মন্দা, সংকট, অনিশ্চয়তা-সংকটকালে ব্যবসায় ঘুরে দাঁড়ানোর কৌশল!
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
ব্যবসা শুরু করাটা ঠিক যতটাই সহজ, ব্যবসাক্ষেত্রে সফলভাবে টিকে থাকা টা ঠিক ততটাই কঠিন। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বাজারের অস্থিরতা, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, ভোক্তার আচরণে পরিবর্তন কিংবা হঠাৎ বৈশ্বিক কোনো সংকট - ইতিহাস বলছে, ব্যবসার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসে ঠিক এই সময়গুলোতেই। অনেক প্রতিষ্ঠান এমন চ্যালেঞ্জিং সময়ে হারিয়ে যায়, আবার কিছু ব্যবসা ঠিক তখনই নিজেদের নতুনভাবে গড়ে তোলে। পার্থক্যটা তৈরি করে সিদ্ধান্ত, কৌশল আর সময়োপযোগী মানসিকতা। চ্যালেঞ্জিং সময় মানেই ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস নয়।বরং এটি হতে পারে ব্যবসাকে আরও টেকসই, বুদ্ধিদীপ্ত ও ভবিষ্যতমুখী করে তোলার সুযোগ। প্রশ্ন হলো, সংকটের ভেতর দিয়ে হাঁটার সময় কোন কৌশলগুলো সত্যিই কাজে আসে?
সংকটকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা: চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রথম ধাপটিই হলো সমস্যার প্রকৃত রূপ বোঝতে পারা। অনেক উদ্যোক্তা আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। খরচ একেবারে বন্ধ, কর্মী ছাঁটাই বা বিনিয়োগ পুরোপুরি থামিয়ে দেন। অথচ বাস্তবে সংকট হতে পারে সাময়িক নগদ প্রবাহের সমস্যা, সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাত অথবা ভোক্তার চাহিদায় সামান্য পরিবর্তন। এ সময় প্রয়োজন সংখ্যাভিত্তিক বিশ্লেষণ। যেমন- কোথায় আয় কমছে, কোন খাতে ব্যয় অপ্রয়োজনীয়, কোন পণ্য বা সেবা এখনও চাহিদা ধরে রেখেছে। সঠিক রোগ নির্ণয় ছাড়া চিকিৎসা যেমন ফলপ্রসূ হয় না, তেমনি ভুল বিশ্লেষণে নেওয়া সিদ্ধান্ত ব্যবসাকে আরও ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে।
সংকটকালে ব্যবসার অক্সিজেন হলো নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনা! সংকটের সময়ে লাভ নয়, টিকে থাকাই প্রধান উদ্দেশ্য। আর টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি হলো নগদ অর্থের সঠিক ব্যবহার। অনেক ব্যবসা লাভজনক হয়েও শুধুমাত্র নগদ প্রবাহের ঘাটতিতে বন্ধ হয়ে যায়। এই সময় দরকার অপ্রয়োজনীয় ব্যয় স্থগিত করা, পেমেন্ট সংগ্রহে শৃঙ্খলা আনা, সরবরাহকারীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পরিশোধের সময়সীমা সমন্বয় করা, বড় বিনিয়োগ সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে দৈনন্দিন কার্যক্রম সচল রাখা ইত্যাদি। নগদ অর্থের প্রতিটি সিদ্ধান্ত যেন টিকে থাকার সময়সীমা বাড়ায়,সে চিন্তা নিয়েই এগোতে হয়।
পণ্যের চাহিদা পুনর্মূল্যায়ন: সংকট মানেই ভোক্তার অগ্রাধিকার বদলে যাওয়া। যে পণ্য বা সেবা গতকাল বিলাসিতা ছিল, আজ তা অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠতে পারে। আবার একেবারে সাধারণ কোনো সেবা হঠাৎ অত্যাবশ্যক হয়ে উঠতে পারে। বুদ্ধিমান ব্যবসায়ীরা এই পরিবর্তনগুলো তাড়াতাড়ি ধরতে পারে। তারা বোঝার চেষ্টা করে গ্রাহক এখন কোন সমস্যায় আছে! বিদ্যমান পণ্য বা সেবাকে সামান্য বদলে সেই সমস্যার সমাধান দেয়া যেতে পারে কি না! এই মানসিকতা থেকেই অনেক ব্যবসা নতুন প্যাকেজ, ছোট সংস্করণ, সাশ্রয়ী বিকল্প বা ডিজিটাল সেবা চালু করে সংকট পার করে।
