বাস্তবেও কি সম্ভব “অদৃশ্য হওয়া”?- গবেষণার তথ্য

বাস্তবেও কি সম্ভব “অদৃশ্য হওয়া”?- গবেষণার তথ্য
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

মানুষের কল্পনায় অদৃশ্য হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নতুন কিছু নয়। রূপকথা, উপকথা, কল্পবিজ্ঞান পায় সবখানেই অদৃশ্য মানুষের গল্প ঘুরে ফিরে আসে। শত্রুর চোখ এড়িয়ে চলা, ক্ষমতার অপব্যবহার, কিংবা নিঃশব্দে সবকিছু দেখে নেওয়ার এক অলৌকিক মোহ মানুষের মনে চিরকাল কাজ করেছে। বাংলা সাহিত্যে যেমন রূপকথার কানাই, বিশ্ব সাহিত্যে তেমনি এইচ জি ওয়েলসের গ্রিফিন, দুজনেই অদৃশ্য হওয়ার ক্ষমতা পেয়ে যেন মানুষের সবচেয়ে কাঙ্খিত ইচ্ছাটাকেই প্রকাশ করে। কিন্তু প্রশ্ন একটাই বিজ্ঞান কি এই কল্পনাকে সত্যি করতে পারে? আর যদি পারে, তবে সেই সত্য কি আদৌ আশীর্বাদ, নাকি নিখাদ অভিশাপ?

সত্যজিৎ রায়, রূপকথার লেখক হিসেবে খুব একটা পরিচিত ছিলেন না। তবু ‘কানাইয়ের কথা’ নামের সেই গল্পে তিনি এক অদ্ভুত ক্ষমতার কথা বলেছিলেন, নিজেকে অদৃশ্য করতে পারার ক্ষমতা। কানাই এই ক্ষমতাকে ব্যবহার অত্যাচারী রাজার হাত থেকে বাঁচতে,অর্থাৎ আত্মরক্ষার জন্য। গল্পের প্রয়োজনে সেখানে বৈজ্ঞানিক কোনো ব্যাখ্যার দরকার ছিল না। রূপকথা যুক্তির ঊর্ধ্বে,শুধু বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু পাঠকের মনে প্রশ্ন জেগে ওঠে, এই ক্ষমতা কি বাস্তবেও সম্ভব? মানুষ কি সত্যিই একদিন নিজেকে অদৃশ্য করতে পারবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ঢুকে পড়তে হয় কল্পবিজ্ঞানের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ে।

গ্রিফিন, কল্পবিজ্ঞানের সবচেয়ে ভয়ংকর অদৃশ্য মানুষ। লন্ডনের এক বিজ্ঞানীর নাম গ্রিফিন। নিজের আবিষ্কারের প্রথম পরীক্ষাটা তিনি চালান নিজের ওপরেই। ফলাফল দাঁড়ায় অবিশ্বাস্য! তিনি অদৃশ্য হয়ে যান মুহূর্তেই। এখান থেকেই শুরু হয় বিপর্যয়। অদৃশ্য হওয়ার ক্ষমতা তাকে মানবিক করে না তোলে, ক্ষমতার নেশায় উন্মাদ করে দেয়। ব্যাংক ডাকাতি, আতঙ্ক, অপরাধ করতে করতে একসময় গ্রিফিন নিজেকে মনে করতে শুরু করে পৃথিবীর অধিশ্বর। প্রশাসন হয়ে পড়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়।
অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে আইন, অস্ত্র বা প্রহরা কোনোটিই কার্যকর হচ্ছে না। মানুষের মনে জন্ম নেয় ভয়, কুসংস্কার আর অলৌকিকতার গল্প। শেষ পর্যন্ত প্রশাসন একটি বুদ্ধিদীপ্ত উপায় বের করে। রাস্তায় ছড়িয়ে দেওয়া হয় চটচটে রং। সেই রং লেগে যায় গ্রিফিনের পায়ে। অদৃশ্য শরীরের নিচে দৃশ্যমান পায়ের ছাপ। সেখান থেকেই সূত্র ধরে ধরা পড়ে অদৃশ্য আততায়ী। এই গল্প বাস্তব নয়। লন্ডনে কখনো এমন তাণ্ডব ঘটেনি। কিন্তু গল্পটি এতটাই বাস্তবসম্মত যে, শত বছর পরেও পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগায়, এটা কি সত্যিই অসম্ভব?

এইচ জি ওয়েলসের ‘দ্য ইনভিজিবল ম্যান’ প্রকাশের পর কেবল পাঠকই নয়, বিজ্ঞানীরাও চমকে গিয়েছিলেন। প্রশ্নটা ছিল সহজ, যদি আলোকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তবে কি মানুষকে অদৃশ্য করা সম্ভব? এই প্রশ্ন থেকেই নানা গবেষণা শুরু হয়। জার্মান চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী স্পোৎজ হেমহোলৎজ এক পর্যায়ে একটি বিস্ময়কর ফল পান। তিনি একটি প্রাণীর চামড়া মিথাইল স্যালিসাইলিক দ্রবণে ডুবিয়ে রাখেন। কিছুদিন পর দেখা যায় চামড়াটি অদৃশ্যমান হয়ে যায়। এই পরীক্ষাই নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। যদি চামড়া অদৃশ্য করা যায়, তবে পুরো প্রাণী বা মানুষ কেন নয়! 

রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে প্রশ্নটি একেবারে অবাস্তব নয়। কোনো বস্তুকে অদৃশ্য করতে হলে মূলত তার প্রতিসারঙ্ক বাতাসের প্রতিসারঙ্কের সমান করতে হবে। তখন আলো সেই বস্তুতে বাধা না পেয়ে সোজা চলে যাবে। বস্তুটি থাকবে, কিন্তু চোখে ধরা পড়বে না।

চামড়ার ক্ষেত্রে পরীক্ষাগারে এটা সীমিত আকারে সম্ভব হয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে ভাবলে, মানবদেহের কোষ, টিস্যু, রক্ত সবকিছুর প্রতিসারঙ্ক যদি সমানভাবে পরিবর্তন করা যায়, তবে মানুষকে অদৃশ্য করা সম্ভব হবে। কিন্তু এখানেই আসে সবচেয়ে একটি  বড় বাধা, পদার্থবিজ্ঞান।

রসায়ন ও জীববিজ্ঞান যতই সম্ভাবনার কথা বলুক না কেন, পদার্থবিজ্ঞান সেখানে নির্মমভাবে বাস্তবকে সামনে আনে। অদৃশ্য হওয়া মানে শুধু অন্যের চোখে ধরা না পড়া নয়, নিজের দেখার ক্ষমতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। এখানে আসে একটি মৌলিক প্রশ্ন,
অদৃশ্য মানুষ কি নিজে দেখতে পাবে?

জীববিজ্ঞান বলে, চোখের রেটিনা ঠিক থাকলে, লেন্সে কোনো সমস্যা না থাকলে মানুষ দেখতে পাবে। কিন্তু এটা পুরোপুরি সত্য নয়। কারণ চোখ আসলে দেখে না, দেখে আমাদেরমস্তিষ্ক। চোখের কাজ হলো কোনো বস্তুর থেকে প্রতিফলিত আলো সংগ্রহ করে মস্তিষ্কে পাঠানো। সেই আলো মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্থানে প্রতিবিম্ব তৈরি করে। সেই প্রতিবিম্বকেই আমরা বস্তু হিসেবে অনুভব করি। কিন্তু আলো তো প্রতিবিম্ব তৈরি করে তখনই, যখন কোনো কিছুর সঙ্গে ধাক্কা খায়।


পানি, আয়না, কাচ সবই আলো প্রতিফলিত করতে পারে। কাচ স্বচ্ছ হলেও আমরা তার ওপর প্রতিবিম্ব দেখি, কারণ কাচের প্রতিসারঙ্ক বাতাসের প্রতিসারঙ্কের চেয়ে আলাদা। পৃথিবীর সবচেয়ে স্বচ্ছ বস্তু হলো বাতাস। তার ভেতর দিয়ে আলো প্রায় বাধাহীনভাবে চলে যায়। যদি কোনো বস্তুর প্রতিসারঙ্ক বাতাসের সমান হয়, তবে আলো সেই বস্তুতে কোনো প্রতিবন্ধকতা পাবে না। এখন একটি অদৃশ্য মানুষের মস্তিষ্ক, তার প্রতিসারঙ্কও যদি বাতাসের সমান হয়, তাহলে আলো মস্তিষ্কে বাধা পাবে না। সোজা ভেদ করে চলে যাবে। ফলে মস্তিষ্কের কোথাও কোনো প্রতিবিম্ব তৈরি হবে না। আর প্রতিবিম্ব না হলে, দেখার প্রশ্নই ওঠে না। অদৃশ্যতা মানেই চিরস্থায়ী অন্ধত্ব। এখানেই এসে এইচ জি ওয়েলসের কল্পনা, বাস্তব বিজ্ঞানের কাছে পরাজিত হযয়ে যায়।

গ্রিফিন অদৃশ্য হয়েও চারপাশ দেখতে পেত, এটা গল্পের প্রয়োজন। বাস্তবে তা সম্ভব নয়। একজন মানুষ যদি সম্পূর্ণভাবে অদৃশ্য হয়, তবে সে হবে সম্পূর্ণ অন্ধ। সে নিজের হাত দেখবে না, রাস্তা দেখবে না, আলো-অন্ধকারের পার্থক্যও বুঝবে না। অদৃশ্য হওয়ার ক্ষমতা তখন আনন্দদায়ক নয়, বরং এক ভয়ংকর শাস্তিতে পরিণত হবে। এই কারণেই পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অদৃশ্য মানুষ তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। আর যদি সম্ভব হয়ও, তা মানবিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে না।

এই আলোচনা শুধু অদৃশ্য হওয়ার স্বপ্ন ভাঙে না, বরং বিজ্ঞানের সীমা ও দায়িত্বও মনে করিয়ে দেয়। বিজ্ঞান সবকিছু করতে পারে না, আর যা পারে, তা করা উচিত কি না, সেটাও বড় ভাবার বিষয়। রূপকথা আমাদের স্বপ্ন দেখায়, কল্পবিজ্ঞান আমাদের ভাবতে শেখায়, আর বিজ্ঞান আমাদের বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

অদৃশ্য হওয়ার স্বপ্ন তাই শেষ পর্যন্ত একটি মানব প্যারাডক্স। আমরা চাই দেখতে, আবার চাই না দেখা দিতে। কিন্তু এই দুই চাওয়াকে একসঙ্গে পাওয়া সম্ভব নয়। রূপকথার কানাই বা কল্পবিজ্ঞানের গ্রিফিন আমাদের কল্পনায় বেঁচে থাকবে। কিন্তু বাস্তব পৃথিবীতে অদৃশ্য হওয়া নয়, দেখতে পারাই মানুষের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য।

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

❤️
Love
0
(0.00 / 0 total)
👏
Clap
0
(0.00 / 0 total)
🙂
Smile
0
(0.00 / 0 total)
😞
Sad
0
(0.00 / 0 total)

মন্তব্যসমূহ

এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।


সম্পর্কিত নিউজ