দৃষ্টি রক্ষা থেকে রোগ প্রতিরোধ, এক সমাধানেই দ্বিগুণ লাভ!
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
দূর থেকে তাকালে মনে হতে পারে, এটি কোনো সাধারণ লালচে বেরি। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ শুষ্ক ভূমিতে জন্ম নেওয়া Desert Quandong প্রকৃতির সহনশীলতা, আদিবাসী জ্ঞান ও আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানের এক অন্যতম সংযোগস্থল। যেখানে পানির অভাব, প্রচণ্ড তাপ আর অনুর্বর মাটি মানুষের টিকে থাকাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয় , ঠিক সেরকম পরিবেশেই এই লাল ফলটি বেঁচে থাকার এক অনবদ্য কৌশল তৈরি করেছে। ডেজার্ট কোয়ান্ডং এখন আর শুধু অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমিতে সীমাবদ্ধ কোনো স্থানীয় ফল না, এটি ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে বৈশ্বিক সুপারফুড আলোচনায়। এর স্বাদ, পুষ্টিগুণ ও পরিবেশগত গুরুত্ব, সব মিলিয়ে এই ফল এখন গবেষক, খাদ্যবিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু।
ডেজার্ট কোয়ান্ডং কী?
ডেজার্ট কোয়ান্ডং মূলত অস্ট্রেলিয়ার শুষ্ক ও আধা-শুষ্ক অঞ্চলে জন্মানো একটি বুনো ফল। ছোট আকারের গাছ বা ঝোপজাতীয় উদ্ভিদে এই ফল ধরে। পাকা অবস্থায় এর রং গাঢ় লাল থেকে মেরুনের মতো হয়, যা বেশ দূর থেকেই চোখে দেখা যায়। এই ফলের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকটি হলো এটি এমন এক পরিবেশে টিকে থাকে, যেখানে বার্ষিক বৃষ্টিপাত অত্যন্ত কম, মাটিতে পুষ্টির ঘাটতি প্রকট এবং তাপমাত্রা প্রায়ই চরমে পৌঁছায়। তবুও ডেজার্ট কোয়ান্ডং বেঁচে থাকে এবং নিয়মিত ফল দেয়, বছরের পর বছর।
ডেজার্ট কোয়ান্ডংয়ের বেঁচে থাকার পেছনে রয়েছে একাধিক জৈবিক কৌশলও। প্রথমত, এর শিকড় ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর। গাছটি আশপাশের অন্যান্য উদ্ভিদের সঙ্গে এক ধরনের প্রাকৃতিক সংযোগ তৈরি করে, যার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পানি ও খনিজ সংগ্রহ করতে পারে। দ্বিতীয়ত, এর পাতা ছোট ও শক্ত প্রকৃতির, যা পানি বাষ্পীভবন কমিয়ে দেয়। ফলে প্রচণ্ড গরমেও গাছটি নিজের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়। তৃতীয়ত, ফলের ভেতরের শাঁস ও বীজ এমনভাবে গঠিত যে দীর্ঘ খরার সময়ও বংশবিস্তার সম্ভব হয়। এই বৈশিষ্ট্যগুলো ডেজার্ট কোয়ান্ডংকে মরুভূমির অন্যতম সফল উদ্ভিদে পরিণত করেছে।
মরুভূমিতে গাছটি চার মিটার পর্যন্ত উঁচু হয় এবং এর স্বতন্ত্র লাল ফলের জন্য এটি অত্যন্ত মূল্যবান।
এটি অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী সংস্কৃতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। হাজার হাজার বছর ধরে আদিবাসী জনগোষ্ঠী এই ফলকে খাদ্য ও ওষুধ উভয় হিসেবেই ব্যবহার করে এসেছে। খাদ্য হিসেবে এটি খাওয়া হতো কাঁচা অবস্থায় কিংবা রোদে শুকিয়ে। শুকনো কোয়ান্ডং দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য হওয়ায় এটি ছিল মরুভূমিতে বসবাসকারী মানুষের জন্য এক নির্ভরযোগ্য খাদ্য। ঔষধি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব কম নয়। আদিবাসীরা বিশ্বাস করত, এই ফল শরীরকে শক্তি জোগায়, হজমে সাহায্য করে এবং সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এই ঐতিহ্যগত জ্ঞানই পরবর্তীতে আধুনিক গবেষণার ভিত্তি তৈরি করেছে।
ডেজার্ট কোয়ান্ডংয়ের স্বাদ সাধারণ ফলের মতো নয়। এটি একসঙ্গে টক, হালকা মিষ্টি এবং কিছুটা তীক্ষ্ণ স্বাদের। পাকলে এর স্বাদ কিছুটা এপ্রিকট, পীচ এবং রুবার্বের ক্রসের মতো লাগে। ফলটি অত্যন্ত পুষ্টিকর, এতে কমলার দ্বিগুণ ভিটামিন সি থাকে। অনেকের কাছে এর স্বাদ প্রথমে বিস্ময়কর মনে হতে পারে, তবে অভ্যস্ত হলে এই স্বাদই হয়ে ওঠে এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। এই স্বাদ বৈশিষ্ট্যের কারণেই আধুনিক খাদ্যশিল্পে কোয়ান্ডং ব্যবহৃত হচ্ছে জ্যাম ও চাটনি, সস ও ডেজার্ট এবং শুকনো ফলের গুঁড়া হিসেবে।
