এই রেসিপিতে ঘরেই পাবেন আসল তুর্কি চায়ের স্বাদ!বিস্তারিত ইতিহাস

এই রেসিপিতে ঘরেই পাবেন আসল তুর্কি চায়ের স্বাদ!বিস্তারিত ইতিহাস
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

তুরস্কে চা শুধু পানীয় কিন্তু নয়, এটি সময়, সম্পর্ক ও পরিচয়েরও প্রতীক। সকাল হোক বা সন্ধ্যা, দোকানের সামনে বসে থাকা মানুষ, পারিবারিক আড্ডা কিংবা ব্যবসায়িক আলোচনা সবখানেই ছোট কাচের গ্লাসে ধোঁয়া ওঠা তুর্কি চা (Çay) অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। বাইরে থেকে দেখলে এটি সাধারণ কালো চা মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে বিশেষ প্রস্তুতপ্রণালী, স্বাদের সূক্ষ্ম হিসাব এবং শত বছরের সামাজিক অভ্যাস। তুর্কি চা তাই শুধু রেসিপি নয়,এটি একটি সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতাই বটে।

তুরস্ক চা রপ্তানিকারক একটি দেশ। শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশগুলির মধ্যে পঞ্চম স্থানে রয়েছে এটি। তাদের ঘর এবং বাগানে অনুষ্ঠিত সামাজিক সমাবেশে চা একটি বড় ভূমিকা পালন করে। তুরস্কে মাথাপিছু চা পানের পরিমাণ বিশ্বে সবচেয়ে বেশি, বার্ষিক মোট খরচ ৩ কিলোগ্রামেরও বেশি।অতিথিদের চা পরিবেশন করা তাদের আতিথেয়তার অংশ। এটি ভেষজ ওষুধ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। তুর্কি চা সংস্কৃতির দীর্ঘ এবং বিস্তৃত একটি ইতিহাস রয়েছে। এটি তাদের সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশবিশেষ। 

তুর্কি চা কিভাবে সবচেয়ে আলাদা?

তুর্কি চা মূলত কালো চা হলেও এর প্রস্তুতপ্রণালী সাধারণ চা বানানোর পদ্ধতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে চা তৈরির জন্য বিশেষভাবে তৈরি দুটি স্তূপীকৃত চা-পাতা ব্যবহার করা হয় যা চায়দানলিক ( çaydanlık) নামে পরিচিত। বৃহত্তর নীচের চা-পাতায় পানি ফুটিয়ে উপরে ছোট চা-পাতা ভরে কিছু পানি ব্যবহার করা হয় এবং কয়েক চামচ আলগা চা-পাতা ঢেলে (ঢেলে) দেওয়া হয়, যার ফলে তীব্র স্বাদের চা তৈরি হয়। পরিবেশন করার সময়, নিজের পছন্দমতো পানির সঙ্গে ঘন চা মিশিয়ে নেওয়া হয়। এই পদ্ধতির ফলে চা তেতো না হয়ে গভীর ও স্তরযুক্ত স্বাদের হয়। পাতার রাসায়নিক উপাদান ধীরে নির্গত হওয়ায় চায়ের রং ও ঘ্রাণ নিয়ন্ত্রণে থাকে। এ কারণেই তুর্কি চায়ের স্বাদ একদিকে শক্তিশালী, আবার অন্যদিকে মোলায়েমও।

তুরস্কে চা এত জনপ্রিয় হলো কেন?

