সুখ তালিকায় ফিনল্যান্ড আবারও শীর্ষে,দক্ষিণ এশিয়ায় এগিয়ে পাকিস্তান!
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
বিশ্ব যখন যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জলবায়ু সংকট আর মানসিক চাপে জর্জরিত,ঠিক তখনও কিছু দেশ ধারাবাহিকভাবে প্রমাণ করে দিচ্ছে সুখ কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়, এটি একটি সামাজিক বাস্তবতা। ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট বা বৈশ্বিক সুখ মূল্যায়ন সেই প্রতিবেদন যেখানে বিভিন্ন দেশের মানুষের সুখের মাত্রা নিয়ে বিশ্লেষণ ও র্যাঙ্কিং প্রকাশ করা হয়। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সুখ মূল্যায়নে আবারও বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশের তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে ইউরোপের ছোট কিন্তু সুসংগঠিত দেশ ফিনল্যান্ড। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার মতো জটিল ও বৈচিত্র্যময় অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে সুখী দেশ হিসেবে উঠে এসেছে পাকিস্তানের নাম। এই দুই দেশের অবস্থান শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং সুখ কীভাবে গঠিত হয় সে বিষয়ে একটি গভীর সামাজিক বার্তা বহন করছে।
প্রথম নজরে বিষয়টি মনে বিস্ময় জাগাতে পারে। কারণ, ফিনল্যান্ডের মতো উচ্চ আয়, উন্নত শিক্ষা ও শক্তিশালী রাষ্ট্রব্যবস্থা থাকা দেশের সঙ্গে পাকিস্তানের তুলনা অর্থনৈতিক দিক থেকে বেশ অসম। তবু সুখের সূচকে এই দুই দেশের অবস্থান প্রমাণ করে সুখ কেবল টাকার হিসাব নয়, এটি মানুষের জীবনযাপন, মানসিক নিরাপত্তা, সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থার প্রতিফলন।
ফিনল্যান্ডের সুখের গল্প শুরু হয় তাদের সমাজের গভীর কাঠামো থেকে। এই দেশটিতে, সুখ কখনো জোরে হাসি বা বাহ্যিক উচ্ছ্বাসে প্রকাশ পায় না। বরং এটি নীরব, স্থিতিশীল এবং গভীর। ফিনিশ সমাজে মানুষ খুব বেশি কথা বলে না, কিন্তু বিশ্বাস করে বেশি। এই বিশ্বাসই তাদের সুখের অন্যতম ভিত্তি। ফিনল্যান্ডে নাগরিক ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক অত্যন্ত দৃঢ়। সরকারকে মানুষ সন্দেহের চোখে দেখে না, আবার সরকারও নাগরিককে নিয়ন্ত্রণের বস্তু হিসেবে দেখে না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষার মতো মৌলিক বিষয়গুলো এখানে অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ফলে একজন মানুষ জানে যে জীবনে বিপদ এলেও সে একা নয়।
শিক্ষাব্যবস্থা ফিনল্যান্ডের সুখের আরেকটি শক্ত স্তম্ভ। এখানে শিক্ষাকে প্রতিযোগিতার অস্ত্র নয়, বরং মানবিক বিকাশের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। শিশুদের ওপর নেই কোনো অতিরিক্ত চাপ, নেই পরীক্ষাভীতি, তবু শিক্ষার মানে কোনো আপস নেই। এর ফলে ছোটবেলা থেকেই তাদের মানসিক স্বস্তি ও আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে, যা পরবর্তী জীবনে সুখের ভিত্তি তৈরি করে।
ফিনল্যান্ডে, প্রকৃতি তাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ। বন, হ্রদ, তুষার আর খোলা আকাশ, এই উপাদানগুলো মানুষের মানসিক ভারসাম্য রক্ষা করে। সপ্তাহান্তে প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়া, নীরবতায় কিছু সময় কাটানো ফিনিশ সংস্কৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা মানুষের মানসিক চাপ কম হয়, ঘুম ভালো হয় এবং জীবনের প্রতি তাদের সন্তুষ্টি বাড়ে। ফিনল্যান্ড এই দিক থেকে একটি আদর্শ উদাহরণ, যেখানে নগর উন্নয়নেও প্রকৃতিকে বাদ দেওয়া হয় না।
কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্যও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় কাজ করা বা অতিরিক্ত ব্যস্ততাকে গৌরব হিসেবে দেখা হয় না। বরং দক্ষভাবে কাজ শেষ করে নিজের ও পরিবারের জন্য সময় বের করাই সুস্থ জীবনের লক্ষণ।
ফিনল্যান্ডের মানুষ সুখকে বিলাসী অনুভূতি হিসেবে দেখে না। তাদের কাছে সুখ মানে হলো নিশ্চিন্ত ঘুম, আগামীকাল নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তা না থাকা, প্রয়োজনে সাহায্য পাওয়ার বিশ্বাস এবং নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা।