বিশেষ করে টক-মিষ্টি স্বাদের ভারসাম্যের জন্য এটি আলাদা পরিচিতি পেয়েছে।
আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান ডেজার্ট কোয়ান্ডংকে শক্তিশালী পুষ্টিসমৃদ্ধ একটি ফল হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই ফলে পাওয়া যায় প্রচুর ভিটামিন সি, প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান ইত্যাদি। ভিটামিন সি-এর উপস্থিতি শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান কোষকে ক্ষতিকর অক্সিডেটিভ চাপ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
মরুভূমির কঠিন পরিবেশে জন্ম নেওয়া এই ফলের ভেতর পুষ্টির এমন ঘনত্ব একে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
ডেজার্ট কোয়ান্ডং আজ গবেষকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, এর পরিবেশগত সহনশীলতা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এমন ফসলের গুরুত্ব বাড়ছে, যা কম পানি ও কঠিন পরিবেশে টিকে থাকতে পারে।
দ্বিতীয়ত, এর পুষ্টিগুণ। স্বাস্থ্যকর খাদ্যের বৈশ্বিক চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ফলের সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে।
তৃতীয়ত, এর বহুমুখী ব্যবহার। খাদ্য, প্রসাধনী ও প্রাকৃতিক উপাদান হিসেবে কোয়ান্ডংয়ের ব্যবহার নিয়ে গবেষণা চলছে।
ডেজার্ট কোয়ান্ডং শুধু খাদ্য হিসেবে নয়, পরিবেশ সংরক্ষণের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এই গাছ মাটির ক্ষয় কমাতে সহায়তা করে। অনেক বেশি শুষ্ক অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে থাকে। তাছাড়া কম পানি ব্যবহার করেও ফলন দেয়। ফলে এটি টেকসই কৃষির এক সম্ভাবনাময় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে শুষ্ক অঞ্চলের কৃষিতে এই ধরনের উদ্ভিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এক সময় ডেজার্ট কোয়ান্ডং ছিল স্থানীয় সীমার মধ্যে আবদ্ধ। এখন ধীরে ধীরে এটি আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারেও পরিচিত হয়ে উঠছে। বিশেষ করে প্রাকৃতিক ও অর্গানিক খাদ্যের বাজার, স্বাস্থ্যসচেতন ভোক্তাদের মধ্যে এবং ভিন্ন স্বাদের খোঁজে থাকা শেফদের কাছে এই ফল নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে।
চ্যালেঞ্জ :
সব সম্ভাবনার মাঝেও কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
এই ফল সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সময়সাপেক্ষ। এটি প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর নির্ভরশীলতা। তাছাড়া এটি অতিরিক্ত আহরণে পরিবেশগত ঝুঁকি
রয়েছে। এসব কারণে টেকসই ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেজার্ট কোয়ান্ডং ভবিষ্যতে শুধু একটি ফল হিসেবে নয়, জলবায়ু-সহনশীল কৃষির মডেল, প্রাকৃতিক পুষ্টির উৎস এবং আদিবাসী জ্ঞানের মূল্যায়নের প্রতীক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমির এই লাল ফল শুধু স্বাদ বা পুষ্টির গল্প নয়।এটি টিকে থাকার দর্শন, আদিবাসী প্রজ্ঞা ও আধুনিক বিজ্ঞানের এক মিলনবিন্দু। ভবিষ্যতের খাদ্য ও পরিবেশ ভাবনায় ডেজার্ট কোয়ান্ডং তাই আর কোনো প্রান্তিক ফল নয় এটি একটি সম্ভাবনার নাম, যা মরুভূমির নীরবতা ভেঙে বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে শেখাচ্ছে।
আপনার প্রতিক্রিয়া জানান
মন্তব্যসমূহ
এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।