কৃষ্ণসাগরে তুরস্কের তেলবাহী ট্যাংকারে ড্রোন হামলা

কৃষ্ণসাগরে তুরস্কের তেলবাহী ট্যাংকারে ড্রোন হামলা
ছবির ক্যাপশান, কৃষ্ণসাগরে তুরস্কের তেলবাহী ট্যাংকারে ড্রোন হামলা

কৃষ্ণসাগরে তুরস্ক-সংশ্লিষ্ট একটি অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনার পর সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের যাচাইকৃত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার নভোরোসিস্ক বন্দরের দিকে যাওয়া Elbus নামের একটি তেলবাহী জাহাজ ৮ জানুয়ারি কৃষ্ণসাগরে হামলার শিকার হয়। হামলার পর জাহাজটি তুরস্কের একটি নোঙর এলাকায় সরে যায়। ঘটনায় কোনো হতাহত বা দূষণের খবর পাওয়া যায়নি, তবে এটি কৃষ্ণসাগরজুড়ে বাণিজ্যিক নৌচলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।

কী ঘটেছিল

রয়টার্সের ৮ জানুয়ারির প্রতিবেদনে বলা হয়, জাহাজটিতে হামলার পর সেটি দিক পরিবর্তন করে তুরস্কের উপকূলের দিকে যায় এবং নিরাপদ অবস্থানে নোঙর করে। লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স এবং একটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, জাহাজটি “attacked” হয়েছে এবং পরে তুরস্কের দিকে সরে গেছে। রয়টার্স আরও জানায়, এতে কোনো আহতের ঘটনা ঘটেনি এবং জাহাজ থেকে তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটেনি।

আপনার দেওয়া বর্ণনায় হামলার সময় জাহাজে ২৭ জন তুর্কি নাবিক ছিলেন এবং জাহাজটির মালিক ছিল তুরস্কের প্রতিষ্ঠান বেসিকতাস-এ ধরনের দাবি উল্লেখ আছে। আমি যে আন্তর্জাতিক উৎসগুলো যাচাই করেছি, সেগুলোতে এই নির্দিষ্ট তথ্যগুলোর পূর্ণ সমর্থন পাইনি। তবে ডিসেম্বর ২০২৫-এ রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বেসিকতাস শিপিং একটি তেলবাহী জাহাজের তুর্কি মালিক, যেটি আগের আরেক ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। অর্থাৎ কোম্পানিটির নাম এ ধরনের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ঘটনার প্রেক্ষাপটে আগে এসেছে, কিন্তু আপনার পাঠানো এই নির্দিষ্ট হামলার ক্ষেত্রে “Beşiktaş-owned, Sierra Leone-flagged” পরিচয়টি আমি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারিনি।

ড্রোন, না কি চালকবিহীন নৌযান

আপনার পাঠানো বর্ণনায় তুরস্কের পরিবহনমন্ত্রী আবদুল কাদির উরালুগ্লুর উদ্ধৃতিতে বলা হয়েছে, হামলাটি আকাশ থেকে ড্রোনে নয়, বরং একটি চালকবিহীন নৌযান বা unmanned surface vehicle দিয়ে চালানো হয়ে থাকতে পারে। এ ধরনের কৌশল কৃষ্ণসাগরে নতুন নয়। নভেম্বর ২০২৫-এ রয়টার্স জানিয়েছিল, তুরস্কের উপকূলের কাছে রাশিয়ার “shadow fleet”-এর সঙ্গে যুক্ত একটি ট্যাংকারে unmanned vessel দিয়ে হামলার অভিযোগ উঠেছিল। সে সময় তুরস্কও বলেছিল, হামলায় সম্ভবত মানববিহীন ভাসমান যান ব্যবহৃত হয়েছে।

আরব নিউজের এক প্রতিবেদনে একই ঘটনার বর্ণনায় বলা হয়, ব্ল্যাক সি উপকূল থেকে প্রায় ৩৫ নটিক্যাল মাইল দূরে একটি ট্যাংকার “unmanned maritime vehicles” দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল। এর মানে, সমুদ্রভিত্তিক ড্রোন বা নৌ-ড্রোন ব্যবহার এখন কৃষ্ণসাগরের বাণিজ্যিক নৌচলাচলের জন্য বাস্তব ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।

এই ঘটনার তাৎপর্য

কৃষ্ণসাগর শুধু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সামরিক থিয়েটার নয়; এটি জ্বালানি, শস্য এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ। ইয়েনি শাফাক ও রয়টার্স-উদ্ধৃত বিবরণে বলা হয়েছে, এই রুট দিয়ে জ্বালানি তেল ও শস্যবাহী জাহাজ নিয়মিত চলাচল করে। ফলে একটি ট্যাংকারে হামলা শুধু একক জাহাজের ক্ষতির প্রশ্ন নয়, বরং বৃহত্তর সামুদ্রিক আস্থা, বীমা ব্যয়, নৌনিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য প্রবাহের ওপরও প্রভাব ফেলে। ডিসেম্বর ২০২৫-এ রয়টার্স সতর্ক করেছিল যে, কৃষ্ণসাগরে ধারাবাহিক জাহাজ হামলা বীমা খরচ বাড়াচ্ছে এবং তুরস্ক ন্যাটোর সঙ্গেও এই নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে।

ভৌগোলিক ঝুঁকি বাড়ছে

আপনার পাঠানো লেখায় বলা হয়েছে, বসফরাস প্রণালি থেকে ৩০ কিলোমিটারের কম দূরত্বে হামলার ঘটনা ঘটেছে। আমি এই নির্দিষ্ট দূরত্ব-সংক্রান্ত তথ্য আন্তর্জাতিক প্রাথমিক সূত্রে নিশ্চিত করতে পারিনি। তবে রয়টার্সের ডিসেম্বর ২০২৫-এর আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, একটি ট্যাংকার তুরস্কের উপকূল থেকে প্রায় ৮০ মাইল দূরে হামলার শিকার হয়। অর্থাৎ, হামলাগুলো তুর্কি নৌপথের জন্য বাস্তব উদ্বেগ হয়ে উঠছে।

এ অবস্থায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান আগেই কৃষ্ণসাগরের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলাকে “unacceptable” বলে আখ্যা দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, এসব ঘটনা “the safety of navigation in the Black Sea” বা কৃষ্ণসাগরের নৌ-নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সঙ্গে কি সরাসরি সম্পর্ক আছে

আপনার দেওয়া কপিতে এই হামলাকে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের বিস্তৃত প্রভাবের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু আমি যে আন্তর্জাতিক সূত্রগুলো যাচাই করেছি, সেগুলোতে এই কৃষ্ণসাগর হামলাকে সরাসরি ইরান-সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত করে নিশ্চিত করা হয়নি। বরং বেশিরভাগ রিপোর্টে কৃষ্ণসাগরের জাহাজ হামলাগুলোকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, shadow fleet, এবং সামুদ্রিক ড্রোন হামলার বৃহত্তর ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে। এই কারণে সরাসরি কারণ-সম্পর্ক স্থাপন করা এখনই নিরাপদ নয়। এটি বলা বেশি নির্ভুল হবে যে, মধ্যপ্রাচ্য ও কৃষ্ণসাগর-দুই অঞ্চলেই সামুদ্রিক নিরাপত্তা একসঙ্গে দুর্বল হচ্ছে, আর এর ফলে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য আরও চাপের মুখে পড়ছে।

সূত্রঃ রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