অনেকে ভাবেন, তুরস্কের জাতীয় পানীয় হয়তো কফি। কিন্তু বাস্তবে, দৈনন্দিন জীবনে চা, কফির চেয়ে অনেক বেশি ব্যবহৃত হয়। এর পেছনে রয়েছে ভূগোল, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির মিলিত এক প্রভাব। উত্তর তুরস্কের কৃষ্ণসাগর উপকূলীয় এলাকায় চা চাষের জন্য রয়েছে আদর্শ আবহাওয়া অর্থাৎ পর্যাপ্ত  বৃষ্টি, আর্দ্রতা ও পাহাড়ি ঢাল। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে চা চাষ বিস্তৃত হওয়ার পর এটি দ্রুত সাধারণ মানুষের পানীয় হয়ে ওঠে। কফির তুলনায় চা সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং দিনে বহুবার পান করার উপযোগী। ক্রমে চা হয়ে ওঠে আতিথেয়তার ভাষা। কাউকে বাড়িতে ডাকলে, দোকানে বসলে বা কোনো আলোচনা শুরু হলে, প্রথমেই যে প্রশ্নটা থাকে তা হলো, “চা নেবেন?”

তুর্কি চায়ের স্বাদ তৈরি হয় মূলত তিনটি বিষয়ে-

১. পাতার মান:তুর্কি চা সাধারণত সূক্ষ্মভাবে কাটা কালো চা পাতা দিয়ে তৈরি হয়, যা দ্রুত রং ও স্বাদ ছাড়ে।

২. পানির তাপমাত্রা:চা পাতার ওপর সরাসরি ফুটন্ত পানি ঢালা হয় না। বরং উপরের পাত্রে ধীরে ধীরে গরম হওয়া পানিতে চা ভিজে থাকে।এতে অতিরিক্ত তিক্ততা তৈরি হয় না।

৩. সময়:এই চায়ের মূল রহস্যই হলো সময়। তাড়াহুড়ো করে নয়, ধৈর্য ধরে তৈরি করা হয় এই চা। ফলে স্বাদ ধাপে ধাপে বিকশিত হতে পারে।

সম্পূর্ণ রেসিপি:

উপকরণ:

⇨  কালো চা পাতা - ২ থেকে ৩ টেবিল চামচ

⇨  পানি - প্রয়োজনমতো

⇨ চায়দানলিক (ডাবল কেটলি)

⇨  না থাকলে: একটি বড় পাত্র ও তার ওপর বসানো ছোট পাত্র

⇨  চিনি (ঐচ্ছিক)

× দুধ ব্যবহার করা হয় না, এটাই তুর্কি চায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

প্রসেস :

প্রথমেই পানি ফুটানোর ধাপ। চায়দানলিকের নিচের বড় পাত্রে পর্যাপ্ত পানি দিয়ে চুলায় বসান। পানি ভালোভাবে ফুটে উঠতে দিন। এই ফুটন্ত পানি পরবর্তী সব ধাপের ভিত্তি।

পরের ধাপে, উপরের পাত্রে চা পাতা যোগ করতে হবে। উপরের ছোট পাত্রে নির্ধারিত পরিমাণ চা পাতা দিন। এখানে চা পাতার পরিমাণ একটু বেশি রাখা হয়, কারণ এটি হবে কনসেন্ট্রেটেড বা ঘন চা।

এরপর গরম পানি ঢালার পালা। নিচের পাত্র থেকে ফুটন্ত পানি নিয়ে উপরের পাত্রে চা পাতার ওপর ঢালুন, এতটা যাতে পাতাগুলো ভালোভাবে ভিজে যায়, কিন্তু পুরো পাত্র ভরে না যায়। এরপর উপরের পাত্রটি নিচের ফুটন্ত পানির ওপর বসিয়ে দিন।

তারপ  ধীরে ধীরে দমে রাখতে হবে। এই অবস্থায় চা ১০ থেকে ১৫ মিনিট ধীরে ধীরে দমে থাকবে। চুলার আঁচ মাঝারি থেকে কম রাখা ভালো। এই সময়েই চা তার আসল রং, ঘ্রাণ ও স্বাদ তৈরি করে। এখানে তাড়াহুড়ো করলে চলবে না, এটাই তুর্কি চায়ের বৈশিষ্ট্য।

