এক রাত না ঘুমালেই স্মৃতিশক্তি কমতে পারে ৪০ শতাংশ! সত্যতা জানুন

এক রাত না ঘুমালেই  স্মৃতিশক্তি কমতে পারে ৪০ শতাংশ! সত্যতা জানুন
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অনেকেই ঘুমকে খুব বেশি হালকাভাবে নেন। ব্যস্ততা, পড়াশোনা, কাজের চাপ কিংবা বিনোদনের লোভে প্রায়ই অনেককেই বলতে শোনা যায়, এক রাত না ঘুমালে আর কী এমন হবে, পরের দিন কফি খেলেই তো চলবে! কিন্তু এই নিরীহ ধারণার আড়ালেই লুকিয়ে আছে মস্তিষ্কের জন্য এক ভয়ানক বিপদ। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণা দেখাচ্ছে, মাত্র এক রাত পর্যাপ্ত ঘুম না হলেই মানুষের শেখার ক্ষমতা ও স্মৃতিধারণের দক্ষতা নাটকীয়ভাবে কমে যেতে পারে। এটি কোনো দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাসের ফল নয়, বরং এক রাতই যথেষ্ট।

গবেষণায় দেখা গেছে, এক রাত ঠিকমতো না ঘুমালে মস্তিষ্কের নতুন তথ্য গ্রহণ ও সংরক্ষণের ক্ষমতা প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এই সংখ্যাটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এর অর্থ বাস্তব জীবনে ভুল সিদ্ধান্ত, পড়াশোনায় ব্যর্থতা কিংবা পেশাগত ক্ষেত্রে বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি।

মানুষের মস্তিষ্ক কোনো যান্ত্রিক হার্ডডিস্ক নয়, কিন্তু এর কাজের ধরনে আশ্চর্যরকম মিল আছে আধুনিক ডেটা ব্যবস্থার সঙ্গে। আমাদের মস্তিষ্কের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হিপোক্যাম্পাস। স্নায়ুবিজ্ঞানীরা একে প্রায়ই মস্তিষ্কের ‘ইনবক্স’ বলে ব্যাখ্যা করেন। দিনভর আমরা যা কিছু দেখি, শুনি, পড়ি বা শিখি, সব তথ্য সরাসরি স্থায়ী স্মৃতিতে জমা হয় না। প্রথমে সেগুলো অস্থায়ীভাবে হিপোক্যাম্পাসে জমা থাকে। ঠিক যেমন ইমেইলের ইনবক্সে নতুন মেইল এসে জমা হয়। কিন্তু ইনবক্স যদি ভর্তি থাকে, নতুন মেইল ঢুকতে পারে না, ঠিক একই সমস্যা হয় ঘুমের অভাবে। ঘুমের সময়ই মস্তিষ্কের আসল কাজ শুরু হয়। তখন হিপোক্যাম্পাসে জমে থাকা অস্থায়ী তথ্যগুলো ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের অন্যান্য অংশে স্থানান্তরিত হয় এবং স্থায়ী স্মৃতিতে রূপ নেয়। একে তথ্যের সংরক্ষণ প্রক্রিয়া বলা যায়। এই প্রক্রিয়া শেষ হলে ইনবক্স আবার খালি হয়ে যায় এবং নতুন কিছু শেখার জন্য প্রস্তুত থাকে।

যখন একজন মানুষ এক রাত পর্যাপ্ত ঘুমায় না, তখন এই পুরো ব্যবস্থাটিই ভেঙে পড়ে। হিপোক্যাম্পাস আগের দিনের তথ্য ঠিকমতো সরাতে পারে না। ফলে সেখানে জায়গা খালি হতে পারে না। পরদিন নতুন কিছু শিখতে গেলে মস্তিষ্ক কার্যত বাধা দেয়। সহজভাবে বললে, তখন নতুন তথ্য ঢুকতে গিয়ে বাউন্স করে আবার ফিরে আসে। আপনি হয়তো ক্লাসে বসে আছেন, মিটিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা শুনছেন বা নতুন কিছু পড়ছেন কিন্তু মস্তিষ্ক সেটাকে গ্রহণই করছে না। বাইরে থেকে মনে হতে পারে আপনি মনোযোগ দিচ্ছেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে মস্তিষ্ক সেই তথ্য গ্রহণে অক্ষম থাকে।এ কারণেই ঘুমহীন অবস্থায় পড়াশোনা করা বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ফলপ্রসূ হয় না।

৪০ শতাংশ কমে যাওয়া মানে বাস্তবে কী?

এই সংখ্যাটির তাৎপর্য বোঝার জন্য গবেষণার একটি পরীক্ষামূলক দিক গুরুত্বপূর্ণ। একদল মানুষকে সারারাত জাগিয়ে রাখা হয়, আরেক দলকে স্বাভাবিকভাবে প্রায় ৮ ঘণ্টা ঘুমাতে দেওয়া হয়। পরদিন দুই দলকেই একই ধরনের নতুন তথ্য শেখানো হয়। ফলাফল ছিল চোখে পড়ার মতো। যারা সারারাত জেগেছিল, তারা প্রায় অর্ধেক তথ্যই সঠিকভাবে মনে রাখতে পারেনি। অর্থাৎ তারা শুধু কম শিখছিল না, তারা কার্যত শেখার দৌড়ে অনেক পিছিয়ে পড়ছিল। 

একজন শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে এর মানে হতে পারে পরীক্ষার হলে জানা বিষয় ভুলে যাওয়া। একজন চাকরিজীবীর ক্ষেত্রে এর মানে হতে পারে হিসাবের ভুল, সিদ্ধান্তে গাফিলতি বা বড় কোনো পেশাগত ভুল। দীর্ঘমেয়াদে এই ঘুমহীনতা কর্মদক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস, দুটোকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।

কফি কেন সমস্যার সমাধান নয়?

