মেনোপজের পর যে পরিবর্তনগুলো অবহেলা করলে হতে পারে গুরুতর জটিলতা!

মেনোপজের পর যে পরিবর্তনগুলো অবহেলা করলে হতে পারে গুরুতর জটিলতা!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

সাধারণত শারীরবৃত্তীয় স্তরে, ডিম্বাশয়ের ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরন হরমোনের উৎপাদন হ্রাসের সাথে সম্পর্কিত একটি স্বাভাবিক পরিবর্তন হলো মেনোপজ। মেনোপজকে অনেক নারীই জীবনের একটি স্বাভাবিক অধ্যায় বলে এড়িয়ে যান। মাসিক বন্ধ হওয়াকেই যেন এই পর্যায়ের একমাত্র ঘটনা বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে, মেনোপজ কেবল একটি জৈবিক পরিবর্তনই নয়, এটি নারীর শরীর ও মনে দীর্ঘস্থায়ী রূপান্তরের সূচনাও। এই সময় শরীরে যে পরিবর্তনগুলো ঘটে, সেগুলোর অনেকটাই চুপচাপ এবং ধীরে ধীরে এগোয় এবং শুরুতে তেমন সমস্যা মনে হয় না হলেও এসব পরিবর্তন উপেক্ষা করলে ভবিষ্যতে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে।

মেনোপজ সেই সময়কে বোঝায়, যখন মাসিক স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়, যা নারীদের প্রজনন পর্যায়ের সমাপ্তিকে নির্দেশ করে। এটি সাধারণত ৪৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সের মধ্যে ঘটে, যদিও সঠিক সময় পরিবর্তিত হতে পারে। যারা তামাক সেবন করেন তাদের ক্ষেত্রে এটি আগে ঘটতে পারে। অন্যান্য কারণগুলির মধ্যে রয়েছে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে উভয় ডিম্বাশয় অপসারণ , কিছু ধরণের কেমোথেরাপি , অথবা হরমোনের মাত্রা হ্রাসের দিকে পরিচালিত করে এমন কিছু।

মেনোপজের আগের বছরগুলিতে, একজন মহিলার মাসিক সাধারণত অনিয়মিত হয়ে যায় অর্থাৎ সময়কাল দীর্ঘ বা কম হতে পারে, অথবা প্রবাহের পরিমাণে হালকা বা ভারী হতে পারে। মেনোপজের ফলে ত্বক পাতলা এবং শুষ্ক হয়ে যায়। কারণ মেনোপজের প্রথম পাঁচ বছরে ত্বকের ৩০% কোলাজেন নষ্ট হয়ে যায়। 

মেনোপজের পরে নারীর শরীরে হরমোনের ভারসাম্য স্থায়ীভাবে বদলে যায়। এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়ে হাড়, হৃদ্‌যন্ত্র, মস্তিষ্ক, ত্বক, ওজন এমনকি আবেগ ও আত্মবিশ্বাসের ওপরও। তাই এই সময়ের সংকেতগুলো বোঝা এবং গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মেনোপজের পর নারীর শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এই হরমোন শুধু প্রজনন ব্যবস্থার সঙ্গেই যুক্ত নয়, এটি হাড়ের ঘনত্ব, রক্তনালির নমনীয়তা, মস্তিষ্কের কার্যকারিতা এবং ত্বকের স্বাস্থ্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ইস্ট্রোজেন কমে যাওয়ার ফলে শরীরের অনেক সুরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। সমস্যা হলো, এই পরিবর্তনগুলো একদিনে হয় না, ধীরে ধীরে ঘটে। ফলে অনেক নারী বুঝতেই পারেন না যে শরীর ভেতরে ভেতরে নতুন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে।

মেনোপজ-পরবর্তী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অবহেলিত পরিবর্তন হলো হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া। ইস্ট্রোজেন হাড়কে শক্ত রাখতে সাহায্য করে। এই হরমোনই যখন কমে যায় তখন হাড় থেকে ক্যালসিয়াম দ্রুত ক্ষয় হতে শুরু করে। প্রথম দিকে এর কোনো ব্যথা বা দৃশ্যমান লক্ষণ থাকে না। কিন্তু কয়েক বছর পর হঠাৎ পড়ে গিয়ে হাড় ভেঙে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে। অনেক সময় সামান্য আঘাতেই কবজি, কোমর বা মেরুদণ্ডে ফাটল দেখা দেয়। এই অবস্থাকে আর আগের মতো সহজে ঠিক করা সম্ভব হয় না। এই কারণে মেনোপজের পর নিয়মিত হাড়ের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকা, চলাফেরা ও খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি।

মেনোপজের আগে নারীদের হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কমই থাকে। এর একটি বড় কারণ হলো ইস্ট্রোজেন। এই হরমোন রক্তনালিকে নমনীয় রাখে এবং ক্ষতিকর কোলেস্টেরল জমা হতে দেয় না। মেনোপজের পর ইস্ট্রোজেন কমে যাওয়ার ফলে রক্তনালি ধীরে ধীরে শক্ত হতে শুরু করে। এর সঙ্গে যদি ওজন বাড়ে, রক্তচাপ বা রক্তে চর্বির মাত্রা বাড়ে, তাহলে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কয়েকগুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। অনেক নারী এটিকে বয়সজনিত সাধারণ সমস্যা ভেবে উপেক্ষা করতে থাকেন । কিন্তু এই সময় থেকেই হৃদ্‌যন্ত্রের যত্ন নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে জটিলতা দেখা দিতে পারে।

