মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ: নিহত ও আহতের সংখ্যা কোন দেশে কত?

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ: নিহত ও আহতের সংখ্যা কোন দেশে কত?
ছবির ক্যাপশান, যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে মধ্যপ্রাচ্য। ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ ক্রমেই বিস্তৃত আকার নিচ্ছে, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে প্রাণহানি ও আহতের সংখ্যা। সংঘাতের শুরুতে এটি মূলত ইরানকে কেন্দ্র করে সীমিত সামরিক উত্তেজনা হিসেবে দেখা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে ইসরায়েল, লেবানন, উপসাগরীয় কয়েকটি আরব রাষ্ট্র এবং সেখানে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর ওপর।

বিভিন্ন দেশের সরকার, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, জাতিসংঘ সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য মিলিয়ে এখন যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তা মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম উদ্বেগজনক মানবিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার সর্বশেষ লাইভ ট্র্যাকার অনুযায়ী, ইরানে এখন পর্যন্ত অন্তত ১,২৫৫ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১২ হাজারের বেশি মানুষ। দেশটির স্বাস্থ্য খাত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে প্রকাশিত এ তথ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, হামলার সবচেয়ে বড় মানবিক মূল্য দিচ্ছে ইরানই। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে, আর আহতদের বড় অংশ বেসামরিক নাগরিক। সামরিক অবকাঠামোর পাশাপাশি জ্বালানি, নগর অবকাঠামো এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রাণহানির সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে।

ইসরায়েলেও হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে। আল জাজিরার তথ্যমতে, ইরানি হামলায় ইসরায়েলে অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন এবং আহতের সংখ্যা ১,৯২৯-এ পৌঁছেছে। তবে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের একটি প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা ১২ বলা হয়েছে, যা থেকে বোঝা যায় বিভিন্ন সূত্রে হিসাব সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে। তবু একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে এটি স্পষ্ট যে, ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর হতাহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং শত শত মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

লেবাননে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, সেখানে নিহতের সংখ্যা ৬৩৪-এ পৌঁছেছে। রয়টার্সের আগের এক প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা ৪৮৬ বলা হলেও সেটি কয়েক দিন আগের হিসাব, অর্থাৎ পরবর্তী হামলায় প্রাণহানি আরও বেড়েছে। আহতের সংখ্যা ১,৫০০-এর বেশি বলে আল জাজিরার ট্র্যাকার জানিয়েছে। লেবাননে ইসরায়েলি হামলা ও পাল্টা আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে শুধু হতাহতই নয়, বিশাল সংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুতও হয়েছেন। ফলে দেশটির স্বাস্থ্যসেবা, আশ্রয়ব্যবস্থা এবং জরুরি ত্রাণ কাঠামোর ওপরও প্রবল চাপ তৈরি হয়েছে।

মার্কিন বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতির বিষয়েও নতুন তথ্য সামনে এসেছে। আল জাজিরা বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটিতে হামলায় অন্তত ৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ১৮ জন। তবে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে নিহত মার্কিন সেনার সংখ্যা ৭ বলা হয়েছে। এই পার্থক্য থেকে বোঝা যায়, পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে এবং সামরিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাবও আপডেট হচ্ছে। তা সত্ত্বেও এটুকু নিশ্চিত যে, যুদ্ধের পরিধি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র শুধু অভিযান পরিচালনাকারী পক্ষ নয়, সরাসরি হতাহতের শিকার পক্ষও হয়ে উঠেছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোও আর এই সংঘাতের বাইরে নেই। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৪ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং ১০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। অপরদিকে আল জাজিরার ট্র্যাকারে উপসাগরীয় দেশগুলো মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা ১৭ বলা হয়েছে। এর মধ্যে কুয়েত, বাহরাইন, সৌদি আরব, ওমান ও কাতারের হতাহতের ঘটনাও যুক্ত রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কুয়েতে সামরিক ও বেসামরিক উভয় পর্যায়ে প্রাণহানির খবর এসেছে, বাহরাইন ও সৌদি আরবেও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, আর কাতারে অন্তত ১৬ জন আহত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। যদিও প্রতিটি দেশের সর্বশেষ সরকারি সংখ্যা একই উৎসে একত্রে পাওয়া যায়নি, তবু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর সম্মিলিত প্রতিবেদনে স্পষ্ট যে উপসাগরীয় অঞ্চলেও যুদ্ধের অভিঘাত সরাসরি পড়েছে।

ইরাকেও সংঘাতের ছায়া গভীর হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানে অন্তত ২৬ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রো-ইরান সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য, কুর্দি যোদ্ধা, নিরাপত্তাকর্মী এবং অন্তত একজন বেসামরিক নাগরিক রয়েছেন। ইরাকের অবস্থান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় দেশটি আবারও আঞ্চলিক প্রক্সি সংঘাতের মাঠে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।

সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সর্বশেষ হিসাব বলছে, এই যুদ্ধের মোট প্রাণহানি এখন প্রায় ২ হাজার বা তারও বেশি। আহতের সংখ্যা ১৩ হাজার ৫০০ ছাড়িয়েছে, আর শুধুমাত্র ইরান ও ইসরায়েলের ক্ষেত্রেই আহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। লেবাননের মানবিক সংকট, উপসাগরীয় অঞ্চলে অবকাঠামো ও বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি, এবং মার্কিন সেনা হতাহতের তথ্য একসঙ্গে প্রমাণ করছে-এটি আর কোনো সীমিত সামরিক সংঘাত নয়; বরং বহু দেশের মানুষকে সরাসরি আঘাত করা এক বহুমাত্রিক আঞ্চলিক যুদ্ধ। পরিস্থিতি যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে এই নিহত ও আহতের সংখ্যা আরও বাড়বে বলেই আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।


সম্পর্কিত নিউজ