শুধু শীতেই কেন উজ্জীবিত হয়ে উঠে নলেন গুড়ের স্বাদ? রহস্য জানেন!
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
বাংলার শীত মানেই শুধু ঠান্ডা হাওয়া বা কুয়াশা নয়। শীত মানেই রসনায় ফিরে আসা এক চেনা উষ্ণতা।আর সেই উষ্ণতার নাম নিলেই প্রথমেই মনে পড়ে নলেন গুড়ের সন্দেশ। দ্বাদশ শতাব্দীতে শ্রীধর দাসের ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’ থেকে শুরু করে নীহাররঞ্জন রায়ের ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’, সবখানেই হেমন্তের নতুন গুড় বা নলেন গুড়ের জয়গান গাওয়া হয়েছে। শত বছরের সেই ঐতিহ্য আর নলেন গুড়ের সেই চিরচেনা সুবাস আজও অম্লান হয়ে আছে নড়াইলের ঐতিহ্যবাহী ‘কার্ত্তিক কুন্ডু মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’-এ। এই মিষ্টির খ্যাতি এখন আর কেবল দেশের মানচিত্রের ভেতর সীমাবদ্ধ নেই। এর অতুলনীয় স্বাদ ও মনকাড়া সুঘ্রাণ সীমানা ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছে প্রবাসীদের কাছেও। বছরের অন্য সময়ে মিষ্টির অভাব না থাকলেও শীত এলেই নলেন গুড়ের সন্দেশ আলাদা হয়ে ওঠে। কারণ, এটি ঋতু-নির্ভর, সময়-নির্ভর এবং একেবারেই প্রকৃতি-নির্ভর এক স্বাদ-অনুভব। শীত পেরোলেই এর স্বাদ যেমন ম্লান হয়, তেমনই হারিয়ে যায় তার আসল পরিচয়টিও।
নলেন গুড় তৈরি হয় খেজুর গাছের রস থেকে। এই রস সংগ্রহের কাজটি প্রকৃতিগতভাবেই শীতকালনির্ভর। শীতকালে রাতের তাপমাত্রা কম থাকে। বাতাস শুষ্ক ও ঠান্ডা হয়। খেজুর রস ধীরে ধীরে ঝরে। এই পরিবেশে সংগ্রহ করা রস হয় স্বচ্ছ, হালকা মিষ্টি এবং গন্ধে অনন্য। এই রস জ্বাল দিয়েই তৈরি হয় নলেন গুড়। গ্রীষ্ম বা বর্ষাকালে খেজুর গাছ থাকলেও রসের স্বাদ, ঘনত্ব ও সুবাস কোনোটাই শীতের মতো হয় না। ফলে নলেন গুড়ের আসল চরিত্র তৈরি হয় শুধুই শীতে।
শীতকালের খেজুর রসে প্রাকৃতিক শর্করার অনুপাত থাকে ভারসাম্যপূর্ণ। অতিরিক্ত তাপ না থাকায় রস দ্রুত টক হয় না, ফারমেন্টেশন শুরু হয় দেরিতে। ফলে গুড়ের স্বাদ হয় গভীর,তিক্ততা থাকে না এবং প্রাকৃতিক ক্যারামেলের মতো সুবাস তৈরি হয়।
এই সুবাসই নলেন গুড়কে অন্য সব গুড় থেকে আলাদা করে। আর সন্দেশের মতো দুধভিত্তিক মিষ্টিতে এই সুবাসই হয়ে ওঠে মূল আকর্ষণ।
আবার সন্দেশ তো তৈরি হয় ছানা থেকে, যা নিজেই এক সংবেদনশীল উপাদান। ছানার সঙ্গে নলেন গুড় মেশালে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য দরকার। শীতকালে ছানা দ্রুত নষ্ট হয় না, অতিরিক্ত আর্দ্রতা থাকে না, গুড় সহজে ছানার সঙ্গে মিশে যায়। ফলে সন্দেশ হয় মোলায়েম, অতিরিক্ত চটচটে নয়, স্বাদে গভীর কিন্তু ভারী নয়। এই ভারসাম্য গরমকালে পাওয়া বেশ কঠিন।
তাছাড়া নলেন গুড় তাপমাত্রার প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। বেশি গরমে এর স্বাদ বদলে যায়, গন্ধ নষ্ট হয়। শীতের ঠান্ডা আবহাওয়া, গুড়ের সুবাস ধরে রাখে এবং সন্দেশের টেক্সচার স্থিতিশীল রাখে।
স্বাদ শুধু খাবারের নয়, খাওয়ার সময় মানুষের শরীরও ভূমিকা রাখে। শীতকালে জিভের স্বাদগ্রাহী কোষ বেশি সংবেদনশীল থাকে। অতিরিক্ত মিষ্টি বিরক্তিকর লাগে না। উষ্ণ এবং গভীর স্বাদ বেশি ভালো লাগে। নলেন গুড়ের সন্দেশ তাই শীতেই এটি সবচেয়ে তৃপ্তিদায়ক।
কেন শীতের বাইরে নলেন গুড়ের সন্দেশ মানসম্মত হয় না?
শীত ছাড়া অন্য সময় খেজুর রসের মান কম থাকে। সংরক্ষিত বা প্রক্রিয়াজাত গুড় ব্যবহার করতে হয়। তাই স্বাদে কৃত্রিমতা আসে। ফলে সন্দেশ হয় অতিরিক্ত মিষ্টি, সুবাসহীন। আসল নলেন গুড়ের বৈশিষ্ট্য আর থাকে না। এই কারণেই প্রকৃত মিষ্টান্নকাররাও শীতের বাইরে নলেন গুড়ের সন্দেশ তৈরি করতে অনাগ্রহী থাকে।
বাংলার মিষ্টি সংস্কৃতি কখনোই সারা বছর এক স্বাদে চলেনি। প্রতিটি ঋতুর নিজস্ব মিষ্টি আছে। শীতের জন্য নলেন গুড়, নানা রকমের পিঠে, সন্দেশ ইত্যাদি। এই ঋতুচক্র ভেঙে দিলে স্বাদ যেমন নষ্ট হয়, তেমনই হারিয়ে যায় সংস্কৃতির বৈচিত্র্যও।
ভবা পাগলার সেই কালজয়ী সুর- ‘খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন’, যেন শীতের আগমনী বার্তাই বয়ে নিয়ে আসে। কুয়াশার চাদর মোড়ানো ভোরে যখন হিমের পরশ লাগে, তখনই বাংলার প্রকৃতিতে শুরু হয় রস সংগ্রহের উৎসব। আর সেই রসের সৌরভে ম ম করে ওঠে চারপাশ।
আপনার প্রতিক্রিয়া জানান
মন্তব্যসমূহ
এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।