এখানে সামাজিক বৈষম্য তুলনামূলকভাবে কম। ধনী-গরিবের ব্যবধান থাকলেও তা মানুষের দৈনন্দিন সম্মানবোধে তেমন কোনো বড় প্রভাব ফেলে না। এই সামাজিক সমতা মানুষের মনে হীনম্মন্যতা বা অতিরিক্ত প্রতিযোগিতার চাপ তৈরি করে না, যা দীর্ঘমেয়াদে সুখ ধরে রাখতে সাহায্য করে।
দক্ষিণ এশিয়া মানেই বৈপরীত্যের অঞ্চল, একদিকে ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সম্পর্কের গভীরতা, অন্যদিকে রয়েছে দারিদ্র্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় পাকিস্তানের তুলনামূলক সুখী অবস্থান বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। পাকিস্তানের সুখের মূল ভিত্তি অর্থনৈতিক নয়, বরং সামাজিক। পরিবার এখানে জীবনের কেন্দ্রে। একাধিক প্রজন্ম একসঙ্গে বসবাস, পারিবারিক সিদ্ধান্তে সবার অংশগ্রহণ এবং সংকটে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর সংস্কৃতি মানুষের মানসিক ভরসা তৈরি করে। এই পারিবারিক বন্ধন মানুষকে একাকীত্ব থেকে দূরে রাখে। আধুনিক সমাজে একাকীত্ব একটি বড় মানসিক সমস্যা হলেও পাকিস্তানের সমাজে এখনো মানুষ সামাজিক বৃত্তের ভেতরেই থাকে, যা সুখের অনুভূতিকে শক্তিশালী করে।
পাকিস্তানের সমাজে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাস মানুষের জীবনে একটি অর্থপূর্ণ কাঠামো তৈরি করে। জীবনের কষ্টকে শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখার মানসিকতা, মানুষকে মানসিকভাবে দৃঢ় রাখতে সহায়তা করে।বিশ্বাস মানুষকে আশা দেয়, আর আশা সুখের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অর্থনৈতিক সংকট বা সামাজিক সমস্যার মাঝেও ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী থাকা মানুষকে মানসিকভাবে টিকিয়ে রাখে। পাশাপাশি প্রতিবেশী, আত্মীয় ও সম্প্রদায়ভিত্তিক সম্পর্ক পাকিস্তানের সমাজে এখনো সক্রিয়। প্রয়োজনে সাহায্য পাওয়ার বিশ্বাস মানুষের মনে নিরাপত্তা তৈরি করে, যা তাদের সুখের অনুভূতিকে জোরদার করে।
ফিনল্যান্ড ও পাকিস্তানের সুখের পথ এক নয়। ফিনল্যান্ডে সুখ আসে প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা, সামাজিক আস্থা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা থেকে। আর পাকিস্তানে সুখ আসে সম্পর্ক, বিশ্বাস ও সামাজিক সংহতি থেকে। এই তুলনা দেখায়, সুখের কোনো একক সূত্র নেই। একটি সমাজ যতই উন্নত হোক, যদি সম্পর্ক ভেঙে পড়ে বা মানসিক নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে সুখ টেকসই হয় না। আবার অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও যদি সম্পর্ক ও অর্থবোধ শক্ত থাকে, তাহলে সুখের অনুভূতি বজায় থাকতে পারে।
২০২৫ সালের বিশ্ব সুখ প্রতিবেদন মূলত যত্ন ও ভাগাভাগি বিষয়কে কেন্দ্র করে তৈরি। এতে দেখানো হয়েছে, অন্যের প্রতি যত্নশীল হওয়া, সাহায্য করা এবং সামাজিক বন্ধন মানুষের সুখকে কতটা বাড়িয়ে তোলে। অর্থাৎ, ভালো সম্পর্ক, সামাজিক সংযোগ এবং কমিউনিটি জীবনে অংশগ্রহণ, এসবই মানুষের সামগ্রিক সুস্থতা ও সুখে বড় ভূমিকা রাখে।
মানুষ কেমন অনুভব করছে, তারা নিজেদের জীবনকে কতটা অর্থপূর্ণ মনে করছে, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর রাষ্ট্রের উন্নয়নের গভীর চিত্র তুলে ধরে। এই ধরনের মূল্যায়ন নীতিনির্ধারকদের মনে করিয়ে দেয়, শুধু জিডিপি বা অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। মানুষের মানসিক সুস্থতা, সামাজিক আস্থা ও জীবনের প্রতি সন্তুষ্টি নিশ্চিত না করলে উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
বিশ্বের সুখের মানচিত্রে ফিনল্যান্ডের শীর্ষস্থান আর দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের এগিয়ে থাকা আমাদের দেখায়, সুখের পথ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মূল কথা একটাই। মানুষ যদি নিরাপদ বোধ করে, সম্পর্কের ভেতর শক্ত থাকে এবং জীবনের অর্থ খুঁজে পায়, তাহলেই একটি সমাজ সত্যিকারের সুখের দিকে এগিয়ে যায়।
আপনার প্রতিক্রিয়া জানান
মন্তব্যসমূহ
এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।