সোমবার থেকে ইরানের সব বন্দর অবরোধের হুমকি মার্কিন সামরিক বাহিনীর

সোমবার থেকে ইরানের সব বন্দর অবরোধের হুমকি মার্কিন সামরিক বাহিনীর
ছবির ক্যাপশান, সোমবার থেকে ইরানের সব বন্দর অবরোধের হুমকি মার্কিন সামরিক বাহিনীর

ইরানের বন্দরগুলো অবরোধে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, তবে হরমুজ প্রণালিতে অ-ইরানি গন্তব্যের জাহাজ চলাচলে বাধা নয়: সেন্টকম; সামরিক জাহাজ এগোলে ‘কঠোর জবাব’ দেবে তেহরান

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ঘোষণা দিয়েছে, সোমবার থেকে তারা ইরানের সব বন্দর কার্যত অবরোধের আওতায় আনবে। পাকিস্তানে টানা শান্তি আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হওয়ার পর তেহরানের ওপর চাপ বাড়াতে ওয়াশিংটনের এটি সর্বশেষ পদক্ষেপ।

রোববার সন্ধ্যায় দেওয়া এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানায়, ১৩ এপ্রিল সোমবার সকাল ১০টা ইস্টার্ন টাইম অর্থাৎ ১৪:০০ জিএমটি থেকে এই অবরোধ কার্যকর হবে। এ অবরোধের আওতায় থাকবে “ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় প্রবেশ বা সেখান থেকে বের হওয়া সব ধরনের সামুদ্রিক যান চলাচল”। এর মধ্যে পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরসংলগ্ন ইরানি বন্দরগুলোও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। অর্থাৎ, যে কোনো দেশের জাহাজ যদি ইরানের বন্দর থেকে প্রবেশ বা প্রস্থান করে, সেগুলোর ওপর এই ব্যবস্থা প্রযোজ্য হবে।

তবে সেন্টকম একই সঙ্গে বলেছে, অ-ইরানি বন্দরে যাওয়া বা সেখান থেকে আসা জাহাজগুলোর জন্য হরমুজ প্রণালির নৌ-চলাচলের স্বাধীনতায় যুক্তরাষ্ট্র বাধা দেবে না। এ বক্তব্যকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের হুমকির তুলনায় কিছুটা পিছু হটা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প এর আগে পুরো হরমুজ প্রণালি অবরোধ এবং ইরানকে টোল দেওয়া জাহাজগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিয়েছিলেন।

ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি হেইডি ঝৌ-কাস্ত্রো বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পরস্পরবিরোধী বার্তা আসায় পরিস্থিতি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তার ভাষায়, ট্রাম্প বলেছিলেন, প্রণালিতে প্রবেশ বা বের হওয়ার চেষ্টা করা যেকোনো জাহাজই এই অবরোধের আওতায় পড়বে। কিন্তু সেন্টকম এখন বলছে, কেবল ইরানি বন্দরে যাওয়া বা সেখান থেকে বের হওয়া জাহাজগুলোকেই লক্ষ্য করা হবে।

এই অবরোধের হুমকির পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম ৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৪ দশমিক ২৪ ডলারে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দামও ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ২৯ ডলারে ওঠে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকেই হরমুজ প্রণালির ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে ইরান। বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ দিয়ে চলাচল তখন থেকে মারাত্মকভাবে কমে গেছে। ফলে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) পরিবহন প্রায় অচল হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

তবে ইরান নিজের জাহাজগুলো প্রণালি দিয়ে চলাচল অব্যাহত রেখেছে। একই সঙ্গে অন্য কিছু দেশের জাহাজকে সীমিত আকারে চলাচলের অনুমতিও দিয়েছে। সংঘাত শেষ হলে এই জলপথ ব্যবহারের জন্য টোল ব্যবস্থা চালুর বিষয়েও ইরানি কর্মকর্তারা আলোচনা করেছেন।

ট্রাম্পের অবরোধ হুমকির জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (IRGC) এক বিবৃতিতে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি ২২ এপ্রিল পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা। এর মধ্যে কোনো সামরিক জাহাজ যদি এগিয়ে আসে, তবে সেটিকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হবে এবং “কঠোরভাবে মোকাবিলা” করা হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ঘোষিত এ অবরোধের পেছনে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনার ব্যর্থতাই প্রধান কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। পাকিস্তানের রাজধানীতে হওয়া ওই বৈঠকে সমঝোতা না হওয়ায় নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইরানি কর্মকর্তারা আলোচনায় সমঝোতা না হওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকেই দায়ী করেছেন। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি অভিযোগ করেন, সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হওয়ার একেবারে দ্বারপ্রান্তে থাকা অবস্থায় মার্কিন আলোচকরা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে অগ্রগতিতে বাধা দেয়। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র বারবার আলোচনার “গোলপোস্ট সরিয়ে দিয়েছে”।

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক জোহরেহ খারাজমি বলেছেন, ইরানকে কীভাবে আচরণ করতে হবে বা কোন জাহাজ চলাচল করতে পারবে-এ সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র নেই। তিনি বলেন, এই অবরোধ যদি “ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সহনশীলতা বনাম বৈশ্বিক বাজারের সহনশীলতা”-র লড়াইয়ে রূপ নেয়, তাহলে খুব দ্রুতই বোঝা যাবে কে আসলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তার মতে, ইরান দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্যও প্রস্তুত।


সম্পর্কিত নিউজ