মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফেরত গেলো বৃহত্তম মার্কিন রণতরি জেরাল্ড আর. ফোর্ড

মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফেরত গেলো বৃহত্তম মার্কিন রণতরি জেরাল্ড আর. ফোর্ড
ছবির ক্যাপশান, মার্কিন রণতরি জেরাল্ড আর. ফোর্ড | ছবি : এএফপি

ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি জোরদারের অংশ হিসেবে বিশ্বের বৃহত্তম যুদ্ধজাহাজ ও বিমানবাহী রণতরীগুলোর একটি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডকে মোতায়েন করা হয়েছিল। জাহাজটি গ্রিসের সৌদা উপসাগর থেকে পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যসংলগ্ন জলসীমায় পৌঁছেও গিয়েছিল।

কিন্তু যুদ্ধের এই স্পর্শকাতর মুহূর্তে জাহাজটির ভেতরে অগ্নিকাণ্ড, রক্ষণাবেক্ষণ-সংক্রান্ত সমস্যা এবং দীর্ঘ টহলের চাপ মিলিয়ে তার কার্যকর ভূমিকা সাময়িকভাবে থেমে গেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, জাহাজটি সাময়িকভাবে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের সৌদা বে ঘাঁটিতে যাচ্ছে, যেখানে মেরামত, মূল্যায়ন ও রসদ পুনরায় ভরার কাজ হবে।

যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ফোর্ডের মোতায়েন

মার্কিন-ইরান উত্তেজনা তীব্র হওয়ার আগেই ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুতে সংলাপ শুরু হয়েছিল। তবে সেই কূটনৈতিক যোগাযোগের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অতিরিক্ত সামরিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে একাধিক মার্কিন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। রয়টার্সের ১০ মার্চের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড সৌদা ঘাঁটিতে থামার পর আরও পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়, সঙ্গে ছিল ক্ষেপণাস্ত্রবাহী এসকর্ট জাহাজ। একই সময় ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনও ওই অঞ্চলে সক্রিয় ছিল।

লন্ড্রি বিভাগে আগুন, শুরু সংকটের

জাহাজটির বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে ১২ মার্চের অগ্নিকাণ্ড। রয়টার্স জানায়, ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডের ভেতরে একটি নন-কমব্যাট বা অযুদ্ধজনিত আগুন লাগে, যাতে দুই মার্কিন নাবিক আহত হন। পরে ১৭ মার্চের আরেক প্রতিবেদনে রয়টার্স জানায়, আগুনটি মূল লন্ড্রি অংশে লাগে এবং এতে প্রায় ১০০টি শয্যা বা স্লিপিং বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই ঘটনায় ধোঁয়াজনিত সমস্যায় বিপুলসংখ্যক নাবিক ক্ষতিগ্রস্ত হন, যদিও জাহাজের প্রপালশন সিস্টেম অক্ষত ছিল।

এএফপি-উদ্ধৃত আরব নিউজের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, ১২ মার্চের ওই লন্ড্রি রুমের আগুনে দুই নাবিক আহত হন এবং পরে জাহাজটি ক্রিটের ঘাঁটিতে ফিরে যায়। ফলে স্পষ্ট হচ্ছে, সামরিকভাবে তাৎক্ষণিকভাবে অক্ষম না হলেও জাহাজটিকে যুদ্ধ-অঞ্চল থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হালকা কোনো ব্যাপার ছিল না।

শুধু আগুন নয়, ছিল ভেতরের আরও জটিলতা

অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে আরও কিছু রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যার কথাও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিজনেস ইনসাইডার জানায়, আগুনের পাশাপাশি জাহাজটিতে স্যানিটেশন ও পাইপলাইন-সংক্রান্ত জটিলতা দেখা দেয়, যা দীর্ঘ টহলে থাকা ক্রুদের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তোলে। দ্য গার্ডিয়ানও বলেছে, লন্ড্রি অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে স্যুয়ারেজ বা টয়লেট-ব্যবস্থার সমস্যাও জাহাজটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। এসব সমস্যা মাঝসাগরে পূর্ণাঙ্গভাবে সমাধান করা সম্ভব না হওয়ায় ডকে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বাড়ে।

দীর্ঘ ৯ মাসের টহলও বড় কারণ

ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডের এই প্রত্যাহার শুধু আগুনের কারণে নয়, বরং দীর্ঘ টহলও বড় একটি প্রেক্ষাপট। বিজনেস ইনসাইডার জানায়, জাহাজটি ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে বের হয়েছিল এবং প্রায় ৯ মাস সমুদ্রে অবস্থান করেছে। এই সময়ের মধ্যে এটি ক্যারিবীয় অঞ্চলে মার্কিন অভিযানে অংশ নেয়, পরে মধ্যপ্রাচ্যে এসে ইরান-সম্পর্কিত যুদ্ধ অভিযানে যুক্ত হয়। এএফপি-উদ্ধৃত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানা দীর্ঘ মোতায়েনের কারণে জাহাজটির ক্রু ও সরঞ্জাম-দুই দিকেই চাপ তৈরি হয়েছিল।

সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, একটি বিমানবাহী রণতরী কেবল যুদ্ধবিমান বহনকারী ভাসমান ঘাঁটি নয়; এটি এক বিশাল চলমান নগরীর মতো। তাই জ্বালানি, রসদ, বিশ্রাম, আবাসন, স্যানিটেশন, চিকিৎসা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা-সব কিছু একসঙ্গে সচল রাখতে হয়। দীর্ঘমেয়াদি টহলে এসবের যেকোনো একটিতে গুরুতর ব্যত্যয় পুরো কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে ফোর্ডের ক্রিটে ফেরা কৌশলগত পশ্চাদপসরণ হলেও, তা পুরোপুরি অস্বাভাবিক নয়-বরং জরুরি পুনর্গঠনের পদক্ষেপ। এটি একটি বিশ্লেষণভিত্তিক মূল্যায়ন, যা সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের বর্ণনা থেকে অনুমান করা যায়।

যুদ্ধক্ষেত্রে এর প্রভাব কী

ফোর্ডের সাময়িক সরে যাওয়া মানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি পুরোপুরি কমে যাওয়া নয়। রয়টার্স বলছে, ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন এখনো ওই অঞ্চলে সক্রিয় রয়েছে। তবে ফোর্ডের মতো বৃহৎ ক্যারিয়ার সাময়িকভাবে বাইরে চলে যাওয়ায় আকাশ অভিযান, টহল, বিমান মোতায়েন এবং প্রতিরোধ সক্ষমতায় চাপ পড়তে পারে। বিজনেস ইনসাইডারও উল্লেখ করেছে, ফোর্ডের অনুপস্থিতিতে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-উপস্থিতির ভারসাম্যে সাময়িক পরিবর্তন আসছে।

সামনে কী ঘটতে পারে তার সম্ভাবনা

বর্তমানে ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডের জন্য তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হলো মেরামত, অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন এবং ক্রুদের পুনর্গঠন। সৌদা বে ঘাঁটিতে এই কাজ শেষ হওয়ার পর জাহাজটি আবার যুদ্ধ-অঞ্চলে ফিরবে কি না, নাকি আরও বড় রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অন্য কোথাও যাবে-সেটি এখনও স্পষ্ট নয়। তবে এতটুকু পরিষ্কার যে, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক যন্ত্রও মাঠপর্যায়ে আগুন, ক্লান্তি এবং যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতার বাইরে নয়। আর ইরান যুদ্ধের মতো উত্তপ্ত প্রেক্ষাপটে এই বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনাতেও নতুন হিসাব যোগ করছে।

সূত্রঃ রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