ভিনগ্রহী জীবনের সম্ভাবনা, আবিষ্কার হলো রহস্যময় জৈব অণু!
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
মহাবিশ্বে মানুষ কি একা? এ প্রশ্নটি মানবসভ্যতার সবচেয়ে পুরোনো ও গভীর কৌতূহলগুলোর একটি। রাতের আকাশে অসংখ্য তারা, অগণিত গ্রহ আর অজানা জগতের দিকে তাকিয়ে মানুষ যুগের পর যুগ ধরে ভাবছে,পৃথিবীর বাইরেও কি কোথাও জীবনের অস্তিত্ব রয়েছে? সাম্প্রতিক সময়ে মহাকাশ গবেষণায় একের পর এক জৈব অণুর সন্ধান সেই প্রশ্নকে কল্পনার জগৎ থেকে টেনে আনছে বাস্তবিক আলোচনার কেন্দ্রে। ভিনগ্রহ বা ভিনগ্রহীয় পরিবেশে জৈব অণু শনাক্ত হওয়া মানেই সরাসরি প্রাণের প্রমাণ নয়, তবে এটি যে জীবনের সম্ভাবনার দরজা আরও প্রশস্ত করে দিচ্ছে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে তেমন কোনো দ্বিমত নেই। এই আবিষ্কারগুলো আমাদের শুধু মহাবিশ্ব সম্পর্কে নয়, নিজেদের অস্তিত্ব সম্পর্কেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
জৈব অণু বলতে সাধারণভাবে কার্বনভিত্তিক সেই সব অণুকে বোঝানো হয়, যা মূলত জীবনের মৌলিক কাঠামো গঠনে ভূমিকা রাখে। অ্যামিনো অ্যাসিড, শর্করা, লিপিড বা নিউক্লিওটাইড এসবই জীবনের রাসায়নিক ভিত্তি। পৃথিবীতে যত পরিচিত প্রাণ আছে, সবাই কোনো না কোনোভাবে এই জৈব অণুর ওপর নির্ভরশীল। তাই মহাকাশে, বিশেষ করে অন্য গ্রহ, উপগ্রহ বা নক্ষত্রের মাঝের ধূলিকণায় জৈব অণুর অস্তিত্ব পাওয়া মানে একটাই ইঙ্গিত প্রকাশ করে, আর তা হলো জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদানগুলো কেবল পৃথিবীর জন্য জরুরি নয়, বরং মহাবিশ্বের অন্য প্রান্তেও জীবনের ‘কাঁচামাল’ তৈরি হতে পারে। এই উপলব্ধি বিজ্ঞানকে নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে।
গত কয়েক দশকে উন্নত পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তির মাধ্যমে মহাকাশে নানা ধরনের জৈব অণুর উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। নক্ষত্রের মাঝের বিশাল গ্যাস ও ধূলিমেঘে, যেখানে নতুন তারার জন্ম হয়, সেখানে জটিল কার্বনভিত্তিক অণুর অস্তিত্ব ধরা পড়েছে। এসব অঞ্চলকে আন্তঃনাক্ষত্রিক মেঘ বলা হয়ে থাকে, যা অনেকটা রাসায়নিক পরীক্ষাগারের মতোই কাজ করে।এছাড়া কিছু গ্রহ ও উপগ্রহের বায়ুমণ্ডল বা পৃষ্ঠের কাছাকাছি এলাকায়ও জৈব অণুর ইঙ্গিত মিলেছে। বিশেষ করে যেসব জগতের নিচে তরল পানি বা বরফের নিচে সমুদ্র থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলো বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে। কারণ পৃথিবীতে যেখানে পানি আছে, সেখানেই কোনো না কোনোভাবে জীবনের চিহ্ন দেখা যায়। মহাকাশে ঘুরে বেড়ানো ধূমকেতু ও উল্কাপিণ্ডেও জৈব অণুর উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। অনেক বিজ্ঞানীর ধারণা, পৃথিবীতে জীবনের সূচনালগ্নে এসব মহাজাগতিক বস্তু জৈব অণু বহন করে এনেছিল, যা জীবনের রাসায়নিক ভিত্তি তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।
