যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য ছাড়লেন ৪০ হাজার মার্কিন নাগরিক

যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য ছাড়লেন ৪০ হাজার মার্কিন নাগরিক
ছবির ক্যাপশান, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য ছাড়ছেন মার্কিন নাগরিক

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সামরিক অভিযান শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত বদলে যাওয়া নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আকাশপথে ভ্রমণ সংকটের মধ্যে ৪০ হাজারের বেশি মার্কিন নাগরিক অঞ্চলটি ছেড়ে দেশে ফিরেছেন-যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর (স্টেট ডিপার্টমেন্ট) মঙ্গলবার (১০ মার্চ) এক বিবৃতিতে এই তথ্য জানিয়েছে। স্টেট ডিপার্টমেন্টের ভাষ্য, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যে বিপুল সংখ্যক মার্কিনি ফিরে এসেছেন, তাদের “অধিকাংশই” বাণিজ্যিক ফ্লাইট ও নিজস্ব ব্যবস্থায় দেশে ফিরতে পেরেছেন; তবে সরকার-সমন্বিত চার্টার ফ্লাইট ও স্থলপথের ব্যবস্থাও চালু রাখা হয়েছে।

সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে 

স্টেট ডিপার্টমেন্টের সহকারী সচিব ডিলান জনসনের (Dylan Johnson) বরাতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানায়, যুদ্ধ শুরুর প্রথম সপ্তাহেই দেশে ফেরা মার্কিন নাগরিকের সংখ্যা ধাপে ধাপে বেড়েছে। উদাহরণ হিসেবে-মার্চের প্রথম সপ্তাহে ১৭,৫০০ জন ফিরে আসার তথ্যও প্রকাশ পায়, পরে সংখ্যাটি ২০ হাজার ছাড়ায়, তারপর ২৪ হাজার, ২৮ হাজার, ৩৬ হাজার-এভাবে ধারাবাহিক আপডেটে ৪০ হাজারের বেশি হয়ে ওঠে। বিভিন্ন সময়ে ঘোষিত এসব সংখ্যায় “ট্রানজিটে থাকা” বা “অন্য দেশে চলে যাওয়া”-এদের অন্তর্ভুক্তি/বর্জনের ব্যাখ্যাও আলাদা ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

স্টেট ডিপার্টমেন্ট বলছে, যুদ্ধ শুরুর পর আকাশপথে বিধিনিষেধ, ফ্লাইট বাতিল এবং কিছু দেশের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শুরুতে অনেকে আটকে পড়েছিলেন। পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে থাকলে বাণিজ্যিক ফ্লাইটে আসন মিলেছে, আর যাদের জন্য সেটি সম্ভব হয়নি-তাদের ক্ষেত্রে চার্টার ফ্লাইট বা স্থলপথের বিকল্প রুট খোলা রাখা হয়।

চার্টার ফ্লাইট, স্থলপথ, জরুরি সহায়তা

সরকারি উদ্যোগের অংশ হিসেবে স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, তারা দুই ডজনেরও বেশি বিশেষ চার্টার ফ্লাইট পরিচালনা করেছে। এসব ফ্লাইটে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে মার্কিন নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের নিরাপদ ট্রানজিট হাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যেসব দেশে আকাশপথ বন্ধ বা সীমিত ছিল-সেখানে গ্রাউন্ড ট্রান্সপোর্ট (বাস/স্থলপথে) লোকজনকে অন্য দেশে নিয়ে গিয়ে ফ্লাইট ধরার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে: স্টেট ডিপার্টমেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, চার্টার ফ্লাইটে আসন থাকা সত্ত্বেও অনেক মার্কিনি সরকারি সহায়তা নিতে চাননি। এপি (AP) ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, চার্টার ফ্লাইটগুলো গড়ে ৪০ শতাংশেরও কম আসন পূর্ণতা নিয়ে চলেছে-অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সক্ষমতা বেশি ছিল। অনেকেই “আরও সুবিধাজনক” বাণিজ্যিক ফ্লাইট বেছে নিয়েছেন, কেউ কেউ আবার অবস্থানরত দেশেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

স্টেট ডিপার্টমেন্ট আরও বলেছে, ২৪/৭ একটি টাস্কফোর্স কাজ করছে-যেখানে ফোন/অনলাইন মাধ্যমে নিরাপত্তা নির্দেশনা, রুট পরামর্শ, এবং যাতায়াত সংক্রান্ত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কয়েকটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, হাজার হাজার মার্কিন নাগরিক সরাসরি তথ্য-সহায়তা পেয়েছেন এবং অনেকে “সিট অফার” পেয়েও তা নেননি।

জরুরি তহবিল ও “রিইম্বার্সমেন্ট” নীতি শিথিল

এই বড় ধরনের প্রত্যাবর্তন ব্যবস্থাপনায় স্টেট ডিপার্টমেন্ট সর্বোচ্চ ৪ কোটি ডলার (৪০ মিলিয়ন) পর্যন্ত জরুরি তহবিল ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে বলে এপি জানিয়েছে। সাধারণত আইন অনুযায়ী সরকার-আয়োজিত জরুরি পরিবহনে নাগরিকদের খরচ ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে; কিন্তু প্রতিবেদনে বলা হয়, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই রিইম্বার্সমেন্ট শর্ত মওকুফ করেছেন। একই সঙ্গে কংগ্রেস ও যাত্রীদের একাংশের অভিযোগ-প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট দ্রুত হয়নি-এই সমালোচনাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

মাঠের বাস্তবতা-ঝুঁকি, রুট বদল, দুর্ঘটনাও

যুদ্ধের কারণে পুরো অঞ্চলে ফ্লাইট নেটওয়ার্ক ও স্থলপথ-দুই ক্ষেত্রেই ঝুঁকি বেড়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের লাইভ কভারেজে উল্লেখ আছে, কাতার থেকে সরিয়ে নেওয়া মার্কিন নাগরিকদের বহনকারী একটি বাস সৌদি আরবে দুর্ঘটনায় পড়েছিল; এতে কয়েকজন আহত হন। এ ধরনের ঘটনা দেখাচ্ছে, আকাশপথ সীমিত হলে স্থলপথের বিকল্পও সবসময় ঝুঁকিমুক্ত নয়।

অন্যদিকে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশে থাকা নাগরিকদের সতর্কতা জারি করেছে-বিশেষ করে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া সংশ্লিষ্ট ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে কিছু এলাকায় দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, এবং যেখানে বাণিজ্যিক ফ্লাইট বন্ধ-সেখানে ওভারল্যান্ড রুটের কথা বলা হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতি 

স্টেট ডিপার্টমেন্টের সর্বশেষ অবস্থান হলো-অঞ্চলে বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতি করছে, কিন্তু এখনও চার্টার ফ্লাইট ও গ্রাউন্ড ট্রান্সপোর্ট অপশন চালু আছে। তারা বলছে, মধ্যপ্রাচ্য ছাড়তে ইচ্ছুক যে কোনো মার্কিন নাগরিককে সহায়তা দেওয়ার প্রচেষ্টা চলবে। একই সঙ্গে চাহিদা তুলনামূলক কম হওয়ায় “সক্ষমতার চেয়ে চাহিদা কম”-এই বাস্তবতাও সরকারি ভাষ্যে এসেছে।


সম্পর্কিত নিউজ