মেনোপজের পর অনেক নারী লক্ষ্য করেন, খাবার কম খেলেও ওজন বাড়ছে, বিশেষ করে পেট ও কোমরের চারপাশে। এটি কেবল জীবনযাপনের পরিবর্তনের কারণে নয়, হরমোনের পরিবর্তন এর বড় একটি কারণ। এই সময় শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। ফলে আগের মতো ক্যালরি পোড়ে না। পেটের চারপাশে জমা হওয়া চর্বি বাহ্যিক সমস্যার পাশাপাশি ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকিও বাড়ায়। ওজন বৃদ্ধিকে হালকাভাবে নেওয়া মানে ভবিষ্যতের বহু রোগকে আমন্ত্রণ জানানো।

মেনোপজের পর ঘুমের সমস্যা অনেক নারীর জীবনের নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে। হঠাৎ গরম লাগা, রাতে ঘাম, অস্থিরতা বা বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া ইত্যাদি  সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে মানসিক ও শারীরিক শক্তি কমিয়ে দেয়। ঘুমের অভাব ক্লান্তি বাড়ায় এবং  স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকেও দুর্বল করে ফেলে। দীর্ঘদিন ঠিকমতো ঘুম না হলে মানসিক চাপ ও বিষণ্নতার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায় ।

মেনোপজ-পরবর্তী সময়ে অনেক নারী নিজের মধ্যেই পরিবর্তন টের পান। অল্পতেই রাগ, মন খারাপ, অস্থিরতা বা হঠাৎ কান্না পাওয়া, এসব অনুভূতি আসতে পারে। সমস্যা হলো, সমাজে এখনো মানসিক পরিবর্তনকে স্বাভাবিক মেজাজ খারাপ বলে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা আছে। কিন্তু হরমোনের পরিবর্তনের কারণে মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যও বদলে যায়। এর প্রভাব পড়ে আবেগ ও মানসিক স্থিতির ওপর। এই পরিবর্তনগুলোকে গুরুত্ব না দিলে ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে, সামাজিক সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে।

অনেক নারী  অভিযোগ করেন,আগের মতো আর সবকিছু মনে থাকে না। মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে গেছে। এটিকে অনেকেই বয়সজনিত সাধারণ বিষয় বলে মেনে নেন। কিন্তু বাস্তবে ইস্ট্রোজেন মস্তিষ্কের স্মৃতি ও শেখার সঙ্গে যুক্ত অংশগুলোর কার্যকারিতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। হরমোন কমে গেলে সাময়িকভাবে এই ক্ষমতাগুলো দুর্বল হতে পারে। যদি এই পরিবর্তনের সঙ্গে ঘুমের সমস্যা ও মানসিক চাপ যোগ হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

মেনোপজের পর ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, আগের মতো উজ্জ্বল না থাকা বা চুল পাতলা হয়ে যাওয়ার বিষয়টি অনেক নারীই লক্ষ্য করেন। এটি কেবল বয়সের ছাপ নয়, হরমোনের পরিবর্তনের প্রতিফলন। ইস্ট্রোজেন ত্বকের আর্দ্রতা ও কোলাজেন ধরে রাখতে সাহায্য করে। এই হরমোন কমে গেলে ত্বক দ্রুত তার নমনীয়তা হারাতে শুরু করে। চুলের গোড়াও দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এই পরিবর্তনগুলো বাহ্যিক মনে হলেও ভেতরের হরমোনগত পরিবর্তনের স্পষ্ট সংকেত বহন করে।

মেনোপজের পর অনেক নারী যৌনস্বাস্থ্যে পরিবর্তন অনুভব করেন।যেমন: শুষ্কতা, অস্বস্তি বা আগ্রহ কমে যাওয়া। সমাজে এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলার প্রবণতাও কম। ফলে অনেকেই চুপচাপ সমস্যাটি সহ্য করেন। কিন্তু এই পরিবর্তন নারীর আত্মবিশ্বাস ও দাম্পত্য জীবনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিষয়টি লুকিয়ে রাখলে মানসিক দূরত্ব ও একাকিত্ব বাড়তে পারে।

কেন এই পরিবর্তনগুলো উপেক্ষা করা বিপজ্জনক?

মেনোপজের পরের পরিবর্তনগুলো আলাদা আলাদা মনে হলেও এগুলো পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। হাড় ক্ষয়, হৃদ্‌রোগ, ওজন বৃদ্ধি, মানসিক অস্থিরতা ইত্যাদি মিলিয়ে একটি জটিল চক্র তৈরি হয়। এই চক্র ভাঙতে হলে পরিবর্তনগুলোকে সময়মতো চেনা জরুরি। উপেক্ষা করলে সমস্যা জমতে থাকে, আর একসময় তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

এই সব পরিবর্তনের কথা জানার অর্থ আতঙ্কিত হওয়া নয়। বরং সচেতন হওয়া। মেনোপজ মানে জীবনের শেষ নয়, এটি জীবনের একটি নতুন অধ্যায়। এই সময় নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নারীর জীবনমান অনেকটাই ভালো রাখতে পারে। নিজের শরীরের সংকেতগুলো বুঝে নেওয়াই সবচেয়ে বড় শক্তি।

মেনোপজ কোনো দুর্বলতা নয়। সঠিক যত্ন ও সচেতনতা থাকলে এই সময়টাই হতে পারে আত্মপরিচর্যা ও নতুন শক্তি অর্জনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

❤️
Love
0
(0.00 / 0 total)
👏
Clap
0
(0.00 / 0 total)
🙂
Smile
0
(0.00 / 0 total)
😞
Sad
0
(0.00 / 0 total)

মন্তব্যসমূহ

এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।


সম্পর্কিত নিউজ