সবশেষে পরিবেশনের পালা। তুর্কি চা পরিবেশন করা হয় ছোট কাচের গ্লাসে, যা মাঝখানে সরু ও উপরে-নিচে চওড়া। আগে গ্লাসে কিছুটা ঘন চা ঢালুন। এরপর নিজের পছন্দ অনুযায়ী নিচের পাত্রের গরম পানি যোগ করুন। যিনি হালকা চা চান, তিনি বেশি পানি যোগ করবেন। শক্ত চা পছন্দ হলে পানি কম। চিনি আলাদা দেওয়া হয়, প্রত্যেকে নিজের মতো করে মিষ্টতা ঠিক করে নেয়।

তুর্কি চা পান করার ভঙ্গিমা:

তুরস্কে চা পান মানে একটি সামাজিক আচরণ। সেখানে চা ধীরে ধীরে চুমুক দিয়ে খাওয়া হয়।ঐতিহ্যগতভাবে, চা ছোট ছোট কিউব বিট চিনি দিয়ে পরিবেশন করা হয় । এটি প্রায় কখনও দুধ বা লেবুর সাথে খাওয়া হয় না। কুরাবিয়ে নামক মিষ্টি বা সুস্বাদু বিস্কুট সাধারণত চায়ের সাথে পরিবেশন করা হয়। তাদের চা পান এর রয়েছে বিশেষ  সময়, সাধারণত বিকেল তিনটা থেকে পাঁচটার মধ্যে, যদিও চা পান এই সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘ কথোপকথনের সঙ্গে চা বারবার রিফিল করা হয়। এখানে চা শেষ হওয়া মানেই আলাপ শেষ নয়, বরং নতুন কাপ চা মানেই নতুন কথা।


স্বাস্থ্যদৃষ্টিতে তুর্কি চা: 

তুর্কি চা কালো চা হওয়ায় এতে প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বেশি থাকে। সঠিক মাত্রায় পান করলে—

⇨ মানসিক সতেজতা বাড়াতে সাহায্য করে

⇨ হজম প্রক্রিয়ায় সহায়ক

⇨ রক্ত সঞ্চালনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে

⇨ তবে অতিরিক্ত পান করলে ক্যাফেইনের প্রভাব দেখা দিতে পারে, তাই পরিমিতি হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ।

অনেকের মনেই  প্রশ্ন জাগতে পারে, এই চা কি সাধারণ কালো চা থেকেই আলাদা?

উত্তরটা হলো- পাতা কাছাকাছি হলেও পার্থক্য তৈরি হয় প্রস্তুতপ্রণালীতে। তুর্কি চায়ের ডাবল কেটলি পদ্ধতি চায়ের রাসায়নিক গঠনকে ভিন্নভাবে প্রকাশ করে থাকে, যা সাধারণ এক-পাত্র চায়ে পাওয়া যায় না।

আধুনিক সময়ে তুর্কি চা:

আজকের তুরস্কে আধুনিক কফিশপ এবং আন্তর্জাতিক পানীয় থাকলেও চায়ের অবস্থান এখনো অটুট। শহর হোক বা গ্রাম, চা এখনো দৈনন্দিন জীবনের ছন্দ ঠিক করে দেয়। এমনকি প্রযুক্তিনির্ভর ব্যস্ত জীবনে তুর্কি চা যেন মানুষকে মনে করিয়ে দেয় সবকিছু দ্রুত নয়, কিছু জিনিস ধীরে উপভোগ করতেই সুন্দর।

এক কাপ তুর্কি চা মানে সময় নেওয়ার অনুমতি, মানুষকে শোনার সুযোগ এবং জীবনের গতিকে একটু ধীর করার শিল্প। যদি কখনো চায়ের কাপে শুধু স্বাদ নয়, অনুভূতিও খুঁজে পেতে চান তুর্কি চা তখন নিঃসন্দেহে এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

❤️
Love
0
(0.00 / 0 total)
👏
Clap
0
(0.00 / 0 total)
🙂
Smile
0
(0.00 / 0 total)
😞
Sad
0
(0.00 / 0 total)

মন্তব্যসমূহ

এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।


সম্পর্কিত নিউজ