ইরানে আবার হামলা শুরুর কথা ভাবছেন ট্রাম্প

ইরানে আবার হামলা শুরুর কথা ভাবছেন ট্রাম্প
ছবির ক্যাপশান, ইরানে আবার হামলা শুরুর কথা ভাবছেন ট্রাম্প

পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হওয়ার পর ওয়াশিংটনের অবস্থান আবারও কঠোর হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় বিমান হামলার বিকল্পও বিবেচনায় রেখেছেন বলে জানিয়েছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি ঘিরে নৌ-অবরোধ কার্যকরের প্রস্তুতিও সামনে এসেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের নতুন অস্থিরতার পাশাপাশি বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও চাপ বাড়িয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছে, পাকিস্তানে আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে সীমিত আকারের নতুন বিমান হামলার বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোববার ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে অবরোধের যে ঘোষণা দিয়েছেন, তার পাশাপাশি সামরিক পদক্ষেপও তার বিবেচনায় রয়েছে। রয়টার্সও জানিয়েছে, পাকিস্তানে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ও অর্থনৈতিক-দুই ধরনের চাপ একসঙ্গে বাড়ানোর পথেই হাঁটছে।

এদিকে, মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে ইরানি বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে অবরোধ কার্যকর হবে। তবে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে অন্য দেশের বন্দরে যাওয়া-আসা করা জাহাজগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র বাধা দেবে না। রয়টার্স ও এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অবরোধ মূলত ইরানের বন্দরমুখী এবং ইরান থেকে বের হওয়া জাহাজ চলাচলকে লক্ষ্য করে আরোপ করা হচ্ছে। এই ঘোষণা আসার পরই জ্বালানি বাজারে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং তেলের দাম আবারও ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়।

হোয়াইট হাউস অবশ্য দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল–এর প্রতিবেদন নিয়ে সরাসরি নিশ্চিত বক্তব্য দেয়নি। বিষয়টি জানতে চাইলে হোয়াইট হাউজ থেকে বিবিসিকে বলা হয়েছে, সব পথই খোলা রাখা হয়েছে। হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যেই হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধের নির্দেশ দিয়ে ইরানের চাঁদাবাজি বন্ধ করেছেন। একইসঙ্গে বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সব বিকল্প পথও খোলা রেখেছেন। ওয়াল স্ট্রিটকে যারা বলেছেন প্রেসিডেন্ট এরপর কী করবেন তারা স্রেফ অনুমান করে বলেছেন। এই প্রতিক্রিয়া থেকে স্পষ্ট, হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন হামলার সিদ্ধান্ত ঘোষণা না করলেও সামরিক বিকল্প একেবারে নাকচও করছে না।

ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ট্রাম্প আগেই বলেছিলেন, ইউএস নৌ-বাহিনী হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ বা ছেড়ে যেতে চেষ্টা করা ‘যে কোনো এবং সব জাহাজকে’ অবরোধ করবে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইসলামিক রেভুলেশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, এই নৌপথের কাছাকাছি আসা যে কোনো সামরিক জাহাজের বিরুদ্ধে “কঠোর ব্যবস্থা” নেওয়া হবে। রয়টার্স বলছে, ইরান এই অবরোধকে যুদ্ধবিরতির পরোক্ষ লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে এবং মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়লে পরিস্থিতি দ্রুত আরও উত্তপ্ত হতে পারে।

পাকিস্তানে ব্যর্থ হওয়া আলোচনাকে ঘিরেও ট্রাম্প সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেক পোস্টে তিনি বলেছেন, পাকিস্তানে ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, ইরান তাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে অনিচ্ছুক। পরে মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে সাংবাদিকদের সামনে ট্রাম্প বলেন, তারা ফিরে আসুক বা না আসুক, আমার কিছু যায় আসে না। যদি তারা ফিরে না আসে, তাহলেও আমার কোনো সমস্যা নেই (আই এম ফাইন)। তিনি আরও বলেন, ইরান এখনও পারমাণবিক অস্ত্র চায় এবং ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তারা এই ইচ্ছে প্রকাশ করেছে। তারা এখনও এটি চায় এবং গত রাতে তারা তা স্পষ্ট করে দিয়েছে। ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না। দ্য গার্ডিয়ান ও রয়টার্স জানিয়েছে, আলোচনার মূল অচলাবস্থা তৈরি হয় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন এবং হরমুজে নৌ চলাচলের শর্ত নিয়ে।

ইরানের পক্ষ থেকেও কঠোর অবস্থান জানানো হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, পাকিস্তানে শান্তি আলোচনার সময় দুই পক্ষই চুক্তির “একদম কাছাকাছি” ছিল। কিন্তু তেহরানকে যুক্তরাষ্ট্রের “সর্বোচ্চ চাপ, বারবার লক্ষ্য পরিবর্তন এবং অবরোধের” মুখে পড়তে হয়েছে। একই সময়ে ইরানি স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক্সে পোস্ট করে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে বিদ্রূপ করেন এবং তেলের দামের ঊর্ধ্বগতির ইঙ্গিত দেন। এর আগে ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে গালিবাফ বলেছেন, ইরান কোনো হুমকির কাছে আত্মসমর্পণ করবে না।

এ ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। রয়টার্স ও এপি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ঘোষণার পর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০২ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। কয়েকটি তেলবাহী ট্যাংকারও হরমুজমুখী রুট পরিবর্তন করেছে বা অপেক্ষমাণ অবস্থানে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের আলোচনা ব্যর্থ হওয়া এবং অবরোধ কার্যকর হলে মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে নতুন জ্বালানি সংকট আরও গভীর হতে পারে।

এই পুরো পরিস্থিতি এমন সময় তৈরি হলো, যখন ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধের পর থেকে ইরানের ভেতরে যোগাযোগ অবকাঠামোও মারাত্মক চাপে রয়েছে। ইরানে ইন্টারনেট ব্যবহারে ব্যাপক বিধিনিষেধ থাকায় সাধারণ মানুষের তথ্যপ্রবাহ, যোগাযোগ এবং জীবিকার ওপরও প্রভাব পড়ছে। ফলে পাকিস্তানে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার প্রভাব এখন শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নেই; এর অভিঘাত জ্বালানি বাজার, আঞ্চলিক নৌ নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও ছড়িয়ে পড়ছে।

তথ্য সূত্রঃ দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও বিবিসি


সম্পর্কিত নিউজ