প্রোগ্রামিং-এ একটি ভুল মানেই হাজার সমস্যা, ডিবাগিং ছাড়া রক্ষা নেই!

প্রোগ্রামিং-এ একটি ভুল মানেই হাজার সমস্যা, ডিবাগিং ছাড়া রক্ষা নেই!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

প্রোগ্রাম ঠিকমতো লেখা শেষ, কোড রান করানো হলো, আর ঠিক তখনই স্ক্রিনে ভেসে উঠল অপ্রত্যাশিত ফলাফল বা লাল রঙের এরর বার্তা। এই অভিজ্ঞতা প্রায় সব প্রোগ্রামারেরই পরিচিত। কোড লেখা শেখার পর যে দক্ষতাটি সবচেয়ে বেশি সময়, ধৈর্য আর বিশ্লেষণ দাবি করে, তার নাম ডিবাগিং। অনেকেই মনে করেন ডিবাগিং মানে শুধু এরর ঠিক করা। বাস্তবে ডিবাগিং হলো সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করার একটি প্রক্রিয়া।

ডিবাগিং কী এবং কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ?

ডিবাগিং হলো কোনো প্রোগ্রামে থাকা ভুল বা অপ্রত্যাশিত আচরণ শনাক্ত, বিশ্লেষণ এবং সংশোধনের প্রক্রিয়া। এই ভুল হতে পারে স্পষ্ট এরর, আবার হতে পারে এমন কোনো সমস্যা যেখানে প্রোগ্রাম চললেও ফলাফল ভুল আসে। 

একটি সফটওয়্যার যত বড় হয়, ততই ভুলের সম্ভাবনা বাড়ে। ছোট ভুল বড় আর্থিক বা নিরাপত্তাজনিত ক্ষতির কারণ হতে পারে। কোডের মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা ডিবাগিংয়ের ওপর নির্ভর করে। ভালো প্রোগ্রামার মানেই কিন্তু কম ভুল করা নয়, বরং ভুল হলে দ্রুত ও সঠিকভাবে তা ধরতে পারা।

১৯৪০ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি মার্ক ২ ( Mark ||) কম্পিউটার সফটওয়্যার এর ত্রুটি দেখা দেয়ার মাধ্যমে মূলত ডিবাগিং শব্দটির ব্যাবহার শুরু হয়। এরপর থেকে ডিবাগিংকে প্রোগ্রামাররা ব্যাবহার করতে শুরু করে এবং তা এখনও অব্যাহত। 

বাগ কীভাবে জন্ম নেয়?

বাগ হঠাৎ আকাশ থেকে পড়ে না। বেশিরভাগ বাগের পেছনে কিছু সাধারণ কারণ থাকে।

১. লজিক্যাল ভুল: শর্ত ভুল লেখা, লুপ ভুলভাবে চলা, ভুল অ্যালগরিদম ব্যবহার- এসব ক্ষেত্রে কোড রান করে, কিন্তু আউটপুট ঠিক আসে না।

২. সিনট্যাক্স ভুল: ভাষার ব্যাকরণগত ভুল। যেমন বন্ধনী না দেওয়া, কিওয়ার্ড ভুল লেখা। এগুলো সাধারণত কম্পাইল বা রান টাইমেই ধরা পড়ে।

৩. ডাটা সম্পর্কিত সমস্যা: ভুল টাইপের ডাটা ব্যবহার, শূন্য দিয়ে ভাগ, খালি ভ্যালু নিয়ে কাজ করা।

৪. ধারণাগত ভুল: সমস্যা ঠিকভাবে না বোঝা। কোড ঠিক লেখা হলেও সমস্যার সমাধান ভুল পথে এগোয়। ডিবাগিং শেখার প্রথম ধাপ হলো, বাগকে শত্রু না ভেবে, তার উৎস বোঝার চেষ্টা করা।

ডিবাগিংয়ের সময় সবচেয়ে বড় বাধা প্রযুক্তিগত নয়, মানসিক। তাড়াহুড়া করলে বাগ বাড়ে। আবার বিরক্ত হলে ছোট বিষয়গুলোও চোখ এড়িয়ে যায়। অনুমান করে পরিবর্তন করলে আবার নতুন বাগ জন্ম নেয়। ডিবাগিং মানে হলো ধীর, যুক্তিভিত্তিক ও ধাপে ধাপে এগোনো। একবারে ঠিক করে ফেলার মনোভাব ডিবাগিংয়ের বড় শত্রু।

ডিবাগিংয়ের পদ্ধতি:

১। সমস্যাটি পরিষ্কারভাবে পুনরুত্পাদন করা। প্রথমেই বুঝতে হবে ঠিক কখন সমস্যা হচ্ছে, সব সময় হচ্ছে, নাকি নির্দিষ্ট অবস্থায়। ইনপুট বদলালে আচরণ বদলায় কি না। যে সমস্যাকে বারবার ঘটানো যায় না, তাকে ঠিক করাও কঠিন।

২। এরর বার্তা মনোযোগ দিয়ে পড়া। অনেক প্রোগ্রামার সবচেয়ে বড় ভুলটি করেন, এরর বার্তা না পড়ে এড়িয়ে যান। অথচ এরর বার্তায় থাকে কোন লাইনে সমস্যা, কী ধরনের সমস্যা, কোন ভ্যারিয়েবল বা ফাংশনে সমস্যা। এরর বার্তা আপনার শত্রু নয়, বরং প্রথম সূত্র।

