শীতের কুয়াশা কি পানির সমাধান হতে পারে?

শীতের কুয়াশা কি পানির সমাধান হতে পারে?
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

শীতের ভোরে চারপাশ ঢেকে যায় সাদা কুয়াশায়। গাছের পাতা ভিজে থাকে, ঘাসে জমে ছোট ছোট জলবিন্দু, বাতাসে থাকে স্যাঁতসেঁতে শীতলতা। এই দৃশ্য দেখে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, এই কুয়াশা কি আসলে পানির বিকল্প? বিশেষ করে শীতকালে, যখন বৃষ্টি কম হয়, তখন কি কুয়াশাই প্রকৃতির পানির ঘাটতি পূরণ করে? প্রশ্নটি শুধু কৌতূহলের নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কৃষি, পরিবেশ ও পানিচক্রের গুরুত্বপূর্ণ সব বাস্তবতা। শীতের কুয়াশা দেখতে জলীয় মনে হলেও এর ভূমিকা, সীমাবদ্ধতা ও কার্যকারিতা বোঝা খুব জরুরি।

কুয়াশা আসলে কী?

কুয়াশা কোনো বৃষ্টি নয়। এটি মূলত বাতাসে ভাসমান অসংখ্য সূক্ষ্ম পানি কণা। শীতকালে রাতের তাপমাত্রা কমে গেলে বাতাসে থাকা জলীয় বাষ্প ঠান্ডা হয়ে ক্ষুদ্র পানির বিন্দুতে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ঘনীভবন। এর ফলেই সৃষ্টি হয় কুয়াশা। অর্থাৎ কুয়াশায় পানি আছে ঠিকই, কিন্তু সেই পানি, মাটিতে গভীরভাবে প্রবেশ করে না। ধারাবাহিকভাবে পড়ে না এবং  তা পরিমাণে অত্যন্ত সীমিত। এই কারণেই কুয়াশাকে সরাসরি বৃষ্টির সঙ্গে তুলনা করা যায় না।

কুয়াশা বনাম বৃষ্টি!

বৃষ্টির পানি সরাসরি মাটিতে পড়ে, মাটির গভীরে ঢুকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রিচার্জ করে,যা কুয়াশা করতে পারে না।কুয়াশার পানি গাছের পাতা ও ঘাসের ওপর জমে থাকে। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বাষ্প হয়ে উড়ে যায়।বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা মাটিতে পৌঁছানোর আগেই উবে যায়। তাই পানি চক্রের দৃষ্টিকোণ থেকে কুয়াশা কখনোই পূর্ণাঙ্গ পানির উৎস  হতে পারে না।


গাছপালার জন্য কুয়াশার ভূমিকার বিষয়টি জটিল ও আকর্ষণীয়ও বটে। কুয়াশা সরাসরি পানির বিকল্প না হলেও, কিছু ক্ষেত্রে এটি সহায়ক পানি সূত্র হিসেবে কাজ করে। শীতকালে অনেক গাছ পাতার মাধ্যমে কুয়াশার পানি শোষণ করতে পারে। মাটির আর্দ্রতা কিছুটা ধরে রাখতে পারে। এতে অতিরিক্ত পানির প্রয়োজন সাময়িকভাবে কমতে পারে। বিশেষ করে ছোট গাছ, ঘাস ও শীতকালীন ফসল কুয়াশার স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ থেকে উপকার পায়।

কৃষিতে কুয়াশা উপকারী না কি ক্ষতিকর? 

শীতের কুয়াশা কৃষির জন্য একটি দ্বিমুখী বাস্তবতা।

উপকারের দিক চিন্তা করলে -

⇨ মাটির উপরিভাগে আর্দ্রতা বজায় থাকে।

⇨ হালকা সেচের প্রয়োজন কমে।

⇨ কিছু শীতকালীন সবজি ও ফসল আরামদায়ক পরিবেশ পায়।


আর ক্ষতির দিকে তাকালে-

⇨ অতিরিক্ত কুয়াশায় ছত্রাক ও রোগের ঝুঁকি বাড়ে।

⇨ সূর্যালোক কমে গিয়ে ফসলের বৃদ্ধি ধীর হয়।

⇨ দীর্ঘস্থায়ী কুয়াশা ফলন ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।


অর্থাৎ, স্থায়িত্ব ও তীব্রতার ওপর নির্ভর করে কুয়াশা কখনো সহায়ক, কখনো চ্যালেঞ্জ।


অনেকেই মনে করেন, কুয়াশা থাকলে জমিতে পানি দেওয়ার দরকার নেই। বাস্তবে এটি আংশিক সত্য। কুয়াশা মাটির উপরের স্তর ভিজিয়ে রাখে।বাষ্পীভবনের হার কমায় এবং মাটির ভেতরের পানি দ্রুত শুকিয়ে যেতে দেয় না। কিন্তু এটি মাটির গভীর স্তরে পানি সরবরাহ করতে পারে না। তাই দীর্ঘ সময় সেচ বন্ধ রাখলে মাটির নিচের অংশ শুষ্ক হয়ে পড়তে পারে।

বিশ্বের কিছু বিশেষ অঞ্চলে কুয়াশা সত্যিই পানির বিকল্প হিসেবে কাজ করে।পাহাড়ি বা উপকূলীয় এলাকায়, যেখানে নিয়মিত ঘন কুয়াশা হয়, সেখানে উদ্ভিদ ও প্রাণী কুয়াশার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। কিন্তু সমতল অঞ্চল ও কৃষিভিত্তিক এলাকায় এই সুবিধা সীমিত। সেখানে কুয়াশা সহায়ক হতে পারে, কিন্তু প্রধান পানি সূত্র নয়।

শীতকালে কুয়াশা কেন বেশি চোখে পড়ে?

শীতকালে বাতাস ঠান্ডা ও ভারী হয়ে যায়। বাতাসের জলীয় বাষ্প সহজেই ঘনীভূত হয়। একই সঙ্গে বাতাসে গতি কম থাকে, ফলে কুয়াশা ছড়িয়ে না গিয়ে জমে থাকে। এই কারণেই শীতকালে কুয়াশা বেশি দৃশ্যমান হলেও, এর পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়ে না, শুধু উপস্থিতি চোখে পড়ে বেশি।

বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কুয়াশার ধরনও বদলাচ্ছে। কোথাও কুয়াশা কমছে, কোথাও আবার অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে কৃষি পরিকল্পনা আরও জটিল হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, ভবিষ্যতে কুয়াশার ওপর নির্ভর না করে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

শীতের কুয়াশা দেখতে জলীয় হলেও এটি প্রকৃত অর্থে পানির বিকল্প নয়। এটি বৃষ্টির জায়গা নিতে পারে না, সেচের দায়িত্ব পালন করতে পারে না। তবে একে একেবারে গুরুত্বহীন ভাবাও ভুল। কুয়াশা পরিবেশের আর্দ্রতা বজায় রাখে।গাছপালাকে সাময়িক স্বস্তি দেয়। শীতকালীন প্রাকৃতিক ভারসাম্যে ভূমিকা রাখে। অতএব কুয়াশা পানি নয়, কিন্তু পানির গল্পে একটি নীরব সহকারী চরিত্র।

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

❤️
Love
0
(0.00 / 0 total)
👏
Clap
0
(0.00 / 0 total)
🙂
Smile
0
(0.00 / 0 total)
😞
Sad
0
(0.00 / 0 total)

মন্তব্যসমূহ

এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।


সম্পর্কিত নিউজ