যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলকে দেওয়া ইরানের শর্তগুলো কী কী?

যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলকে দেওয়া ইরানের শর্তগুলো কী কী?
ছবির ক্যাপশান, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মোজতবা খামেনি

মধ্যপ্রাচ্যে টানা কয়েক সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্যে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। তবে সামনে যে চিত্র ফুটে উঠছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে-যুদ্ধ থামানোর আলোচনা শুরু হলেও দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে ব্যবধান এখনো গভীর।

একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে একটি বিস্তৃত প্রস্তাব দিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর এসেছে, অন্যদিকে তেহরানও যুদ্ধ বন্ধে কয়েকটি কঠোর শর্ত সামনে এনেছে। ফলে আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ না হলেও দ্রুত সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়ে গেছে।

পরোক্ষ আলোচনার ইঙ্গিত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বলেন, ওয়াশিংটন বেশ কিছুদিন ধরে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করছে এবং “এবার তারা (ইরান) বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে”। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর ব্যাপারে আগ্রহী এবং তিনি মনে করছেন সামরিক চাপকে কূটনৈতিক অগ্রগতিতে রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আমরা নিশ্চিত করব যে ইরান যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে।”

তবে এই জায়গাতেই তৈরি হয়েছে বড় দ্বন্দ্ব। কারণ, ইরান প্রকাশ্যে কোনো সরাসরি আলোচনা হওয়ার কথা অস্বীকার করেছে। ওয়াশিংটন পোস্ট ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরান আনুষ্ঠানিক বা প্রত্যক্ষ সংলাপের কথা মানতে চাইছে না, তারা কেবল মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ের বার্তা আদান-প্রদানের কথা স্বীকার করছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র যেখানে “ফলপ্রসূ আলোচনা”র আভাস দিচ্ছে, ইরান সেখানে আরও সতর্ক ও কঠোর ভাষা ব্যবহার করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা প্রস্তাব কী নিয়ে

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে উঠে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে একটি ১৫ দফার যুদ্ধবিরতি-সংক্রান্ত প্রস্তাব পাঠিয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের লাইভ আপডেট এবং রয়টার্সের প্রতিবেদনের মিলিত তথ্য অনুযায়ী, এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য তিনটি-যুদ্ধ থামানো, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সীমিত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের সামরিক-রাজনৈতিক প্রভাব পুনর্বিন্যাস করা। পাকিস্তান এই বার্তা আদান-প্রদানে একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা পালন করছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, আর তুরস্ক ও মিসরও সমঝোতার প্রক্রিয়ায় আগ্রহ দেখিয়েছে।

এই প্রস্তাবে ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনা-নাতানজ, ইসফাহান ও ফোরদো-বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ, মজুত সমৃদ্ধ পদার্থ আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তত্ত্বাবধানে দেওয়ার ব্যবস্থা, পূর্ণাঙ্গ পরিদর্শন-অধিকার, এক মাসের যুদ্ধবিরতি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে নিয়ন্ত্রণ এবং প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন বন্ধ করার মতো শর্তও আলোচনায় রয়েছে। এর বিনিময়ে পারমাণবিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং বেসামরিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে কিছু সহায়তার প্রস্তাবও আছে বলে জানা গেছে।

ইরানের পাল্টা ৫ শর্ত

ইরানের অবস্থান আরও কঠিন বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। রয়টার্স জানায়, তেহরান আলোচনা এগোনোর জন্য বড় ধরনের ছাড় চায় এবং তাদের মূল শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে-যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসান, ভবিষ্যতে আর হামলা না হওয়ার নিশ্চয়তা, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণে ইরানের প্রভাব বজায় থাকা। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান তার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ মানতে রাজি নয়।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২-এর তথ্য উদ্ধৃত করে টাইমস অব ইসরায়েল জানায়, ইরান যুদ্ধ বন্ধে পাঁচটি আনুষ্ঠানিক দাবি তুলেছে। সেগুলো হলো:
১. যুদ্ধ যেন আর কখনো শুরু না হয়, তার শক্তিশালী নিশ্চয়তা।
২. মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করা।
৩. যুদ্ধের কারণে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ ক্ষতিপূরণ।
৪. হরমুজ প্রণালির ওপর এমন একটি নতুন আইনি ব্যবস্থা, যাতে কার্যত ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে।
৫. ইরানের বিরুদ্ধে “বিদ্বেষপূর্ণ সংবাদমাধ্যম”-এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ইরানের হাতে তুলে দেওয়া বা তাদের বিচারের আওতায় আনা।

মিডল ইস্ট আই অতিরিক্ত আরেকটি শর্তের কথা বলেছে-মধ্যপ্রাচ্যের সব যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে, যার মধ্যে ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে চলমান লড়াইও অন্তর্ভুক্ত। এ দাবি গ্রহণ করা হলে শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র নয়, লেবানন, ইরাক, ইয়েমেন ও সিরিয়াকেও আলোচনার আওতায় আনতে হবে। এই জায়গাটিই আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলছে।

পাকিস্তানের মধ্যস্থতার ভূমিকা

এই আলোচনায় পাকিস্তানের নাম বারবার উঠে আসছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার আয়োজক হতে আগ্রহী। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও পাকিস্তানের এই আগ্রহকে সামনে এনেছেন। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামাবাদকে সম্ভাব্য আলোচনার স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যদিও এখনো আনুষ্ঠানিক বৈঠকের ঘোষণা আসেনি।

চুক্তি কি হবে

বর্তমান বাস্তবতায় চুক্তি সহজ হবে-এমন ইঙ্গিত খুব কম। রয়টার্সের মতে, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা নিজেরাও মনে করছেন, ট্রাম্প চুক্তি চান বটে, কিন্তু ইরান যে শর্তে রাজি হতে পারে আর যুক্তরাষ্ট্র যে শর্ত চাপাচ্ছে-এই দুইয়ের মধ্যে বড় ফাঁক রয়ে গেছে। বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, প্রক্সি গোষ্ঠী এবং হরমুজ প্রণালির প্রশ্নে দুই পক্ষের অবস্থান প্রায় বিপরীতমুখী।


সম্পর্কিত নিউজ