{{ news.section.title }}
লেবাননের কাসমিয়া সেতুতে ইসরায়েলি হামলা
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলকে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত রাখা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়কসংযোগ কাসমিয়া সেতুতে ইসরায়েলি হামলার পর নতুন করে মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সেতুটি লিতানি নদীর ওপর অবস্থিত এবং উত্তর ও দক্ষিণ লেবাননের মধ্যে যাতায়াত, ত্রাণ পরিবহন, চিকিৎসাসামগ্রী পাঠানো এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের চলাচলের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আল জাজিরা ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেতুতে হামলার ফলে দক্ষিণ লিতানি অঞ্চল কার্যত আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং লেবাননের অভ্যন্তরে চলমান সামরিক অভিযানের একটি নতুন পর্যায় শুরু হয়েছে।
হামলার পটভূমি
রোববারের এই হামলার আগে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ লিতানি নদীর ওপর সব পারাপারের পথ এবং সীমান্তসংলগ্ন লেবাননের অভ্যন্তরে সব বাড়িঘর ধ্বংসের নির্দেশ দেন। রয়টার্স জানিয়েছে, কাৎজের এই নির্দেশ ছিল দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর চলাচল, অস্ত্র স্থানান্তর এবং সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে তাদের অবস্থান দুর্বল করার কৌশলের অংশ। এর আগে গত ১৩ ও ১৮ মার্চও লিতানি নদীর ওপর একাধিক সেতুতে হামলা চালানো হয়, যা দেখায় যে এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং ধাপে ধাপে অবকাঠামো ভেঙে ফেলার একটি পরিকল্পিত ধারাবাহিকতা।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইসরায়েল এখন লেবানন সীমান্তে এমন এক কৌশল অনুসরণ করছে, যেখানে শুধু সামরিক লক্ষ্য নয়, সীমান্তবর্তী গ্রাম, সড়কপথ, সেতু এবং বসতবাড়িও “নিরাপত্তা বলয়” তৈরির অংশ হিসেবে ধ্বংস করা হচ্ছে। একই কৌশল গাজায় প্রয়োগের কথাও ইসরায়েলি নেতৃত্ব প্রকাশ্যে উল্লেখ করেছে।
প্রেসিডেন্ট আউনের কঠোর প্রতিক্রিয়া
সেতুতে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন। তিনি বলেন, সেতুটিতে হামলা ছিল “দক্ষিণ লিতানি অঞ্চলকে লেবাননের বাকি অংশ থেকে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার অপচেষ্টা”। তিনি আরও বলেন, এসব হামলা “ইসরাইলি সীমান্তজুড়ে একটি বাফার জোন গড়ে তোলার সন্দেহজনক পরিকল্পনার অংশ, যা দখলদারিত্বের বাস্তবতা জোরদার করা এবং লেবাননের ভেতরে ইসরাইলি সম্প্রসারণের চক্রান্তের অংশ।” আল জাজিরা, টিআরটি ও আল আরাবিয়া-একাধিক আন্তর্জাতিক মাধ্যমে তাঁর এই বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে।
আউনের ভাষ্য অনুযায়ী, এ হামলা শুধু অবকাঠামো ধ্বংসের ঘটনা নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ স্থল আগ্রাসনের পূর্বাভাস হতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশও মনে করছেন, সেতু ও সীমান্তঘেঁষা বাড়িঘর ধ্বংসের লক্ষ্য কেবল তাৎক্ষণিক সামরিক সুবিধা নয়, বরং দক্ষিণ লেবাননে দীর্ঘমেয়াদি ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা।
মানবিক সহায়তায় কেন বড় ঝুঁকি
কাসমিয়া সেতু ধ্বংস হওয়ার সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ছে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে। আল জাজিরা ও রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর ও দক্ষিণ লেবাননের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় ত্রাণ, ওষুধ, খাদ্য, জ্বালানি এবং জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে। দক্ষিণ লিতানি অঞ্চলে বহু বেসামরিক মানুষ স্কুল, হাসপাতাল এবং অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে আটকা রয়েছেন। প্রধান সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাদের কাছে পৌঁছানো এখন অনেক বেশি জটিল।
জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো আগেই সতর্ক করেছিল যে, দক্ষিণ লেবাননের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হলে মানবিক পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটবে। রয়টার্সের ২২ মার্চের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সেতু ও যোগাযোগব্যবস্থায় আঘাতের কারণে দক্ষিণাঞ্চলে প্রয়োজনীয় সরবরাহ পৌঁছানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে এবং এতে “humanitarian catastrophe” বা মানবিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়ছে।
লিতানির দক্ষিণে কী পরিস্থিতি
দক্ষিণ লিতানি অঞ্চল এখন ক্রমেই একটি চাপা অবরোধ পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সীমান্তবর্তী বহু এলাকা আগে থেকেই গোলাবর্ষণ, বিমান হামলা এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। এখন তার সঙ্গে যোগ হয়েছে সেতু ও সড়ক বিচ্ছিন্নতা। আল জাজিরার বিশ্লেষণ বলছে, সেতুগুলো ধ্বংস হয়ে গেলে শুধু সামরিক রসদ নয়, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন বেঁচে থাকা, চিকিৎসা পাওয়া এবং নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াও প্রায় অচল হয়ে পড়ে।
এদিকে দ্য গার্ডিয়ানের একটি প্রতিবেদনে দক্ষিণ লেবাননের স্বাস্থ্যকর্মীদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, চলমান হামলায় চিকিৎসা অবকাঠামোও তীব্র চাপে রয়েছে; অনেক অ্যাম্বুলেন্স, ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র হামলার শিকার হয়েছে। ফলে সেতু ভেঙে যাওয়ার অর্থ কেবল রাস্তা বন্ধ হওয়া নয় - অনেক ক্ষেত্রে আহতদের হাসপাতালে পৌঁছানোর শেষ ভরসাটুকুও হারিয়ে যাওয়া।
কাসমিয়া সেতুতে হামলা দক্ষিণ লেবাননের যুদ্ধকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এটি দেখাচ্ছে, লড়াই এখন আর শুধু সীমান্তবর্তী গোলাগুলি বা নির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং বেসামরিক জীবনযাত্রার ওপরও সরাসরি আঘাত হানা হচ্ছে। এর ফলে শুধু সামরিক ভারসাম্য নয়, পুরো অঞ্চলের মানবিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাও বদলে যেতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা