দিনভর সতেজ থাকতে চান? এই সিক্রেট জানলেই বদলে যাবে জীবন!
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
দিন শেষে অনেকেই বলে থাকেন সময় ছিল, কিন্তু শক্তি ছিল না। কেউ আবার বলেন শক্তি ছিল, কিন্তু সময় ঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়নি। আধুনিক জীবনের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি এখানেই লুকিয়ে থাকে। আমরা সময় ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলি, তালিকা বানাই, রুটিন আঁকি; কিন্তু যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেই এনার্জি ম্যানেজমেন্ট বা শক্তি ব্যবস্থাপনা প্রায় উপেক্ষিতই থেকে যায়।
সময় কিন্তু সবার জন্যই সমান। তবে মানুষের শক্তি কখনোই সমানভাবে কাজ করে না। কখনো আমরা তীক্ষ্ণ, মনোযোগী ও কর্মক্ষম হই তো কখনো আবার একই কাজ করতে গিয়েই ক্লান্ত হয়ে পড়ি। এই ওঠানামার কারণ বুঝে শক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারাটাই হলো স্বাস্থ্যকর এনার্জি ম্যানেজমেন্ট।
ঘড়ির কাঁটা সবার জন্য সমান গতিতেi চলে। কিন্তু আমাদের শরীর তো আর কোনো যন্ত্র নয়। আমাদের শারীরিক, মানসিক ও আবেগীয় শক্তি দিনের বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্নভাবে সক্রিয় থাকে। সকালে কারও মাথা পরিষ্কার থাকে, কারও আবার দুপুরের পর কাজের গতি বাড়ে। কেউ রাতে সবচেয়ে সৃজনশীল। এনার্জি ম্যানেজমেন্ট মানে এই প্রাকৃতিক ছন্দকে বুঝে কাজকে ভাগ করে নেয়া। কঠিন সিদ্ধান্ত, সৃজনশীল কাজ বা গভীর মনোযোগের কাজ সেই সময় করা, যখন শরীর ও মস্তিষ্ক সবচেয়ে প্রস্তুত থাকে।
মানুষের শরীরের ভেতরে একটি স্বাভাবিক সময়চক্র কাজ করে, যা আমাদের ঘুম, জাগরণ, ক্ষুধা ও শক্তির মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। এই চক্রের কারণে দিনের নির্দিষ্ট সময় আমাদের শরীর স্বাভাবিকভাবেই বেশি সক্রিয় হয়, আবার কিছু সময় ধীর হয়ে পড়ে।
এই ছন্দের বিরুদ্ধে গিয়ে কাজ করলে শক্তি দ্রুত ফুরিয়ে যায়। যেমন- ঘুমের সময় চোখ জোর করে খোলা রেখে কাজ করলে উৎপাদনশীলতা বাড়ে না, বরং ক্লান্তি জমে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি শরীর ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
স্বাস্থ্যকর এনার্জি ম্যানেজমেন্ট বুঝতে হলে শক্তিকে শুধু শারীরিক বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। মানুষের শক্তি মূলত চারটি স্তরে কাজ করে।
প্রথমত, শারীরিক শক্তি। খাবার, ঘুম, শ্বাসপ্রশ্বাস ও চলাফেরার ওপর এটি নির্ভর করে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে বা পুষ্টিহীন খাবার খেলে সময় যতই থাকুক, কাজ করার শক্তি থাকে না।
দ্বিতীয়ত, মানসিক শক্তি। মনোযোগ, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও চিন্তার স্বচ্ছতা এই স্তরের অংশ। একটানা বহু সিদ্ধান্ত নিতে হলে বা অতিরিক্ত তথ্যের চাপে এই শক্তি দ্রুত কমে যায়।
তৃতীয়ত, আবেগীয় শক্তি। মানসিক চাপ, হতাশা, ভয় বা দীর্ঘস্থায়ী দুশ্চিন্তা শক্তি নিঃশেষ করে দেয়। আনন্দ, আগ্রহ ও অর্থপূর্ণ কাজ বরং শক্তি বাড়ায়।
চতুর্থত, উদ্দেশ্যগত শক্তি। কেন কাজ করছি সে প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার থাকলে ক্লান্তির মধ্যেও মানুষ এগিয়ে যেতে পারে।
আমাদের সকালটা ভালোভাবেই শুরু হয়। কিন্তু দুপুর গড়াতেই শরীর ভারী লাগে, মনোযোগ ভেঙে যায়। এটি শুধু খাবারের কারণে নয়। দিনের শুরুতে আমরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো না করে ছোটখাটো কাজেই শক্তি খরচ করে ফেলি। অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন, একসঙ্গে অনেক কাজ করার চেষ্টা, বারবার মনোযোগ ভাঙা, এসব মানসিক শক্তির অপচয় ঘটায়। ফলে দিনের মাঝামাঝিতে এসে শরীর নয়, আসলে মনই ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
এনার্জি ম্যানেজমেন্টের মূল কথা হলো, সব কাজের জন্য সমান শক্তি লাগে না। গভীর চিন্তার কাজ, পরিকল্পনা, লেখালেখি বা বিশ্লেষণ, বেশি শক্তি দাবি করে। আর মেইল দেখা, ফাইল গোছানো বা নিয়মিত কাজ তুলনামূলক কম শক্তিতে করা যায়। বুদ্ধিমানের কাজ হলো, উচ্চ শক্তির সময়গুলো সংরক্ষণ করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য। এতে কাজ দ্রুত হয়, ভুল কম হয়, আর দিনের শেষে ক্লান্তিও কম লাগে।
অনেকেই আছেন যারা ঘুমকে সময় নষ্ট মনে করে থাকেন। কিন্তু বাস্তবে ঘুমই শক্তি ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। পর্যাপ্ত ঘুম ছাড়া শরীর শক্তি তৈরি করতে পারে না, মস্তিষ্ক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করে, আবেগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়। ঘুমের অভাব দীর্ঘদিন চললে শরীর এক ধরনের স্থায়ী ক্লান্তির মধ্যে ঢুকে পড়ে। তখন বিশ্রাম নিলেও শক্তি ফিরে আসে না। তাই স্বাস্থ্যকর এনার্জি ম্যানেজমেন্টের শুরু এবং শেষ, দুটোই ঘুমের সঙ্গে জড়িত।
খাবার শুধু পেট ভরানোর বিষয় নয়, এটি আমাদের শক্তির জ্বালানি। ভারী, অতিরিক্ত চিনি বা প্রক্রিয়াজাত খাবার সাময়িকভাবে শক্তি দিলেও পরে তা হঠাৎ কমিয়ে দেয়। ফলে আসে ঝিমুনি ও মনোযোগহীনতা। অন্যদিকে, পরিমিত ও পুষ্টিকর খাবার শরীরকে ধীরে ধীরে শক্তি দেয়। এতে রক্তে শক্তির মাত্রা স্থিতিশীল থাকে, কাজের মাঝখানে হঠাৎ ক্লান্তি আসে না।
অনেকেই মনে করেন, বিরতি নেওয়া মানে কাজ কম করা। কিন্তু গবেষণাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ বলছে, নিয়মিত ছোট বিরতি নেওয়া কর্মক্ষমতা বাড়ায়। কারণ এতে মস্তিষ্ক পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করার সুযোগ পায়। একটানা দীর্ঘ সময় কাজ করলে মনোযোগ কমে যায় এবং ভুলের পরিমাণ বাড়ে। কিন্তু সচেতনভাবে নেওয়া বিরতি পরবর্তী কাজকে আরও কার্যকর করে তোলে।
প্রযুক্তি কাজ সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে শক্তি শোষণও করছে। সারাক্ষণ স্ক্রিনে চোখ রাখা, নোটিফিকেশনের শব্দে মনোযোগ ছুটে যাওয়া, এগুলো মানসিক শক্তির ওপর চাপ ফেলে। এনার্জি ম্যানেজমেন্ট মানে কিন্তু প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া নয়,বরং সেটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। নির্দিষ্ট সময় প্রযুক্তি ব্যবহার, নির্দিষ্ট সময় বিচ্ছিন্ন থাকাই ভারসাম্যই শক্তি ধরে রাখে।
অফিসে দীর্ঘ সময় বসে থাকাই কর্মক্ষমতার মাপকাঠি নয়। বরং কতটা মনোযোগ দিয়ে কাজ করা যাচ্ছে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। কাজের মাঝে নড়াচড়া, আলো-বাতাসের ব্যবস্থা, মানসিক চাপ কমানোর পরিবেশ, শক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করে।
যে কর্মপরিবেশে মানুষ মানসিকভাবে নিরাপদ ও সম্মানিত বোধ করে, সেখানে শক্তি অপচয়ও কম হয়। কারণ, সেখানে আবেগীয় শক্তি ক্ষয় হয় না।
সময় ব্যবস্থাপনার বাইরে গিয়ে ভাবার সময় এসেছে, আমরা এতদিন সময় বাঁচানোর কথা বলেছি। কিন্তু বাস্তবে শক্তি শেষ হয়ে গেলে সময় থাকলেও তার কোনো মূল্য থাকে না। তাই আধুনিক জীবনে সময় ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি শক্তি ব্যবস্থাপনাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। নিজের শরীরের সংকেত বুঝতে পারা, ক্লান্তিকে অবহেলা না করা, প্রয়োজন হলে থেমে যাওয়া কোনো দুর্বলতা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকার কৌশল।
এনার্জি ম্যানেজমেন্ট মানে নিজেকে ধীর করে দেওয়া নয়, বরং নিজেকে বুদ্ধিমানের মতো ব্যবহার করা। যে মানুষ নিজের শক্তিকে সম্মান করে, সে শুধু বেশি কাজই করে না, সে কাজ করে ভালোভাবে, সুস্থ থেকে। সময়ের সঙ্গে লড়াই নয়, শক্তির সঙ্গে বন্ধুত্বই হতে পারে আধুনিক জীবনের সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
আপনার প্রতিক্রিয়া জানান
মন্তব্যসমূহ
এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।