৩। অনুমান নয়, প্রমাণের ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। ডিবাগিংয়ে আন্দাজের কোনো জায়গা নেই। প্রতিটি পরিবর্তনের আগে প্রশ্ন করতে হবে- কেন আমি এটা পরিবর্তন করছি! কী প্রমাণ আছে যে এখানেই সমস্যা! একবারে অনেক পরিবর্তন করলে বোঝা যায় না, কোনটি কাজ করল।

৪। কোডকে ছোট অংশে ভেঙে দেখা। বড় প্রোগ্রামে একসঙ্গে সব দেখা অসম্ভব। তাই সন্দেহজনক অংশ আলাদা করুন। একেকটি ফাংশন আলাদা করে যাচাই করুন। প্রয়োজনে কিছু অংশ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখুন। একে বলা হয় সমস্যার পরিসর সংকুচিত করা।

৫। ভ্যারিয়েবল ও ডাটার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা। ডিবাগিংয়ের সময় জানতে হবে, এই মুহূর্তে ভ্যারিয়েবলের মান কী! লুপ কতবার চলছে! শর্তটি সত্য না মিথ্যা! এখানেই ডিবাগিং টুল বা লগ ব্যবহার সবচেয়ে কার্যকর হয়।

প্রিন্ট ডিবাগিং: অনেক ভাষায় এখনো সবচেয়ে ব্যবহৃত কৌশল হলো নির্দিষ্ট জায়গায় মান প্রিন্ট করা। এতে বোঝা যায়-  প্রোগ্রাম কোন পথ দিয়ে যাচ্ছে বা কোন জায়গায় মান অপ্রত্যাশিত হয়ে যাচ্ছে। এই পদ্ধতি সহজ হলেও অগোছালোভাবে ব্যবহার করলে বিভ্রান্তি বাড়ায়। তাই স্পষ্ট বার্তা দিয়ে প্রিন্ট করা জরুরি।

ডিবাগার টুল ব্যবহার: আধুনিক ডেভেলপমেন্ট পরিবেশে ডিবাগার একটি শক্তিশালী অস্ত্র। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট লাইনে প্রোগ্রাম থামানো যায়। ধাপে ধাপে কোড চালানো যায়। প্রতিটি ধাপে ভ্যারিয়েবলের মান দেখা যায়। ডিবাগার ব্যবহার করলে কোড যেন ধীরে চলা সিনেমার মতো দেখা যায়, যেখানে প্রতিটি ফ্রেম বিশ্লেষণ করা সম্ভব।


ডিবাগিংয়ে সাধারণ ভুল:

⇨ একই ভুল বারবার করা।

⇨ সব কোডে একসঙ্গে পরিবর্তন।

⇨ কাজ করছে না বলে পুরো কোড ফেলে দেওয়া।

⇨ নিজের কোডকে প্রশ্ন না করা।

ডিবাগিং মানে নিজের লেখা কোডকেও সন্দেহ করা শিখে নেওয়া।

ডিবাগিং করার ​সুবিধাসমূহ:

ডিবাগিং ঠিকভাবে করতে পারলে অনেক সুবিধা রয়েছে। যেমন-

⇨ ​গুণমান বৃদ্ধি: ডিবাগিং ভুল ও বাগ সংশোধনের মাধ্যমে সিস্টেমকে আরও কার্যকর ও ইউজার-ফ্রেন্ডলি করে।

⇨ ​সময় সাশ্রয়: সিস্টেম দ্রুত কাজ করে, ফলে ব্যবহারকারীর মূল্যবান সময় বাঁচে।

⇨ ​নিরাপত্তা: কোডের দুর্বলতা দূর করে হ্যাকারদের আক্রমণ থেকে সিস্টেমকে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে।

⇨ ​খরচ হ্রাস: শুরুর দিকেই সমস্যা সমাধান করলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি বা বাড়তি শ্রমের প্রয়োজন হয় না।

ভালোভাবে লেখা কোড মানেই সহজ ডিবাগিং। ভালো কোডের বৈশিষ্ট্য হলো পরিষ্কার নামকরণ, ছোট ফাংশন, কম জটিল শর্ত, যথাযথ মন্তব্য ইত্যাদি। ডিবাগিংয়ের সময় এগুলো সময় বাঁচায়, মানসিক চাপ কমায়।

অনেকে মনে করেন ডিবাগিংয়ে কেউ ভালো, কেউ খারাপ। বাস্তবে ডিবাগিং শেখা যায় অভ্যাসের মাধ্যমে। যদি বিশ্লেষণ করেন তবে যত বেশি ভুল করবেন, তত বেশি শিখবেন। ভুল করা লজ্জার নয়, ভুল থেকে না শেখাটাই বরং আসল ব্যর্থতা।

ডিবাগিং শেখা মানে শুধু এরর ঠিক করা শেখা নয়। এটি শেখায় ধৈর্য, যুক্তি, বিশ্লেষণ এবং সমস্যার গভীরে যাওয়ার ক্ষমতা। আর এই গুণগুলোই একজন সাধারণ কোড লেখককে পরিণত করে দক্ষ সফটওয়্যার নির্মাতায়।
 

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

❤️
Love
0
(0.00 / 0 total)
👏
Clap
0
(0.00 / 0 total)
🙂
Smile
0
(0.00 / 0 total)
😞
Sad
0
(0.00 / 0 total)

মন্তব্যসমূহ

এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।


সম্পর্কিত নিউজ