অনেকেই ভাবেন, ঘুম না হলে কফি বা এনার্জি ড্রিংক খাওয়াই যথেষ্ট। সত্যি বলতে, ক্যাফেইন সাময়িকভাবে চোখ খুলে রাখতে পারে, কিন্তু এটি মস্তিষ্কের ক্ষতিগ্রস্ত স্মৃতিপ্রক্রিয়া ঠিক করতে পারে না। কফি মস্তিষ্ককে জাগ্রত রাখে, কিন্তু হিপোক্যাম্পাসের ইনবক্স খালি করে না। ফলে আপনি জেগে থাকলেও শেখার ক্ষমতা আগের মতো ফেরে না। এটা অনেকটা এমন যে কম্পিউটার চালু আছে, কিন্তু হার্ডডিস্ক ভর্তি হওয়ায়, নতুন ফাইল সেভ করা যাচ্ছে না।

আরেকটি ভুল ধারণা হলো, এক রাত কম ঘুমালে পরের রাতে বেশি ঘুমালেই সব ঠিক হয়ে যাবে। বাস্তবে বিষয়টি এতটাও সহজ নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এক রাতের ঘুমহীনতার প্রভাব অনেক সময় পরদিনও রয়ে যায়। মনোযোগ, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং স্মৃতিধারণ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরে। যারা নিয়মিত কম ঘুমান, তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা জমতে থাকে। একসময় এটি সাময়িক নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির দিকে নিয়ে যায়।

নিয়মিত কম ঘুমালে শেখার ক্ষমতার পাশাপাশি, মস্তিষ্কের কোষও ঝুঁকির মুখে পড়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে পর্যাপ্ত ঘুম না হলে স্নায়ুকোষের মধ্যে যোগাযোগ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এতে স্মৃতিভ্রংশ, মনোযোগের সমস্যা ও মানসিক ক্লান্তি স্থায়ী রূপ নিতে পারে।এছাড়া ঘুমের অভাব মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে। উদ্বেগ, খিটখিটে মেজাজ ও মানসিক চাপ বেড়ে যায়। ফলে কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবন হয়  প্রভাবিত।

পরীক্ষার আগে সারারাত জেগে পড়াশোনা করা বহু শিক্ষার্থীর কাছে খুবই সাধারণ দৃশ্য। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, এটি নিজের ক্ষতি নিজেই করার মতো। পড়া শেষ হলেও মস্তিষ্ক যদি তথ্য সংরক্ষণই না করতে পারে, তাহলে সেই পড়া কোনো কাজে আসবে না।

একই কথা প্রযোজ্য কর্মজীবনের ক্ষেত্রেও। বড় প্রেজেন্টেশন, গুরুত্বপূর্ণ মিটিং বা সিদ্ধান্তের আগের রাতে নির্ঘুম থাকা মানে নিজের পারফরম্যান্স ৩০–৪০ শতাংশ কমিয়ে ফেলা।

মস্তিষ্ক সচল রাখতে কী করা জরুরি?

ঘুমকে বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন হিসেবে দেখতে শিখতেই হবে। মস্তিষ্ককে সুস্থ ও কার্যকর রাখতে কিছু বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ৭–৮ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করা শুধু শরীরের বিশ্রামের জন্য নয়, মস্তিষ্কের তথ্য সংরক্ষণের জন্য অপরিহার্য। ঘুমানোর আগে অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম কমানো জরুরি।কারণ ফোন বা ল্যাপটপের আলো মস্তিষ্ককে ঘুমের সংকেত পেতে বাধা দেয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কোনো বড় কাজের আগের রাতে একটানা না জেগে অন্তত কিছুটা ঘুমিয়ে নেওয়া। এতে শেখা তথ্য আরও পরিষ্কারভাবে মনে থাকে এবং আত্মবিশ্বাসও বাড়ে।

ঘুম কোনো অলসতার প্রতীক নয়। এটি মস্তিষ্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়া। ঘুমই সেই সময়, যখন মস্তিষ্ক দিনের সব তথ্য বাছাই করে, দরকারি জিনিস সংরক্ষণ করে এবং অপ্রয়োজনীয় অংশ ঝেড়ে ফেলে। এক রাতের ঘুমহীনতা হয়তো তৎক্ষণাৎ ভয়াবহ মনে হয় না ঠিকই কিন্তু এর প্রভাব নীরবে কাজ করে।

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

❤️
Love
0
(0.00 / 0 total)
👏
Clap
0
(0.00 / 0 total)
🙂
Smile
0
(0.00 / 0 total)
😞
Sad
0
(0.00 / 0 total)

মন্তব্যসমূহ

এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।


সম্পর্কিত নিউজ