হরমুজে ৬ দেশের জাহাজে হামলা নয়, বিশেষ নিরাপত্তা দেবে ইরান

হরমুজে ৬ দেশের জাহাজে হামলা নয়, বিশেষ নিরাপত্তা দেবে ইরান
ছবির ক্যাপশান, হরমুজে ৬ দেশের জাহাজে হামলা নয়, বিশেষ নিরাপত্তা দেবে ইরান

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থার মধ্যেও আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন বার্তা দিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, বাংলাদেশসহ ছয়টি দেশের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি। বাকি পাঁচটি দেশ হলো ভারত, চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান ও ইরাক।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরাগচি বলেন, হরমুজ পুরোপুরি বন্ধ নয়, বরং সেখানে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, “হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি, সেখানে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। হরমুজে নিজেদের বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচলের জন্য ইতোমধ্যে অনেক রাষ্ট্র আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং অনুরোধ জানিয়েছে। তাদের মধ্যে অনেক দেশকে আমরা মিত্র বলে বিবেচনা করি।”

ছয় দেশের জন্য ‘নিরাপত্তা প্যাসেজ’

আরাগচি রয়টার্সকে আরও বলেন, “আমি যদ্দুর জানি, হরমুজ প্রণালিতে ৬টি দেশের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা না করা হবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইআরজিসি (ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস)। এই দেশগুলো হলো চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান, ইরাক, ভারত এবং বাংলাদেশ। এসব দেশের সরকারের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে এবং তারা আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে সম্মতিও জানিয়েছে। এই ছয় দেশের বাণিজ্যিক জাহাজগুলো সবসময়, এমনকি যুদ্ধের পরও হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা প্যাসেজ পাবে।” এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি দক্ষিণ এশিয়া ও এশীয় আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য বড় গুরুত্ব পেয়েছে, কারণ হরমুজ দিয়েই বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও বড় অংশের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়।

হরমুজ কি সত্যিই বন্ধ?

ইরান একাধিকবার বলেছে, হরমুজ পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি। তবে বাস্তবে জাহাজ চলাচল কঠোরভাবে সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। রয়টার্সের ১২ মার্চের প্রতিবেদনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইয়ের বরাতে বলা হয়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করতে হলে বিদেশি জাহাজকে ইরানের নৌবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। এর মানে, মিত্র বা ‘অশত্রু’ দেশগুলোর জাহাজও পুরোপুরি স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারবে না, তাদের আগে অনুমতি নিতে হবে এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া মেনে প্রবেশ করতে হবে।

এই অবস্থানের সঙ্গে আপনার দেওয়া তথ্যেরও মিল রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মিত্রদেশগুলোর জাহাজে হামলা না করলেও হরমুজে এসব দেশের জাহাজ চলাচলে কিছু নিয়ম জারি করেছে ইরান, আর প্রধান নিয়ম হলো-প্রণালিতে ঢোকার আগে অবশ্যই ইরানের সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। রয়টার্সের তথ্যও একই বাস্তবতাকে সমর্থন করছে।

কেন হরমুজ এত গুরুত্বপূর্ণ

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক জ্বালানি রুটগুলোর একটি। রয়টার্সের একাধিক ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিদিন গড়ে ২ কোটির বেশি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল, কনডেনসেট ও জ্বালানি এই পথ দিয়ে যায়, যা বৈশ্বিক তেল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের সমান। একই সঙ্গে কাতারের বিশাল অংশের এলএনজি রপ্তানিও এই পথনির্ভর। ফলে হরমুজে সামান্য বিঘ্নও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, পরিবহন ব্যয়, বীমা খরচ এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তায় বড় প্রভাব ফেলে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজে ইরানের অবরোধমূলক অবস্থান জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা দিয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, এই সংঘাতের মধ্যে ট্যাংকার চলাচল প্রায় থেমে যায়, জাহাজে হামলার ঘটনা বাড়ে এবং বহু বন্দর ও রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

‘শত্রুভাবাপন্ন’ নয় এমন জাহাজের জন্য আলাদা নীতি

ইরান এর আগেও ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, হরমুজে তাদের কড়াকড়ি মূলত যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য হবে। রয়টার্সের ১৬ মার্চের এক এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ভারত নিরাপদ চলাচলের জন্য তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, কারণ অন্তত ২২টি ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজ তখন উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকা ছিল। ওই প্রতিবেদন থেকে বোঝা যায়, ইরান বাছাই করে কিছু দেশের সঙ্গে আলাদা সমন্বয়ের পথ রাখছে।

অর্থাৎ, এখন যে ছয় দেশের তালিকা সামনে এসেছে, সেটি একেবারে হঠাৎ নয়, বরং যুদ্ধের শুরু থেকেই ‘বন্ধু’ ও ‘শত্রু’-এই শ্রেণিভিত্তিক একটি নীতির ইঙ্গিত তেহরান দিয়ে আসছিল। তবে বাংলাদেশের নাম সরাসরি তালিকায় আসা তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দিক থেকে উপসাগরীয় রুটের ওপর পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল।

টোল আরোপের নতুন পরিকল্পনা

হরমুজকে শুধু নিয়ন্ত্রণ নয়, আর্থিক সম্পদ হিসেবেও ব্যবহারের চিন্তা করছে তেহরান। রয়টার্সের ১৯ মার্চের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের পার্লামেন্টে এমন একটি আইন প্রণয়নের চিন্তা চলছে, যার মাধ্যমে হরমুজ দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজের ওপর ট্রানজিট ফি বা টোল আরোপ করা হবে। ফার্স-উদ্ধৃত ওই আলোচনায় বলা হয়, ইরানের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি ও তদারকিকে আইনি স্বীকৃতি দিয়ে একই সঙ্গে এটি থেকে রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থাও করা হতে পারে। অর্থাৎ হরমুজকে কেবল সামরিক চাপের হাতিয়ার নয়, ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর অংশ হিসেবেও ভাবছে তেহরান।

বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ কী

বাংলাদেশের নাম এই তালিকায় থাকা তাৎক্ষণিকভাবে দুটি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। প্রথমত, বাংলাদেশের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য অন্তত কাগজে-কলমে একটি ‘সেফ প্যাসেজ’ বা নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, সেই নিশ্চয়তা শর্তসাপেক্ষ-অর্থাৎ ইরানের সঙ্গে সমন্বয় ও অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ চলতে পারবে না। ফলে এটি পুরোপুরি অবাধ চলাচল নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তা। ভবিষ্যতে টোল আইন কার্যকর হলে বাংলাদেশসহ এই ছয় দেশের জাহাজকেও সেই নতুন ব্যবস্থার আওতায় পড়তে হতে পারে-যদিও এখনো সেই আইন চূড়ান্ত হয়নি।

সূত্রঃ রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