{{ news.section.title }}
ইরান যুদ্ধ যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধাস্ত্রের মজুত শেষ করছে
ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা ও আঞ্চলিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এই ধরনের সংঘর্ষ ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে ইরানের মতো প্রতিপক্ষ যখন তুলনামূলক সস্তা কিন্তু ব্যাপকসংখ্যক ড্রোন, রকেট বা ক্লাস্টার-ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে, তখন প্রতিরক্ষার জন্য ইসরায়েলকে বারবার উন্নত ও ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়।
ফিলাডেলফিয়াভিত্তিক থিংক ট্যাংক 'ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট'-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সাথে যুদ্ধের প্রথম চার দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ৩৫ ধরনের ৫ হাজার ১৯৭টি যুদ্ধাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
নথিতে দেশ দুটির যুদ্ধাস্ত্র ফুরিয়ে যাওয়ার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে
:
-৯৪৩টি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর (প্রতিটির দাম প্রায় ৪০ লাখ ডলার) নিক্ষেপ করা হয়েছে। এর মানে হলো, মাত্র ৯৬ ঘণ্টায় ১৮ মাসের স্বাভাবিক উৎপাদনের (মাসে সর্বোচ্চ ৫২টি) সমপরিমাণ অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
-১৪৫টি থাড (THAAD) ইন্টারসেপ্টর (প্রতিটির দাম প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ডলার) নিক্ষেপ করা হয়েছে। অভিযানের আগে এর মজুত ছিল প্রায় ৫০০টি, যার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে।
-ইসরায়েলের অ্যারো (Arrow) ইন্টারসেপ্টর (প্রতিটির দাম প্রায় ৩০ লাখ ডলার) ইতিমধ্যে ৫০ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে। এর সম্পূর্ণ ঘাটতি পূরণে ৩২ মাস বা আড়াই বছরেরও বেশি সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
-২২৫টি অ্যাটাকমস (ATACMS, প্রতিটির দাম ১০ লাখ ডলার) এবং পিআরএসএম (PrSM, প্রতিটির দাম ২০ লাখ ডলার) ভূমি থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ব্যালিস্টিক মিসাইল ব্যবহার করা হয়েছে এবং এগুলোর প্রতিটির মজুত এক-তৃতীয়াংশ ফুরিয়েছে।
-৩৭৫টি টমাহক ক্রুজ মিসাইল (প্রতিটির দাম ২০ লাখ ডলার) ছোড়া হয়েছে এবং এর ঘাটতি পূরণে কমপক্ষে ৫৩ মাস বা চার বছরেরও বেশি সময় লাগবে।
-আটটি জিবিইউ-৫৭ বাঙ্কার-বাস্টার (প্রতিটির দাম ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার) ব্যবহার করা হয়েছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের অবশিষ্ট মজুতের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এবং ২০২৮ সালের আগে এর নতুন সরবরাহ পাওয়া যাবে না।
-কাতার, বাহরাইন, জর্ডান, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ধ্বংস হওয়া একাধিক উন্নত রাডারের পাশাপাশি ১১টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন (প্রতিটির দাম ৩ কোটি ডলার) হারানো গেছে।
-শুধু যুদ্ধাস্ত্রের ঘাটতি পূরণের খরচই দাঁড়াবে ১০ থেকে ১৬ বিলিয়ন ডলার।
- নিজেদের গোলায় (ফ্রেন্ডলি ফায়ার) ধ্বংস হওয়া যুদ্ধবিমানসহ মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে পাহাড়সম ২০ বিলিয়ন ডলার।
-এই হিসাবের মধ্যে "যুদ্ধসরঞ্জামের ক্ষতি বা ঘাঁটির ক্ষয়ক্ষতি এবং উচ্চ প্রযুক্তির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার" ক্ষতি অন্তর্ভুক্ত নয়।
ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও আঞ্চলিক সংঘাত এমন একটি বাস্তবতা তৈরি করেছে যেখানে “খরচ বনাম প্রতিরক্ষা” একটি বড় কৌশলগত ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান ও তার মিত্র গোষ্ঠীগুলো সাধারণত তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন, রকেট ও ব্যালিস্টিক মিসাইল ব্যবহার করে বড় পরিমাণে আক্রমণ চালায়। এই ধরনের “স্যাচুরেশন অ্যাটাক”-এর উদ্দেশ্য হলো প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে একসাথে অনেক লক্ষ্যবস্তুর মুখোমুখি দাঁড় করানো, যাতে প্রতিটি হুমকি ঠেকাতে গিয়ে প্রতিরক্ষাকারী পক্ষকে দ্রুত তাদের মূল্যবান মিসাইল ব্যবহার করতে হয়।
ইসরায়েলের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটি তার আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য বহুস্তরীয় ব্যবস্থা ব্যবহার করে—যেমন Iron Dome স্বল্পপাল্লার রকেট প্রতিরোধ করে, David’s Sling মাঝারি পাল্লার হুমকি মোকাবিলা করে, আর Arrow missile defense system দীর্ঘপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়। এই প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর মিসাইল অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তির হওয়ায় এর উৎপাদন খরচ অনেক বেশি। ফলে যদি প্রতিদিন বা ধারাবাহিকভাবে বহু সংখ্যক রকেট বা ড্রোন আক্রমণ আসে, তাহলে প্রতিরক্ষার জন্য ব্যবহৃত মিসাইলের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে এবং মজুতের ওপর চাপ পড়ে।
একই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ঘাঁটি ও মিত্রদের সুরক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র নিয়মিতভাবে উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মিসাইল ও গোলাবারুদ সরবরাহ করে। এই অস্ত্রগুলোর একটি বড় অংশ তৈরি করে Lockheed Martin, Raytheon Technologies প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সমস্যা হলো, উন্নত গাইডেড মিসাইল বা প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টর খুব দ্রুত উৎপাদন করা যায় না—এগুলোর জন্য জটিল সাপ্লাই চেইন, বিশেষ উপাদান এবং সময় প্রয়োজন। ফলে যদি দীর্ঘমেয়াদে সংঘাত চলতে থাকে, তাহলে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ফাঁক তৈরি হতে পারে।