{{ news.section.title }}
জ্বালানি স্থাপনায় হামলা হলে মার্কিন বাহিনীকে অচল করে দেওয়া হবে
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে এবার আরও কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি। মঙ্গলবার ইরানের প্রভাবশালী রাজনীতিক ও আইআরজিসির সাবেক শীর্ষ কমান্ডার মহসেন রেজায়ি বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপর হামলা চালানো হলে মার্কিন বাহিনীকে “অচল” করে দেওয়া হবে এবং আরব উপসাগরে তাদের জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হবে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই অবস্থান প্রকাশ করেছে। একই সময়ে তেহরান দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দেশের জ্বালানি অবকাঠামোর কয়েকটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রেজায়ির হুঁশিয়ারি কী বলছে
ইরানের এক্সপেডিয়েন্সি ডিসার্নমেন্ট কাউন্সিলের সদস্য মহসেন রেজায়ি শুধু পাল্টা হামলার হুমকিই দেননি, তিনি আরও বলেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান সংকট থেকে ওয়াশিংটনকে বের হয়ে আসতে হলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদিও রয়টার্সের রিপোর্টে রেজায়ির পূর্ণ উদ্ধৃতি নেই, তবে একই ধাঁচের কড়া অবস্থান আগের দিন আইআরজিসির আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতেও দেখা যায়। সেখানে বলা হয়েছিল, ইরানের বিদ্যুৎখাতে হামলা হলে “If you hit electricity, we hit electricity.” অর্থাৎ বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় আঘাত এলে পাল্টা একই ধরনের জবাব দেওয়া হবে।
হুমকির পটভূমি: ট্রাম্পের ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম
এই নতুন হুঁশিয়ারির পেছনে বড় কারণ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আল্টিমেটাম। শনিবার ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, ইরান যদি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে না দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ধ্বংস করে দেবে। রয়টার্সের ২২ মার্চের রিপোর্টে বলা হয়, এ হুমকি ছিল যুদ্ধের মধ্যে একটি বড় কৌশলগত উত্তেজনা, কারণ হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর জবাবে ইরান আগে জানিয়েছিল, তাদের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোও নিরাপদ থাকবে না।
কোন অবকাঠামোতে হামলার দাবি করছে ইরান
ইরানি গণমাধ্যমের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইসফাহানের কাভেহ স্ট্রিটে অবস্থিত গ্যাস প্রশাসনিক ভবন এবং একটি গ্যাস চাপ নিয়ন্ত্রণ স্টেশন লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। একইসঙ্গে খুজেস্তান প্রদেশের খোররামশাহর বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্যাস পাইপলাইনেও হামলার কথা বলা হয়েছে। যদিও এসব নির্দিষ্ট স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে স্বাধীন আন্তর্জাতিক যাচাই এখনো সীমিত, রয়টার্স নিশ্চিতভাবে জানিয়েছে যে ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্র ও আসালুয়েহ অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনাগুলো সাম্প্রতিক হামলায় লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল। ইরান ওই হামলাগুলোকে সংঘাতের “new stage in the war” হিসেবে বর্ণনা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নরম হয়েছিল, তারপরও হামলার অভিযোগ
ঘটনাপ্রবাহকে আরও জটিল করেছে ট্রাম্পের অবস্থানের হঠাৎ পরিবর্তন। সোমবার রয়টার্স জানায়, ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে ইরানের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য সমঝোতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে এবং সেই কারণে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরিকল্পিত হামলা আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। কিন্তু ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে সেই আলোচনার দাবি অস্বীকার করে। এর কয়েক ঘণ্টা পরই ইরানি পক্ষ দাবি করে যে জ্বালানি স্থাপনায় আবার হামলা হয়েছে। এই সাংঘর্ষিক তথ্য বাজার, কূটনীতি এবং নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে।
উপসাগরজুড়ে বড় সংকটের শঙ্কা
এই হুমকি কেবল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পুরো আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর পড়তে পারে। রয়টার্স জানিয়েছে, ইরান আগেই বলেছিল যে যদি তাদের বিদ্যুৎ বা জ্বালানি ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জ্বালানি অবকাঠামো এবং মার্কিন ঘাঁটিকে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী স্থাপনাগুলোও বৈধ লক্ষ্য হবে। আরও আগের এক বিবৃতিতে তেহরান উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের পানি শোধনাগার ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার দিকেও ইঙ্গিত করেছিল, যদিও পরে সেই বক্তব্য কিছুটা নরম করে। তবু বিশ্লেষকেরা বলছেন, এমন পাল্টাপাল্টি হুমকি বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু সামরিক সংঘাত নয়, বরং নাগরিক জীবনের মৌলিক অবকাঠামোকেও বিপন্ন করবে।
বাজার ও জ্বালানি নিরাপত্তায় প্রভাব
এই পরিস্থিতির প্রভাব ইতোমধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে পড়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে সাধারণ সময়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও এলএনজি পরিবাহিত হয়। এই রুটে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় তেলের বাজারে তীব্র ওঠানামা শুরু হয়েছে। রয়টার্স জানায়, একদিকে ট্রাম্পের হামলা স্থগিতের ঘোষণায় তেলের দাম সাময়িকভাবে কমে যায়, অন্যদিকে ইরানের পক্ষ থেকে নতুন অস্বীকৃতি ও পাল্টা হুমকি এলে আবার সরবরাহঝুঁকির ভয় ফিরে আসে। ফলে বাজার এখন রাজনৈতিক বক্তব্যের ওপর অস্বাভাবিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।