{{ news.section.title }}
ইরানের স্বল্পমূল্যের ড্রোনে পাল্টে যাচ্ছে আকাশযুদ্ধ
দীর্ঘদিন ধরে আকাশের নিয়ন্ত্রণ মূলত সেসব ধনী দেশের হাতেই ছিল, যাদের কাছে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান কেনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং পাইলট প্রশিক্ষণের মতো ব্যয়বহুল সামরিক সক্ষমতা গড়ে তোলার পর্যাপ্ত অর্থ ছিল। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের সেই পুরোনো সমীকরণ এখন দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে।
তুলনামূলক কম খরচে তৈরি একমুখী আক্রমণ ড্রোন, লয়টারিং মিউনিশন এবং রিমোট-চালিত সস্তা আকাশযান বড় শক্তিধর দেশগুলোর প্রযুক্তিগত সুবিধাকে ধীরে ধীরে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ এবং ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিচ্ছে, আক্রমণ এখন আগের চেয়ে অনেক সস্তা, কিন্তু প্রতিরক্ষা অনেক বেশি ব্যয়বহুল। রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আধুনিক আকাশযুদ্ধে এই খরচের বৈষম্যই এখন বড় কৌশলগত প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আকাশশক্তি বনাম নতুন ড্রোন বাস্তবতা
বহু বছর ধরে বিপুল সামরিক বাজেটের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী আকাশযুদ্ধ সক্ষমতাগুলোর একটি গড়ে তুলেছে। ইরানের বিরুদ্ধে “অপারেশন এপিক ফিউরি” নামে পরিচালিত অভিযানে ওয়াশিংটন তাদের বিভিন্ন উন্নত বিমান ও ড্রোন মোতায়েন করেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। এর মধ্যে ছিল স্বল্পমূল্যের নতুন এফএলএম-১৩৬ লুকাস ড্রোন, যা যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো ইরানের যুদ্ধে ব্যবহার করেছে। এই ড্রোনটি শুধু দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্রে আনা হয়নি, বরং পেন্টাগনের স্বাভাবিক দীর্ঘ ক্রয়প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে মাত্র আট মাসের মধ্যে তা অপারেশনাল পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে-যা নিজেই একটি বড় বার্তা।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লুকাস একটি কম খরচের “attritable” বা হারিয়ে গেলেও তুলনামূলক কম ক্ষতির ড্রোন। এর প্রতিটির আনুমানিক খরচ প্রায় ৩৫ হাজার ডলার, যা এমকিউ-৯ রিপারের মতো উন্নত ড্রোনের তুলনায় অনেক কম। এমকিউ-৯ রিপারের দাম প্রায় ২ থেকে ৪ কোটি ডলারের মধ্যে, যদিও সেটি পুনঃব্যবহারযোগ্য এবং অনেক বেশি উন্নত। লুকাসের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো, এটি ইরানের শাহেদ ড্রোনের আদলে তৈরি। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড নিজেই বলেছে, লুকাস মডেলটি শাহেদের নকশা থেকে অনুপ্রাণিত।
শাহেদ-১৩৬: কম খরচে বড় চাপ
ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোন এখন আধুনিক আকাশযুদ্ধের এক নতুন প্রতীক হয়ে উঠেছে। এটি একটি একমুখী আক্রমণ ড্রোন-অর্থাৎ লক্ষ্যবস্তুর দিকে উড়ে গিয়ে আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরিত হয়। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, একটি শাহেদ ড্রোন তৈরিতে আনুমানিক ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার খরচ হয়। তুলনায়, একটি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের দাম প্রায় ৪০ লাখ ডলার। সেই হিসাবে, একটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের দামে প্রায় ১১৫টি একমুখী আক্রমণ ড্রোন তৈরি করা সম্ভব। এই তুলনাটিই বর্তমানে আকাশ প্রতিরক্ষার অর্থনীতিকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
রয়টার্স আরও বলেছে, সংঘাতের প্রথম সপ্তাহেই ইরান এক হাজারের বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করে এবং তাদের মাসে প্রায় ১০ হাজার ড্রোন উৎপাদনের সক্ষমতা আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতিপক্ষ যদি কম দামে বিপুলসংখ্যক ড্রোন ছাড়তে পারে, তাহলে ব্যয়বহুল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলা অনেক সহজ হয়ে যায়। এই কৌশলে ড্রোনগুলো ঢেউয়ের মতো আসে, আকাশ সুরক্ষাব্যবস্থাকে ক্লান্ত ও দুর্বল করার চেষ্টা করে, এবং শেষ পর্যন্ত কিছু ড্রোন লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে গেলে সাফল্য ধরা হয়।
ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা, সস্তা আক্রমণ
এই খরচের বৈষম্য শুধু সংখ্যার পার্থক্য নয়, এটি একটি গভীর কৌশলগত সংকেত। রয়টার্সের গ্রাফিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, থাড বা প্যাট্রিয়টের মতো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ ব্যাটারি সিস্টেমের খরচ ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি হতে পারে। শুধু ইন্টারসেপ্টর ইউনিটের খরচই মিলিয়নের ঘরে। প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর যেখানে প্রায় ৪০ লাখ ডলার, সেখানে থাড ইন্টারসেপ্টর ১ কোটি ৩০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫৫ লাখ ডলারের মধ্যে হতে পারে।
এই প্রসঙ্গে পেন্টাগনের প্রধান অস্ত্র ক্রেতা বিল লা প্লান্তের আগের একটি সতর্কবার্তাও উদ্ধৃত করেছে রয়টার্স। তিনি বলেছিলেন, ‘যদি আমরা ৫০ হাজার ডলারের একমুখী ড্রোনকে ৩০ লাখ ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করি, সেটি ভালো খরচের সমীকরণ নয়।’ এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নয়, যুদ্ধের অর্থনীতিও এখন বড় বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। একই বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে লোহিত সাগরে জাহাজ রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী প্রায় ১০০ কোটি ডলার বা তারও বেশি মূল্যের অস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে সস্তা হুথি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে।
ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়েছে নতুন পথ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুদ্ধ প্রযুক্তির পরিবর্তন সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে দেখা গেছে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে। রয়টার্সের ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতে যুদ্ধটি ট্যাংক ও আর্টিলারি নির্ভর থাকলেও দ্রুত তা ড্রোন-নির্ভর লড়াইয়ে রূপ নেয়। প্রচলিত আকাশশক্তিতে পিছিয়ে থেকেও ইউক্রেন সস্তা ড্রোন দিয়ে নজরদারি ও হামলায় বড় প্রভাব ফেলেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ড্রোনের কারণে রাশিয়ার প্রায় ৭০ শতাংশ হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে অনুমান করা হয়। এই অভিজ্ঞতাই যুক্তরাষ্ট্রকে দ্রুত সস্তা সামরিক ড্রোনের দিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য করেছে।
লুকাস বনাম শাহেদ: একই যুদ্ধদর্শনের দুই সংস্করণ
এফএলএম-১৩৬ লুকাস এবং শাহেদ-১৩৬–এর মধ্যে নকশাগত মিল রয়েছে। রয়টার্সের তুলনামূলক চিত্রে দেখা গেছে, শাহেদের অপারেশনাল রেঞ্জ প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার, আর লুকাসের রেঞ্জ আনুমানিক ১,০০০ থেকে ২,০০০ কিলোমিটার। শাহেদের পে-লোড প্রায় ৮৮ পাউন্ড, আর লুকাসের প্রায় ৪০ পাউন্ড। খরচে লুকাস দাঁড়ায় প্রায় ৩৫ হাজার ডলারে, যা শাহেদের আনুমানিক খরচসীমার ভেতরেই পড়ে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র এখন কার্যত এমন এক অস্ত্রের উত্তর তৈরি করছে, যা তাদের প্রতিপক্ষের ব্যবহৃত সস্তা রণকৌশলকে বুঝে পাল্টা প্রয়োগের চেষ্টা।
সব মিলিয়ে স্পষ্ট, আকাশযুদ্ধ এখন আর শুধু এফ-১৫, এফ-৩৫, বি-১ বা বি-২–এর মতো ব্যয়বহুল প্ল্যাটফর্মের প্রতিযোগিতা নয়। যুদ্ধক্ষেত্রে কম খরচে, দ্রুত উৎপাদনযোগ্য এবং দূরনিয়ন্ত্রিত ড্রোনের বিস্তার এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে আক্রমণ অনেক সহজ ও সস্তা, কিন্তু প্রতিরক্ষা ক্রমেই বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। এই নতুন বাস্তবতায় বড় শক্তিগুলোকেও কৌশল বদলাতে হচ্ছে। আর সেখানেই ড্রোনের যুদ্ধ আকাশের পুরোনো ক্ষমতার কাঠামোকে নতুন করে লিখে দিচ্ছে।