ট্রাম্পের হামলা স্থগিত করায় তেলের দামে বড় পতন

ট্রাম্পের হামলা স্থগিত করায় তেলের দামে বড় পতন
ছবির ক্যাপশান, ট্রাম্পের হামলা স্থগিত করায় তেলের দামে বড় পতন

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। গতকাল ২৩ মার্চ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে সম্ভাব্য হামলা পাঁচ দিন পিছিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে। আজ ২৪ মার্চ সেই প্রভাবের ধারাবাহিকতায় বাজারে বড় ধরনের ওঠানামার চিত্র দেখা যাচ্ছে।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল ঘোষণার পরপরই ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্সের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এক পর্যায়ে তা ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০৪ দশমিক ১ ডলারে নেমে আসে, যা প্রায় ৭ দশমিক ২ শতাংশ হ্রাস নির্দেশ করে। এমনকি দিনের একটি সময়ে দর ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৬ ডলারে পৌঁছায়। একইভাবে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দামও কমে ৯০ দশমিক ৫৫ ডলারে দাঁড়ায়, যা প্রায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ হ্রাস। সর্বনিম্ন অবস্থানে এটি ৮৫ দশমিক ২৮ ডলার পর্যন্ত নেমে গিয়েছিল।

এই মূল্যপতনের পেছনে মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ স্থগিত করার সিদ্ধান্তকে। ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, তেহরান যদি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সব জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত না করে, তবে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করা হবে। এ জন্য আগামীকাল মঙ্গলবার সকাল প্রায় ৬ টা (বাংলাদেশ সময়) পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল।

তার এই মন্তব্যের পর ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস পাল্টা হুমকি দেয়। তারা জানায়, ট্রাম্প যদি ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করার হুমকি বাস্তবায়ন করেন, তবে তারা ইসরায়েলের বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী স্থাপনাগুলোতে হামলা চালাবে।

তবে একই সময়ে বাজারে বিপরীতধর্মী প্রবণতাও দেখা গেছে। সিএনবিসির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, গতকাল সকালের লেনদেনে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কিছুটা বেড়ে ১১৩ দশমিক ৩২ ডলারে উঠেছিল। এছাড়া ডব্লিউটিআই ক্রুডও প্রায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০১ দশমিক ০১ ডলারে পৌঁছায়। অর্থাৎ, বাজারে একদিকে যেমন তীব্র পতন, অন্যদিকে তেমনই হঠাৎ উত্থানের প্রবণতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই অস্থিরতার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো হরমুজ প্রণালি। বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে হয়। সম্প্রতি সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে, যার প্রভাব সরাসরি তেলের সরবরাহ ও দামের ওপর পড়েছে।

গোল্ডম্যান স্যাকসও তাদের পূর্বাভাসে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, মার্চ ও এপ্রিলে ব্রেন্ট ক্রুডের গড় মূল্য ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১০ ডলারের কাছাকাছি থাকতে পারে, যা আগের পূর্বাভাসের তুলনায় অনেক বেশি। একইভাবে ডব্লিউটিআই তেলের দামও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করে বলেছেন, যদি হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় ধরে সীমিতভাবে চালু থাকে, তাহলে তেলের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে। এমনকি ২০০৮ সালের সর্বোচ্চ দামের রেকর্ডও অতিক্রম করার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিড়োল পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুতর বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান সংকট ১৯৭০-এর দশকের তেলসংকট কিংবা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবের চেয়েও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতোমধ্যে আইইএর সদস্যদেশগুলো কৌশলগত মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে।

বর্তমানে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার পুরোপুরি নির্ভর করছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সামরিক উত্তেজনা এবং কূটনৈতিক সমাধানের ওপর। তাই আগামী কয়েক দিন পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেটিই নির্ধারণ করবে তেলের দামের ভবিষ্যৎ গতিপথ।


সম্পর্কিত নিউজ