হরমুজের সংকট মোকাবিলায় চীনের দিকে হাত বাড়ালেন ট্রাম্প!

হরমুজের সংকট মোকাবিলায় চীনের দিকে হাত বাড়ালেন ট্রাম্প!
ছবির ক্যাপশান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (বাঁয়ে) ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংফাইল ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন মিত্রদেশের পাশাপাশি চীনের সহায়তা চেয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

গত শনিবার ট্রাম্প ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ মিত্রদেশগুলোর কাছে এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ নিরাপদ রাখতে সহযোগিতার আহ্বান জানান। তবে সোমবার জাপান ও অস্ট্রেলিয়া জানিয়ে দিয়েছে, তারা এই নৌপথে জাহাজ পাহারার জন্য কোনো যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর পরিকল্পনা করছে না।

ট্রাম্পের এই আহ্বান সম্পর্কে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি চীন।

বিশ্বে ব্যবহৃত মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়েই পরিবহন করা হয়। এর মধ্যেই বাগদাদে মার্কিন দূতাবাস এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বড় জ্বালানি স্থাপনায় ইরানের হামলার ঘটনায় জ্বালানি খাতে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

শনিবার পর্যন্ত সংঘাত কমার তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। ওই দিন ট্রাম্প বিভিন্ন দেশকে এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ সুরক্ষায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। একই দিনে বাগদাদের মার্কিন দূতাবাস ও আমিরাতের একটি বড় জ্বালানি স্থাপনায় হামলার ঘটনাও ঘটে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মিত্রদেশগুলোর সমন্বয়ে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে একটি জোট গঠনের প্রস্তাব দেওয়ার পর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেছেন, সংবিধানের যুদ্ধবিরোধী বাধ্যবাধকতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজ পাহারার জন্য যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা জাপানের নেই।

পার্লামেন্টে তাকাইচি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে পাহারা দেওয়ার জন্য জাহাজ পাঠানোর বিষয়ে আমরা কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি। আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে জাপান স্বতন্ত্রভাবে কী করতে পারে, আমরা তা খতিয়ে দেখছি।’

ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র অস্ট্রেলিয়াও জানিয়েছে, তাদের কাছে এ ধরনের কোনো অনুরোধ এখনো পৌঁছায়নি। ফলে তারাও এই প্রণালি উন্মুক্ত করতে কোনো যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে না।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজের মন্ত্রিসভার সদস্য ক্যাথরিন কিং এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা জানি, এটি (প্রণালি উন্মুক্ত করা) কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের কাছে এমন কোনো অনুরোধ করা হয়নি এবং আমরা এতে অংশ নিচ্ছি না।’

ট্রাম্পের বেইজিং সফর পিছিয়ে যেতে পারে

গতকাল রোববার ‘ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি আশা করছেন, এ মাসের শেষে বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠকের আগেই চীন হরমুজ প্রণালি সচল করতে সহায়তা করবে। যদি তারা সাহায্য না করে, তবে তিনি তাঁর সফর পিছিয়ে দিতে পারেন।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মনে করি, চীনেরও সাহায্য করা উচিত। কারণ, চীন তাদের তেলের ৯০ শতাংশই এই প্রণালি দিয়ে পায়। তারা যদি উপসাগরীয় অঞ্চলে সহায়তা না দেয়, তবে আমরা সফর পিছিয়ে দিতে পারি।’

এ বিষয়ে রয়টার্সের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হলে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।

হরমুজ প্রণালি চালু করতে ইউরোপীয় মিত্রদের ওপরও চাপ সৃষ্টি করেছেন ট্রাম্প। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ন্যাটো সদস্যরা ওয়াশিংটনকে সাহায্য করতে ব্যর্থ হহলে এই জোটের ভবিষ্যৎ ‘খুবই খারাপ’ হতে পারে।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যে একটি ছোট নৌ মিশন আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আজ বৈঠকে বসছেন। তবে আপাতত অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়ে তারা কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে না।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ডাউনিং স্ট্রিটের একজন মুখপাত্র গতকাল বলেন, প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ট্রাম্পের সঙ্গে ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সঙ্গে প্রণালিটি চালু করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেছেন।

এদিকে দক্ষিণ কোরিয়া জানিয়েছে, ট্রাম্পের অনুরোধ তারা সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করবে।

অন্যদিকে ইরানের কিছু জাহাজ এবং আরও কয়েকটি দেশের সীমিতসংখ্যক জাহাজ এই পথ দিয়ে যাতায়াত করতে পেরেছে। তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে অধিকাংশ আন্তর্জাতিক তেলবাহী জাহাজের জন্য প্রণালিটি কার্যত বন্ধ রয়েছে। ওই দিন থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে এবং ইরানের বহু স্থাপনায় হামলা চালায়।

এর আগে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, মার্কিন নৌবাহিনী ‘খুব শিগগির’ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ নিরাপত্তা দিয়ে চলাচল নিশ্চিত করবে। তবে শনিবার তিনি মিত্রদেশগুলোর পাশাপাশি চীনের কাছেও অতিরিক্ত সহায়তার আহ্বান জানান।

নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছেন, ‘অনেক দেশই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে, যাতে প্রণালিটি উন্মুক্ত ও নিরাপদ রাখা যায়।’ তবে কোন কোন দেশ জাহাজ পাঠাচ্ছে, তা তিনি প্রকাশ করেননি।


সম্পর্কিত নিউজ