{{ news.section.title }}
মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফেরাতে ৫ দফা শান্তি প্রস্তাব
ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ ও উপসাগরীয় অস্থিরতার মধ্যে চীন ও পাকিস্তান যৌথভাবে একটি পাঁচ দফা শান্তি উদ্যোগ ঘোষণা করেছে। মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দারের বৈঠকের পর এই প্রস্তাব সামনে আসে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সিনহুয়ার প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এর লক্ষ্য উপসাগরীয় অঞ্চল ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।
চীন–পাকিস্তানের ঘোষিত পাঁচ দফা শান্তি প্রস্তাব
যুদ্ধ থামানো এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বেইজিং ও ইসলামাবাদ যৌথভাবে পাঁচটি মূল প্রস্তাব সামনে এনেছে। সেগুলো হলো-
১. অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি
সব ধরনের সামরিক অভিযান, হামলা ও প্রতিশোধমূলক তৎপরতা দ্রুত বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে সংঘাত যেন নতুন কোনো অঞ্চলে ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
২. দ্রুত কূটনৈতিক সংলাপ শুরু
যুদ্ধরত পক্ষগুলোকে যত দ্রুত সম্ভব আলোচনার টেবিলে ফিরতে হবে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতাকে সম্মান জানিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।
৩. বেসামরিক মানুষ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সুরক্ষা
সাধারণ নাগরিকদের জীবনরক্ষা এবং অসামরিক অবকাঠামোকে হামলার বাইরে রাখতে হবে। বিশেষ করে বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি স্থাপনা, পানি শোধনাগার ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো সংবেদনশীল স্থাপনায় হামলা বন্ধের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
৪. হরমুজ প্রণালিসহ নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলো নিরাপদ রাখতে হবে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দ্রুত স্বাভাবিক নৌচলাচল পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানানো হয়েছে।
৫. জাতিসংঘ সনদভিত্তিক শান্তি কাঠামো
আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের আলোকে একটি বিস্তৃত ও টেকসই শান্তি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠায় বহুপাক্ষিক কূটনীতির ভূমিকা আরও জোরদার করার কথা বলা হয়েছে।
এই উদ্যোগের পেছনে পাকিস্তানের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থও রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। ইসলামাবাদ সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে নিজেকে সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরতে সক্রিয় হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিসরের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে পাকিস্তান চাইছে, সংঘাত নিরসনের আলোচনায় নিজেদের একটি কেন্দ্রীয় কূটনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে। একই সঙ্গে দেশটি হরমুজ প্রণালি-নির্ভর জ্বালানি সরবরাহ, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত, বেলুচিস্তান অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক ভারসাম্য নিয়েও উদ্বিগ্ন।
চীনের জন্যও এই প্রস্তাব গুরুত্বপূর্ণ। বেইজিং এতদিন তুলনামূলকভাবে সতর্ক অবস্থানে থাকলেও ইরানি তেলের বড় ক্রেতা হিসেবে উপসাগরীয় স্থিতিশীলতা তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথভাবে এই পাঁচ দফা উদ্যোগ ঘোষণা করে চীন একদিকে যুদ্ধবিরতির পক্ষে অবস্থান জানাল, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে আরও দৃশ্যমান কূটনৈতিক ভূমিকার ইঙ্গিতও দিল।
তবে এই প্রস্তাব তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধ থামাতে পারবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ সংঘাতের মূল পক্ষগুলো-বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরায়েল-এখনো নিজেদের অবস্থান থেকে খুব বেশি সরে আসেনি। তারপরও চীন–পাকিস্তানের এই যৌথ উদ্যোগ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে: যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, ক্ষতি তত বাড়বে; আর সেই বাস্তবতায় এখন সবচেয়ে জরুরি হলো যুদ্ধবিরতি, আলোচনায় ফেরা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ।