{{ news.section.title }}
বৈশ্বিক তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার শঙ্কা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র খারগ দ্বীপে থাকা সব সামরিক লক্ষ্যবস্তু সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। খারগ দ্বীপকে ইরানের জ্বালানি অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়, কারণ দেশটির অপরিশোধিত তেল রপ্তানির বড় অংশই এই দ্বীপনির্ভর। ফলে এই হামলাকে শুধু সামরিক পদক্ষেপ নয়, বরং ইরানের অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
শুক্রবার রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে ট্রাম্প জানান, তেহরান যদি হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া অব্যাহত রাখে, তবে দ্বীপটির তেল অবকাঠামোগুলোতেও সরাসরি হামলা চালানো হবে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য হরমুজ প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রুট। এই পথ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিপুল পরিমাণ তেল বিশ্ববাজারে যায়। ফলে এই রুটকে ঘিরে যেকোনো সামরিক হুমকি বা অবরোধের আশঙ্কা সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে।
খারগ দ্বীপের ওপর হামলার তাৎপর্য নিয়ে সিএনএনে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মার্ক কিমিট সতর্ক করেন যে, এমন হামলা সংঘাতকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ স্তরে নিয়ে যেতে পারে। তাঁর ভাষায়, খারগ দ্বীপে হামলার কারণে যুদ্ধে ঝুঁকির মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে। বিষয়টি এখন আর শুধু সামরিক বাহিনী বা সরকার পতনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের অর্থনৈতিক কেন্দ্রকে লক্ষ্যবস্তু করছে। সিএনএনের সম্প্রচারে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সামরিক অভিযানের পরিধি আরও গভীরে যেতে পারে বলেও আলোচনা উঠে আসে।
খারগ দ্বীপকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়ার পর জ্বালানি বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আগেই হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় তেলের দাম দ্রুত বাড়ছিল। এখন খারগ দ্বীপের মতো কৌশলগত জ্বালানি কেন্দ্র সরাসরি হামলার আওতায় চলে আসায় বিশ্লেষকদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম দফার হামলায় মূলত সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করা হলেও ট্রাম্প পরবর্তী ধাপে তেল অবকাঠামোও আঘাতের মুখে পড়তে পারে বলে প্রকাশ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। খারগ দ্বীপে বড় ধরনের ক্ষতি হলে শুধু ইরানের রপ্তানি নয়, পুরো অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা চাপে পড়তে পারে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ভয়, বীমা খরচ বৃদ্ধি, জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি এবং বাজারে আতঙ্ক-সব মিলিয়ে তেলের দামে দ্রুত অস্থিরতা তৈরি হয়।
এদিকে পেন্টাগন সূত্রের বরাতে সিএনএন জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তজনা মোকাবিলায় মার্কিন নৌবাহিনীর একটি ‘মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট’ মোতায়েন করা হচ্ছে। এপি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই মোতায়েনের সঙ্গে প্রায় আড়াই হাজার মেরিন এবং ইউএসএস ট্রিপোলির মতো নৌ-সামরিক সক্ষমতাও যুক্ত হতে পারে, যা থেকে বোঝা যাচ্ছে, ওয়াশিংটন সংঘাতকে শুধু আকাশপথের হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছে না; বরং আঞ্চলিক উপস্থিতিও জোরদার করছে।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, দ্বীপের সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলো ‘সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন’ করা হলেও ইরান এই ক্ষয়ক্ষতির দাবিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে, খারগ দ্বীপের তেল সংশ্লিষ্ট কোনো অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান থেকে বোঝা যাচ্ছে, যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব ক্ষয়ক্ষতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তথ্যযুদ্ধও এখন সমান তীব্র। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র হামলার কার্যকারিতা তুলে ধরতে চাইছে, অন্যদিকে ইরান তার জ্বালানি সক্ষমতা অক্ষত আছে-এমন বার্তা দিতে চাইছে।
সিএনএনের সম্প্রচারে আরও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ধাপে ধাপে ইরানের গভীরে সামরিক চাপ বাড়াচ্ছে। সেখানে আলোচনায় বলা হয়, শুরুর দূরপাল্লার স্ট্যান্ডঅফ হামলা থেকে আরও সরাসরি ও গভীর লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের কৌশলে যাওয়া হচ্ছে। এই সামরিক পরিবর্তন সংঘাতকে আরও দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।
খারগ দ্বীপে হামলা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে নতুন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এখন সংঘাত শুধু সামরিক ঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা বা রাজনৈতিক নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে নয়; বরং জ্বালানি রপ্তানি, অর্থনৈতিক অবকাঠামো এবং বৈশ্বিক বাজারের স্থিতিশীলতাকেও সরাসরি প্রভাবিত করছে। হরমুজ প্রণালী ও খারগ দ্বীপ-এই দুই কেন্দ্রকে ঘিরে পরিস্থিতি আরও জটিল হলে তার অভিঘাত শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বিশ্ববাজারেও তা বড়সড় ধাক্কা হয়ে দেখা দিতে পারে।