যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে ট্রাম্পের ডাকে সাড়া কেমন?

যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে ট্রাম্পের ডাকে সাড়া কেমন?
ছবির ক্যাপশান, যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে ট্রাম্পের ডাকে সাড়া কেমন?

বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা যখন চরমে, তখন তেলবাহী ট্যাংকারের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন দেশকে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে শনিবার তিনি চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাজ্যকে এ ধরনের নৌ-সহায়তায় এগিয়ে আসার অনুরোধ জানান-যাতে হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী জ্বালানি ট্যাংকারগুলো সামরিক পাহারায় নিরাপদে চলতে পারে।

কেন হরমুজ নিয়ে এত চাপ

হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি পরিবহনের বড় একটি অংশ চলে। ফলে এই জলপথে অস্থিরতা তৈরি হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও সরাসরি ধাক্কা লাগে। ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান ওই পথ কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার পর পরিস্থিতি সামাল দিতে মার্কিন মিত্রদের পাশাপাশি অন্যান্য দেশগুলোকেও দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। লক্ষ্য একটাই-ট্যাংকার চলাচল অব্যাহত রাখা এবং জ্বালানি সংকট আরও ঘনীভূত হওয়া ঠেকানো।

ট্রাম্প কীভাবে আহ্বান জানিয়েছেন

প্রতিবেদনগুলো অনুযায়ী, ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্য আহ্বান জানিয়ে বলেন-হরমুজকে “খোলা ও নিরাপদ” রাখতে বহু দেশেরই এগিয়ে আসা উচিত, কারণ এই নৌপথের নিরাপত্তা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের একার বোঝা হতে পারে না। একই সঙ্গে তিনি এমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন-যুক্তরাষ্ট্র সমন্বয় করলে অপারেশন দ্রুত এগোনো সম্ভব, তবে “শেয়ারড রেসপনসিবিলিটি” বা ভাগাভাগির ভিত্তিতে নৌ উপস্থিতি বাড়াতে হবে।

যুক্তরাজ্য: “বিকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে”

ট্রাম্পের আহ্বানের পর যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র মার্কিন গণমাধ্যমকে বলেন, তারা ওই অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছে। অর্থাৎ লন্ডন সরাসরি “হ্যাঁ” বা “না” না বললেও বিষয়টি নিয়ে কূটনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ে কথাবার্তা যে চলছে-সে বার্তাই দিয়েছে।

চীন: “শত্রুতা বন্ধ হোক, স্থিতিশীল সরবরাহের দায়িত্ব সবার”

চীনের অবস্থান তুলনামূলকভাবে কূটনৈতিক ভাষায় এসেছে। মার্কিন গণমাধ্যমকে চীনা দূতাবাসের কর্মকর্তারা বলেছেন-বেইজিং সব ধরনের শত্রুতা বন্ধের আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে তারা বলেছে, স্থিতিশীল এবং বাধাহীন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দায়িত্ব সব পক্ষেরই রয়েছে। তবে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর বিষয়ে চীন কোনো প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতি দেয়নি-এমনটাই আন্তর্জাতিক রিপোর্টে উঠে এসেছে।

জাপান: “ট্রাম্প বললেই সিদ্ধান্ত নয়”

জাপানের প্রতিক্রিয়ায় সরাসরি একটি বার্তা স্পষ্ট-ট্রাম্প অনুরোধ করেছেন বলেই টোকিও যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে না। জাপানি কর্মকর্তারা স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেছেন, জাপান নিজস্ব সিদ্ধান্ত নিজেই গ্রহণ করে, আর “স্বাধীন বিচার-বিবেচনা” তাদের মৌলিক নীতি। অর্থাৎ হরমুজের নিরাপত্তা জাপানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর মতো সিদ্ধান্ত কেবল অনুরোধের ভিত্তিতে নয়-আইনি কাঠামো, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েই হবে।

ফ্রান্স: “না-রণতরী পূর্ব ভূমধ্যসাগরেই থাকবে”

ফ্রান্স ট্রাম্পের আহ্বানে সবচেয়ে স্পষ্ট ভাষায় সাড়া দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়-“না”, ফরাসি বিমানবাহী রণতরী এবং এর নৌবহর পূর্ব ভূমধ্যসাগরেই থাকছে। অর্থাৎ ফ্রান্স এই পর্যায়ে হরমুজে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি-এবং প্রকাশ্যেই তা জানিয়ে দিয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়া: “সতর্ক পর্যালোচনা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ”

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে-ট্রাম্পের আহ্বান সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করা হবে এবং একই সঙ্গে এই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যোগাযোগ বজায় রাখা হবে। সিউলও এখনও প্রকাশ্যে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি, তবে বিষয়টিকে তারা “ওপেন” রেখেছে-এমনটাই ইঙ্গিত।

এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি কী

আন্তর্জাতিক রিপোর্টগুলোতে একটি বিষয় একইভাবে এসেছে-ট্রাম্পের আহ্বানের পরও এখন পর্যন্ত কোনো দেশই প্রকাশ্যে “আমরা যুদ্ধজাহাজ পাঠাচ্ছি”-এমন নিশ্চিত ঘোষণা দেয়নি। বরং কেউ আলোচনা চলছে বলেছে, কেউ কূটনৈতিক আহ্বান জানিয়েছে, কেউ নাকচ করেছে, কেউ পর্যালোচনার কথা বলেছে। এই অবস্থায় হরমুজে ট্যাংকার চলাচল কীভাবে স্বাভাবিক হবে-তা নির্ভর করবে পরবর্তী কয়েক দিনের কূটনৈতিক সমন্বয়, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সামরিক ঝুঁকি মূল্যায়নের ওপর।
 


সম্পর্কিত নিউজ