চ্যালেঞ্জিং সময়ে ডিজিটাল রূপান্তর বিলাসিতা নয় বরং বাস্তব প্রয়োজন দাঁড়ায়। ডিজিটাল উপস্থিতি অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার প্রধান অবলম্বন। অনলাইন বিক্রয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ, ডিজিটাল পেমেন্ট, এসব এখন কেবল আধুনিকতার অংশ নয়, বরং টিকে থাকার কৌশল। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবসাকে দেয় কম খরচে বৃহৎ বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ, গ্রাহকের আচরণ বোঝার তথ্য এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা। সংকটে যে ব্যবসা প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে ব্যবহার করতে শেখে, তার পুনরুদ্ধারের গতি সাধারণত দ্রুত হয়।
কর্মীদের সঙ্গে স্বচ্ছ সম্পর্ক: সংকটকালে অনেক ব্যবসা প্রথমেই কর্মী ছাঁটাইয়ের পথে হাঁটে। কখনো এটি অনিবার্য হলেও, সব সময় এটি একমাত্র সমাধান নয়। কারণ অভিজ্ঞ কর্মী হারানো মানে জ্ঞান, দক্ষতা ও আস্থার ক্ষতি। এই সময় প্রয়োজন স্বচ্ছ যোগাযোগ। ব্যবসার বাস্তব অবস্থা কর্মীদের জানানো, তাদের মতামত শোনা এবং একসঙ্গে সমাধানের পথ খোঁজা। এতে অনেক সময় কর্মীরাই ব্যয় সাশ্রয়ের নতুন পথ দেখান। যে প্রতিষ্ঠানে কর্মীরা বোঝেন যে তারা কেবল খরচের খাত নয়, বরং অংশীদার, সেই প্রতিষ্ঠান সংকটেও ভেঙে পড়ে না।
সরবরাহ ব্যবস্থার বিকল্প তৈরি করা: সংকট প্রমাণ করেছে, একটিমাত্র সরবরাহকারী বা একটি বাজারের ওপর নির্ভরতা ব্যবসাকে কতটা দুর্বল করে দিতে পারে। কাঁচামাল হোক বা পরিবহন, যে কোনো এক জায়গায় সমস্যা মানেই পুরো কার্যক্রম থমকে যাওয়া। বাস্তবমুখী কৌশল হলো বিকল্প সরবরাহকারী খোঁজা, স্থানীয় উৎস ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাই এবং মজুত ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য আনা। এতে হয়তো খরচ কিছুটা বেড়ে যায়, কিন্তু ব্যবসার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখা: সংকটকালে নতুন গ্রাহক পাওয়া কঠিন, কিন্তু পুরোনো গ্রাহক ধরে রাখা তুলনামূলক সহজ ও কার্যকর। যারা ইতিমধ্যে আপনার ওপর আস্থা রেখেছে, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করা জরুরি। সময়মতো সেবা, বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতি, সমস্যা হলে দ্রুত জানানো ইত্যাদি ছোট বিষয়গুলোই একটা সময় বড় পার্থক্য গড়ে দেয়। সংকট পেরিয়ে স্বাভাবিক সময় এলে গ্রাহক সেই ব্যবসাকেই মনে রাখে, যে কঠিন সময়েও দায় এড়ায়নি।
নতুন আয়ের পথ খোঁজা: সংকট ব্যবসাকে সৃজনশীল হতে বাধ্য করে। অনেক সময় বিদ্যমান দক্ষতা বা অবকাঠামো ব্যবহার করেই নতুন আয়ের পথ তৈরি করা যায়। একই যন্ত্রপাতি, একই টিম, একই জ্ঞান, এসব কিন্তু ভিন্ন প্রয়োগ। এই চিন্তাই অনেক ব্যবসাকে সাময়িক হলেও নতুন রাজস্ব এনে দেয়, যা টিকে থাকার সময়টা বাড়ায়।
সব সংকটই শেষ হয়। কিন্তু সংকট শেষে টিকে থাকে তারাই, যারা ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত থাকে। এই সময় শেখা অভিজ্ঞতাগুলোকে লিখে রাখা, দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকির জন্য পরিকল্পনা তৈরি করা জরুরি। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, জরুরি তহবিল, বিকল্প ব্যবসা মডেল, সংকট-পরবর্তী শক্ত ভিত তৈরি করে।
চ্যালেঞ্জিং সময় কোনো ব্যবসার জন্য অভিশাপ নয়, বরং এটি এক ধরনের কঠোর শিক্ষক। এই সময় ব্যবসাকে শেখায় কোন সিদ্ধান্ত টেকসই, কোন ব্যয় অপ্রয়োজনীয়, কোন সম্পর্ক সত্যিকারের মূল্যবান। যে উদ্যোক্তা সংকটকে ভয় না পেয়ে বাস্তবভাবে বিশ্লেষণ করেন, নমনীয় কৌশল গ্রহণ করেন এবং মানুষ ও আস্থাকে প্রাধান্য দেন, তার ব্যবসা শুধু টিকেই থাকে না, বরং সংকট শেষে আরও শক্ত হয়ে ফিরে আসে। কারণ শেষ পর্যন্ত ব্যবসা কৌশলে টিকে থাকলেও, এগিয়ে যায় কিন্তু দূরদর্শিতায়।
আপনার প্রতিক্রিয়া জানান
মন্তব্যসমূহ
এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।