ভিনগ্রহের জৈব অণু শনাক্ত করা সহজ কাজ নয়। কোনো গ্রহে গিয়ে সরাসরি নমুনা সংগ্রহ করা এখনো প্রায় সীমিত পরিসরে সম্ভব। তাই বিজ্ঞানীরা দূরবর্তী পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে আছেন। স্পেকট্রোস্কোপি নামের একটি পদ্ধতিতে আলো বিশ্লেষণ মাধ্যমে বোঝা যায়, কোনো বস্তুতে কী ধরনের অণু আছে। যখন কোনো গ্রহ বা মেঘের মধ্য দিয়ে আলো যায় বা সেখান থেকে প্রতিফলিত হয়, তখন নির্দিষ্ট অণু নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষণ করে। সেই শোষণের চিহ্ন বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা অণুর উপস্থিতি শনাক্ত করেন। এই পদ্ধতি এতটাই সূক্ষ্ম যে হাজার হাজার আলোকবর্ষ দূরের কোনো অঞ্চলেও কার্বনভিত্তিক অণুর অস্তিত্ব ধরা সম্ভব হচ্ছে। আধুনিক মহাকাশ টেলিস্কোপ ও সেন্সরের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এই বিশ্লেষণ দিন দিন আরও নিখুঁত হচ্ছে।
জৈব অণু মানেই কি জীবন? এখানেই উঠে আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি। জৈব অণু পাওয়া গেলেই কি বলা যায় সেখানে প্রাণ আছে? বিজ্ঞানীদের উত্তর মতে এর উত্তর নেতিবাচক অর্থাৎ জৈব অনু মানেই জীবন না। জৈব অণু জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় একটি উপাদান ঠিকই, কিন্তু তা একমাত্র শর্ত নয়। জীবনের জন্য আরও দরকার উপযুক্ত তাপমাত্রা, স্থিতিশীল পরিবেশ, শক্তির উৎস এবং দীর্ঘ সময় ধরে রাসায়নিক বিক্রিয়া চলার সুযোগ। অনেক সময় জৈব অণু এমন পরিবেশেও তৈরি হতে পারে, যেখানে জীবনের বিকাশই সম্ভব নয়। তবুও এই আবিষ্কারগুলোর গুরুত্ব কমে না। কারণ এটি প্রমাণ করে, জীবনের উপাদান তৈরি হওয়া কোনো বিরল ঘটনা নয়। বরং মহাবিশ্বের স্বাভাবিক রাসায়নিক প্রক্রিয়ার অংশ।
জৈব অণুর বিস্তৃত উপস্থিতি মহাবিশ্বে জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন আশার জন্ম দিয়েছে। যদি কোটি কোটি গ্রহে জীবনের কাঁচামাল থাকে, তাহলে পরিসংখ্যানগতভাবে অন্তত কোথাও না কোথাও জীবন গড়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে। এটি মানুষের অবস্থান সম্পর্কেও এক ধরনের দার্শনিক প্রশ্ন তোলে। আমরা কি সত্যিই ব্যতিক্রম, নাকি মহাবিশ্বের অসংখ্য জীবনের মধ্যে মাত্র একটি উদাহরণ?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা, তবে জৈব অণু শনাক্ত হওয়ার প্রতিটি খবর মানুষকে সেই উত্তরের আরও কাছাকাছিই নিয়ে যাচ্ছে।
আগামী দিনের মহাকাশ গবেষণায় জৈব অণু শনাক্তকরণ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। অণুর উপস্থিতির পাশাপাশি সেগুলোর উৎস, গঠনপ্রক্রিয়া এবং পরিবেশগত প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণই হবে মূল লক্ষ্য। বিজ্ঞানীরা বিশেষভাবে আগ্রহী এমন জগতগুলোর প্রতি, যেখানে তরল পানি থাকার সম্ভাবনা আছে বা ছিল। কারণ পানি ও জৈব অণুর সংমিশ্রণ জীবনের জন্য সবচেয়ে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে পৃথিবীর জীবনের উৎপত্তি নিয়েও নতুন আলো ফেলছে এই গবেষণা। যদি মহাকাশে সহজেই জৈব অণু তৈরি হয়, তাহলে পৃথিবীতে জীবন শুরু হওয়াও হয়তো মহাবিশ্বের স্বাভাবিক ধারারই অংশ।
ভিনগ্রহীয় জৈব অণু শনাক্ত হওয়া মানে এখনো এলিয়েন জীবনের নিশ্চিত প্রমাণ নয়। তবে এটি এমন এক বৈজ্ঞানিক মাইলফলক, যা মানুষের কৌতূহলকে কল্পনার সীমা ছাড়িয়ে বাস্তব অনুসন্ধানের পথে নিয়ে এসেছে। মহাবিশ্ব ক্রমেই আমাদের সামনে তার রহস্য উন্মোচন করছে ধীরে, কিন্তু ধারাবাহিকভাবে।
আপনার প্রতিক্রিয়া জানান
মন্তব্যসমূহ
এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।