতানিয়াহুর মৃত্যু হয়েছে বলে অনুমান করা হয়েছে।

এর মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে নেতানিয়াহুর নতুন কোনো ভিডিও বার্তা প্রকাশ না হওয়া, তার বাসভবনের আশপাশে নিরাপত্তা জোরদার নিয়ে ইসরাইলি কিছু সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং কয়েকজন আন্তর্জাতিক নেতার সঙ্গে তার সম্ভাব্য বৈঠক স্থগিত হওয়ার বিষয়।

তবে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ও বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব তথ্য কোনোভাবেই নেতানিয়াহুর মৃত্যুর প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, ইসরাইল সরকারের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত এমন কোনো ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করা হয়নি।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের নথি অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর নামে সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছিল ৭ মার্চ। ওই বিবৃতিতে বলা হয়, তিনি ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলের শহর বিরশেবায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আহতদের দেখতে গিয়েছিলেন এবং সেখানে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সমবেদনা জানান।

এদিকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার কারণে উভয় পক্ষের মিডিয়ায় প্রায়ই তথ্যযুদ্ধ বা প্রোপাগান্ডা দেখা যায়। অনেক সময় যাচাইবিহীন তথ্য বা গুজব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং পরে তা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও উঠে আসে।

এ ধরনের গুজব নতুন নয়। এর আগেও চলতি মাসের ২ মার্চ কয়েকটি ইরানি গণমাধ্যমে একই ধরনের দাবি প্রকাশ করা হয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ধ্বংস হয়ে গেছে এবং নেতানিয়াহু নিহত হয়েছেন।

কিন্তু পরে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলো সেই খবর যাচাই করে জানায়, এটি ভিত্তিহীন একটি গুজব। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া এবং আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম তখন স্পষ্টভাবে জানায়, নেতানিয়াহুর মৃত্যুর খবর সত্য নয় এবং এমন কোনো ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের সময় তথ্যযুদ্ধও বড় একটি অংশ হয়ে দাঁড়ায়। যুদ্ধ বা উত্তেজনার সময় অনেক পক্ষই নিজেদের অবস্থান জোরালো করতে তথ্য বা গুজব ছড়িয়ে দেয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতেও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও কূটনৈতিক সূত্রগুলো সতর্কভাবে ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করছে। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিহত হয়েছেন-এমন দাবির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।

 


সম্পর্কিত নিউজ